শাহজালালে তৃতীয় টার্মিনালের কাজ শুরু অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে

Send
চৌধুরী আকবর হোসেন
প্রকাশিত : ১৯:৫৬, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০১, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯

প্রস্তাবিত-টার্মিনালের-নকশানানামুখী জটিলতা নিরসনের পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণ কাজ শুরু হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি শেষ হলেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করবেন। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি ও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিতে অক্টোবর পর্যন্ত সময় নেবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ কিংবা নভেম্বর মাসের শুরুতেই নির্মাণ কাজ শুরু হবে। বেসামরিক  বিমান  পরিবহন  ও  পর্যটন  মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহিবুল হক এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

সূত্র জানায়, আইনি জটিলতা, বেবিচকের বড় কাজের অভিজ্ঞতা না থাকাসহ নানা কারণে ধীর গতিতে এগিয়েছে এ প্রকল্প।  এই কারণে বেড়ে যেতে পারে ব্যয়।

এর আগে, ২০১৫ সালে শাহজালাল বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ ও সম্প্রসারণের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন ও খসড়া মাস্টার প্ল্যান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তোলা হয়। ২০১৭ সালে ২৪ অক্টোবর শাহজালাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় একনেক। এ প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৬১০ কোটি ৪৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। নির্মাণ কাজে অর্থায়ন করবে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)।

থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের জন্য চারটি প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে পরামর্শক  হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ২০১৭ সালের ১১ জুন। চারটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে, জাপানের নিপপন কায়ো, ওরিয়েন্টাল কনস্যালটেন্ট গ্লোবাল, সিঙ্গাপুরের সিপিজি কনস্যালটেন্ট ও বাংলাদেশের ডিজাইন কনস্যালটেন্টস লিমিটেড। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য বেবিচকের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৭০ কোটি ৭৯ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। বেবিচক ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে কাজ শুরু করে ২০২১ সালের এপ্রিলে তা শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। যদিও নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করতে পারেনি সংস্থাটি।  

প্রস্তাবিত-তৃতীয়-টার্মিনালের-ব্যাগেজ-বেল্ট-এরিয়া

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, ১৮টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনলেও ২টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। এর একটি হচ্ছে মিৎসুবিশি, অন্যটি সিমুজি। দু’টি আবেদনই কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়াম করে জমা দিয়েছে। মিৎসুবিশির সঙ্গে আছে ফুজিতা ও স্যামসাং। আর সিমুজি’র সঙ্গে আছে, ইটালথাই ও জেজিইসি।

প্রথমে দু’টি প্রতিষ্ঠানের আবেদনের টেকনিক্যাল মূল্যায়ন করা হয়। টেকনিক্যাল মূল্যায়নে দু’টি প্রতিষ্ঠানের মান প্রায় একই অবস্থানে থাকলেও আর্থিক মূল্যায়নে এগিয়ে আছে মিৎসুবিশি। টার্মিনাল নির্মাণে মিৎসুবিশি খরচ দেখিয়েছে প্রায় ১৬ হাজার  কোটি টাকা। বিপরীতে সিমুজি দেখিয়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। তবে, বেবিচকের পছন্দে যেসব যন্ত্র বিমানবন্দরে স্থাপন করা হবে, তার মূল্যের তারতম্যে খরচ কম-বেশি হতে পারে বলে জানান বেবিচকের কর্মকর্তারা। 

সূত্র জানায়, থার্ড টামিনাল নির্মাণ কাজে শুরু করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার আইনি জটিলতায় পড়তে হয় বেবিচককে।  বিমানবন্দর এলাকায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জমি লিজ দেওয়া ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানকে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ দিলে আদালতে মামলা করে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন।

অন্যদিকে শাহজালাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের  জন্য ২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করে বেবিচক। ৭ নভেম্বর তুরস্কের জিএপি ইনসাত দরপত্র সিডিউল কেনে। প্রতিষ্ঠানটি  দরপত্রের কয়েকটি শর্তে আপত্তি তুলে তা বাতিলের জন্য বেবিচক ও সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেননিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ)-তে আবেদন করে। সিপিটিইউ থেকে এ বিষয়ে  পিপিআর/২০০৮ অনুসারে ব্যবস্থা নিতে বেবিচকে চিঠি দেয়। বেবিচক ২০১৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সিপিটিইউকে জানায়, প্রকল্পের ঋণদাতা জাইকার সঙ্গে বিবিচকের  ঋণচুক্তি অনুসারে প্রকল্প কাজ পিপিআর/২০০৮ এর পরিবর্তে জাপানিস ওডিএ গাইডলাইন অনুসারে হচ্ছে। প্রকল্পের দরপত্র দলিলের ওপর সম্মতি দিয়েছে জাইকা, ফলে ঠিকাদারের আবেদন কিংবা সিপিটিইউ-এর নির্দেশনা অনুযায়ী দরপত্র দলিলে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর প্রয়োজন নেই। পরবর্তী সময়ে তুরস্কের জিএপি ইনসাতের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট গত  ২০১৯ সালের ১৪  মার্চ প্রকল্পের সব কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। বেবিচক স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে ১৯ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজ আদালতে আবেদন করলে চেম্বার জজ আদালত হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। ১৯ মার্চের পর বেবিচক দরপত্র খোলে।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের নির্মাণ কাজ শেষ হতে সময় লাগবে ৪ বছর। থার্ড টার্মিনালের ভবন হবে তিন তলা। ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই ভবনটির নকশা করেছেন স্থপতি রোহানি বাহারিন। তিনি এনওসিডি-জেভি জয়েন্ট বেঞ্চার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন আন্তজার্তিক খ্যাতিসম্পন্ন সিপিজি করপোরেশন (প্রাইভেট) লিমিটেডের (সিঙ্গাপুর) স্থপতি। থার্ড টার্মিনালের বহির্গমণের জন্য ১৫টি সেলফ সার্ভিস (স্ব-সেবা) চেক ইন কাউন্টারসহ মোট ১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার থাকবে।

এছাড়া, ১০টি স্বয়ংক্রিয় পাসপোর্ট কন্ট্রোল কাউন্টারসহ মোট ৬৬টি ডিপারচার ইমিগ্রেশন কাউন্টার থাকবে। আগমনীর ক্ষেত্রে  ৫টি স্বয়ংক্রিয় চেক-ইন কাউন্টারসহ মোট ৫৯টি পাসপোর্ট এবং ১৯টি চেক-ইন অ্যারাইভেল কাউন্টার থাকবে। টার্মিনালে  ১৬টি আগমনী ব্যাগেজ বেল্ট স্থাপন করা হবে।

বহির্গমন-এলাকা

অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগেজের জন্য  ৪টি পৃথক বেল্ট স্থাপন করা হবে। তৃতীয় টার্মিনালে সঙ্গে বর্তমান টার্মিনাল ভবনগুলোর সঙ্গে প্রকল্পের প্রথম ধাপে কোনও যোগযোগ ব্যবস্থা থাকবে না। তবে প্রকল্পের ২য় ধাপে কানেকটিং কোরিডোরের মাধ্যমে পুরনো টার্মিনাল ভবনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হবে। গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য তৃতীয় টার্মিনালে সঙ্গে মাল্টিলেভেল কার পার্কিং বিল্ডিং ভবন নির্মাণ করা হবে, সেখানে ১ হাজার ৪৪টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।

বর্তমানে ভিভিআইপিদের জন্য শাহজালালে পৃথক  ভিভিআইপি কমপ্লেক্স রয়েছে, সেটি ভেঙে ফেলা হবে। তবে, তৃতীয় টার্মিনালে পৃথকভাবে স্বতন্ত্র কোনও ভিভিআইপি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে না। তৃতীয় টার্মিনাল ভবনের অভ্যন্তরে দক্ষিণ পাশে সর্বাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ভিভিআইপি স্পেস থাকবে।

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহিবুল হক  বলেন, ‘দরপত্র মূল্যায়নের কাজ শেষ প্রান্তে।’ অক্টোবরের শেষে অথবা নভেম্বরের শুরুতে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলেও তিনি  উল্লেখ করেন।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ