ভারতে ‘বাংলাদেশি অভিবাসী’র সংখ্যা কমছে, প্রমাণ সরকারি তথ্যেই

Send
দিল্লি প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২১:০২, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:১১, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯





এনআরসি নিয়ে কেন্দ্রের নির্দেশ সব রাজ্য মানতে বাধ্য কিনা, তা নিয়েও সাংবিধানিক জটিলতার অবকাশ আছে।২০১৬ সালের ১৬ নভেম্বর। ভারতের পার্লামেন্টের শীতকালীন অধিবেশনে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু রাজ্যসভায় এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে জানালেন, ভারতে নাকি ২০ মিলিয়ন বা প্রায় ২ কোটির মতো অবৈধ ‘বাংলাদেশি অভিবাসী’ বসবাস করছেন।
এই পরিসংখ্যান সরকার কোথা থেকে, কোন সূত্রে পেলো, তা তিনি পরিষ্কার করে বলেননি। শুধু বলেছিলেন, ‘অ্যাভেইলেবল ইনপুটস’ বা প্রাপ্ত তথ্যমতে এই সংখ্যাটা জানা যাচ্ছে। পাশাপাশি মন্ত্রী এ-ও জানান, বহু বাংলাদেশি নাগরিকই বৈধ ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট (পাসপোর্ট, ভিসা) ছাড়া ভারতে প্রবেশ করছেন বলে খবর আছে। তবে যেহেতু পুরো কাজটাই ঘটছে গোপনে, তাই দেশজুড়ে এই ধরনের বাংলাদেশির সংখ্যা কত, তা সঠিকভাবে বলা মুশকিল।
আসলে ভারতে বাংলাদেশিদের কথিত অবৈধ অভিবাসন নিয়ে যখনই আলোচনা বা তর্ক-বিতর্ক হয়, তখন নির্ভরযোগ্য বা সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব থাকে।
তবে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ‘২ কোটি’ সংখ্যাটা ঘোরাফেরা করছিল। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর তা একটা সরকারি বৈধতা পেয়ে গেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বিজেপি নেতারা এখন সভা-সমাবেশে অম্লান বদনে বলতে পারেন, ‘এদেশে ২ কোটিরও বেশি অবৈধ বাংলাদেশি লুকিয়ে আছেন। আমরা তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করবো।’
কিন্তু এই ‘২ কোটি’ সংখ্যাটা কীভাবে এলো, তার উৎস নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েই গেছে। এর ওপর ভারতের সর্বশেষ আদমশুমারির (২০১১) যে অভিবাসন-সংক্রান্ত ডেটা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বরং দেখা যাচ্ছে—বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা ১০ বছর আগের তুলনায় অনেক কমছে।
ফলে এই মুহূর্তে যখন ভারতের নানা রাজ্যে আসামের ধাঁচে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি তৈরি করে কথিত অবৈধ বাংলাদেশি খোঁজার হিড়িক পড়েছে, সেই পটভূমিতেই এই নতুন পরিসংখ্যান নানা অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরছে। অনেকেই মনে করেন, এই ‘হিড়িক’ আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
কেন আদমশুমারির তথ্য সামনে এলো ৮ বছর পর
আহমেদাবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ও অভিবাসন বিষয়ক গবেষক চিন্ময় টাম্বে সম্প্রতি একটি নিবন্ধে লিখেছেন, ২০১১ সালের আদমশুমারির অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য কেন প্রায় ৮ বছর পর ২০১৯ সালের গোড়ায় প্রকাশ করা হলো, তার কারণ সম্ভবত সেখানে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে—ভারতে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংখ্যা কমছে। এই তথ্য সরকার চেপে রাখতে চেয়েছিল বলেই তার সন্দেহ।
২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য বলছে, বাংলাদেশে জন্মানো ব্যক্তির সংখ্যা ভারতে তখন ছিল ৩৭ লাখ, যা ১০ বছর আগের তুলনায় অন্তত ১০ লাখ কম। আর যদি কখনও বাংলাদেশে ঠিকানা ছিল, এমন ব্যক্তিদের হিসাব ধরা হয় সেক্ষেত্রেও ২০০১ সালে ৩১ লাখের তুলনায় ২০১১ সালের সংখ্যাটা কমে দাঁড়ায় ২৩ লাখে।
সে কারণেই ‘ইন্ডিয়া মুভিং: অ্যা হিস্ট্রি অব মাইগ্রেশন’ বইয়ের লেখক চিন্ময় বলছেন, ‘বিগত ২ দশকে বাংলাদেশ থেকে যে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে বা ইউরোপে যাওয়ার ঝোঁক অনেক বেড়েছে, এই পরিসংখ্যানেই তা প্রমাণিত। এর চেয়েও বড় কথা, এই সময়ে মানব উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশ প্রভূত উন্নতি করেছে। এ কারণে বাংলাদেশিদের ভারতে যাওয়ার গরজও কমে গেছে।’
বাংলাদেশিরা কেন আজকাল খামোখা ভারতে যাবেন, এই বক্তব্যের সমর্থনে সে দেশের সরকারও ঠিক এই যুক্তিই দিয়ে থাকে। এখন ভারত সরকারের সেন্সাস ব্যুরোর পরিসংখ্যানও কার্যত সেই তথ্যকেই সমর্থন করছে।
এ বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগের সাবেক মহাপরিচালক এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে ভারতকে জানানো উচিত।
তিনি বলেন, ‘ভারতে এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য বাংলাদেশিরা ভালোভাবে গ্রহণ করছে না, এই বার্তাটি দিল্লিকে দেওয়া উচিত হবে সরকারের।’
ভারতের সঙ্গে বসে এ বিষয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একটি অবস্থান আছে এবং সেটি দিল্লিকে পুনর্ব্যক্ত করা দরকার বলে মনে করেন সাবেক এই কূটনীতিক।
তিনি বলেন, ‘সরকারের আরও বলা দরকার যে এই নেতিবাচক রাজনৈতিক বক্তব্যের ফলে কোনও বিরূপ ফলাফল হলে তার জন্য বাংলাদেশ দায়ী থাকবে না।’
‘বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভারত ন্যাচারালাইজ করুক’
দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকার কলামিস্ট ও সিনিয়র সাংবাদিক অভীক বর্মণও বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি যেহেতু এখন ভারতের চেয়েও দ্রুত বাড়ছে, তাই সে দেশ থেকে ভারতে অবৈধ অভিবাসনের সংখ্যাও কার্যত ‘শূন্যের কোঠায়’ এসে ঠেকেছে।
কিন্তু যারা আগে থেকেই ভারতে রয়ে গেছেন, তাদের নিয়ে তাহলে কী করণীয়? অভীক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমি মনে করি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বা ভারতে ঢোকার তারিখ বিবেচনা না করে এই কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের ‘ন্যাচারালাইজ’ করে স্বাভাবিক নিয়মে ধীরে ধীরে নাগরিকত্ব দিয়ে দেওয়াই একমাত্র পথ। ইউরোপের অনেক দেশও ঠিক একই পন্থা নিয়েছে। কারণ, এটাই এই সমস্যার একমাত্র যুক্তিগ্রাহ্য সমাধান।’
তার যুক্তি হলো, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যেহেতু কোনও ডিপোর্টেশন চুক্তি নেই, তাই ভারত যদি লাখ লাখ মানুষকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ বলে শনাক্তও করে, তাহলেও তাদের বৈধ চ্যানেলে সে দেশে ফেরত পাঠানোর কোনও রাস্তা নেই।
দ্বিতীয়ত, এক্ষেত্রে একটা ‘কাট-অফ ডেট’ নির্ধারণ করাও হবে খুব গোলমেলে ব্যাপার। আসাম চুক্তি যেমন বলে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে যারা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, তারাই কেবল ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য। ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রস্তাবিত নাগরিকত্ব বিল আবার বলছে, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আসার কথা। যদিও সেটা শুধু হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের জন্য প্রযোজ্য, মুসলিমরা সে সুবিধা পাবেন না।
এছাড়া, এনআরসি নিয়ে কেন্দ্রের নির্দেশ সব রাজ্য মানতে বাধ্য কিনা, তা নিয়েও সাংবিধানিক জটিলতার অবকাশ আছে। সে কারণেই অভীক বর্মণ মনে করেন, ‘এই কথিত বাংলাদেশিদের ভারতীয় সমাজের মূল স্রোতে মিশিয়ে নেওয়াটাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান। কিন্তু মুশকিল হলো, রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অঙ্ক যে অন্য কথা বলে!’
‘বাংলাদেশকে বোঝাতে হলে ক্যারট চাই, স্টিক নয়’
ভারতের নামি স্ট্র্যাটেজিক থিংকট্যাংক ওআরএফের (অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন) সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাটে’ এই কথিত বাংলাদেশি অভিবাসন ইস্যুতে বছর পাঁচেক আগে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। তার সেই পর্যবেক্ষণ আজকের এনআরসি বিতর্কের পটভূমিতেও প্রাসঙ্গিক।
জয়িতার বক্তব্য ছিল, ‘হঠাৎ কিছু লোককে বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করে ভারত যদি জোর করে তাদের ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করে, তাহলে কোনও লাভ হবে না। এখানে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করাটাই দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথ।’
তার মতে, এ বিষয়ে বাংলাদেশকে আলোচনায় রাজি করানোর ক্ষেত্রে ‘স্টিক’-এর (লাঠি) বদলে ‘ক্যারট’ই (গাজর) বেশি কার্যকরী হবে। অর্থাৎ ঢাকাকে কোনও ভয় দেখিয়ে দিল্লি তাদের কার্যসিদ্ধি করতে পারবে না, বরং এখানে যে বাংলাদেশেরও লাভের সম্ভাবনা আছে, সেটাই ঢাকাকে বোঝানোর পরামর্শ জয়িতার।
তার ভাষ্য, ভারতে যদি সত্যিই লাখ লাখ অবৈধ বাংলাদেশি থেকে থাকেন, তাহলে দেশে তাদের রেমিট্যান্সের অর্থ পাঠাতে হয় বেআইনি পথেই। এতে বাংলাদেশ সরকারও কোটি কোটি ডলার রাজস্ব হারায়।
এমন প্রস্তাবও তখন উঠেছিল, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা সাপেক্ষে এই ধরনের শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমেয়াদি ওয়ার্ক ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট চালু করা গেলে দুই পক্ষেরই তাতে লাভ।
তবে সাম্প্রতিকতম পরিসংখ্যান এটাই বলছে, ভারতে ‘বাংলাদেশি অভিবাসী’র সংখ্যা প্রতি বছরই কমছে। আর ‘২ কোটি’ নিয়ে বিজেপি নেতাদের এত লম্ফঝম্প, তার কোনও মেথডোলজি বা নির্ভরযোগ্যতাই নেই। যে দাবির ভিত্তিতে তারা ভারতকে ‘অবৈধ বিদেশিমুক্ত’ করার অভিযানে নেমেছেন, ভারত সরকারের নিজস্ব পরিসংখ্যানই তাকে সমর্থন করছে না।
জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটি আমাদের সমস্যা না, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে আসন্ন বৈঠকে আলোচনা হতে পারে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সম্মেলনে এবং নয়াদিল্লিতে দেখা হবে। দুই দেশের যতগুলো সমস্যা আছে, সব বিষয়ই তিনি তুলবেন।’
ভারতের ‘অবৈধ বাংলাদেশি’র বিষয়টি সমস্যা হিসেবে দেখছেন কিনা জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটা নিয়ে কারো কারো উদ্বেগ আছে। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি জানাতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

/এসএসজেড/এইচআই/এমএমজে/

লাইভ

টপ