সরকারি চিঠিতে ভুল বানানের ছড়াছড়ি, উদাসীন সংশ্লিষ্টরা

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ২২:৩৬, অক্টোবর ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৩৫, অক্টোবর ১৪, ২০১৯

জেলা-শিক্ষা-কর্মকর্তার-স্বাক্ষর-করা-চিঠিসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানরীতি মানার নির্দেশনা থাকলেও প্রায় সাত বছরেও প্রশাসনের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না। সরকারি আদেশ সংবলিত বা চিঠি-প্রজ্ঞাপন-নোটিশে অহরহই থাকছে ভুল বানান, ভুল বাক্যগঠন। এছাড়া, সাধু-চলিতরীতির মিশ্রণ তো নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকটি চিঠিতেও প্রচুর বানান ভুলসহ বিভিন্ন দূষণ লক্ষ করা গেছে। এই নিয়ে ভাষাতত্ত্ববিদ, শিক্ষক ও সাহিত্যিকদের অভিযোগের জবাবে বিষয়টি স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি অপ্রত্যাশিত। এই বিষয়ে তাদের নিজেদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত বলেও তারা মনে করেন।

প্রসঙ্গত, গত ২০১২ সালের ৩১ অক্টোবর সরকারি কাজে প্রমিত বানানরীতি অনুসরণের নির্দেশ দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

এদিকে, চলতি বছরের ৩১ জুলাই ঝিনাইদহ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষর করা ভুল বানান সংবলিত একটি চিঠি ফেসবুকে তা ‘ভাইরাল’ হয়। ওই চিঠিতে  চল্লিশটিরও বেশি শব্দের বানান ভুল পাওয়া গেছে। এছাড়া, ছিল ৪৭ শব্দের একটি দীর্ঘ-জটিল বাক্য। বিষয়টি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে ‘জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষর করা চিঠিতে ৪০টিরও বেশি ভুল!’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভুলের বিষয়টি স্বীকার করেন ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ আকতারুজ্জামান।  গত ২ আগস্ট তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘যিনি চিঠি লিখেছেন, তিনি ভুল করেছেন। আমার জানা ছিল না, তিনি বানান জানেন না। তবে, পরে বানান ঠিক করে নতুন করে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে।’

৮৮৮

এদিকে, প্রাথমিক শিক্ষায় জাতীয় পদকপ্রাপ্ত নরসিংদীর জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহানা কাউনাইনের গত ৮ আগস্টের এক চিঠিতে পাওয়া গেছে ২৪টি ভুল। ভুলগুলো মধ্যে রয়েছে—‘মৃত’ শব্দটির বানান লেখা হয়েছে ‘মৃতঃ’, ‘মো.’ শব্দের বানানে শব্দের শুরুতে মাত্রাযুক্ত এ-কার ব্যবহার করা হয়েছে। ‘জনাব’ লেখার পর (,) কমা ব্যবহার করা হয়নি। ‘পূর্বপরিচয়’ শব্দটি আলাদাভাবে ‘পূর্ব’ ও ‘পরিচয়’ হিসেবে লেখা হয়েছে। ‘কোনও’ শব্দটিকে লেখা হয়েছে ‘কোন’ বানানে। সরকারি শব্দের বানান লেখা হয়েছে ‘সরকারী’। 

নরসিংদী জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের গত ৮ এপ্রিলের একটি চিঠিতে ভুল পাওয়া গেছে ১৭টি।  উপ-পরিচালক ড. এ.টি.এম মাহাবুব-উল করিম স্বাক্ষরিত চিঠিতে ‘পুনর্বিবেচনা’ শব্দটির বানান আলাদাভাবে দুই শব্দে ‘পুন: বিবেচনা’ লেখা হয়েছে। ‘আবেদনপত্র’ লেখা হয়েছে ‘আবেদন  পত্র’—দুই শব্দে। এভাবে ভুল করা হয়েছে ১৭ জায়গায়।   

গত ১৮ সেপ্টেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউসি) মহাপরিচালক  (ডিজি) অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক স্বাক্ষরিত অফিস আদেশের মূল অংশে ২৭টি ভুল পাওয়া গেছে।  

মহাপরিচালক স্বাক্ষরিত চিঠিতে ‘ডিগ্রি’ ভুল করে করে লেখা হয়েছে ‘ডিগ্রী’, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ‘অশিক্ষক’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কর্মচারীদের শব্দের জায়াগায় লেখা হয়েছে ‘কর্মচারীদেরকে’। এভাবে ভুল করা হয়েছে ২৭টি। এছাড়া, ৫০টির বেশি শব্দে একটি জটিল বাক্যে আদেশের পুরো বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

২

স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন চিঠিতেও একইভাবে অনেক ভুল পাওয়া গেছে। মাঠ প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা জেলা প্রশাসকদের চিঠিতেও ভুল দেখা গেছে। আর প্রায় সব চিঠিই দুর্বোধ্য ভাষায় লেখা।

সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি এসব চিঠি যারা লেখেন, তারা যেমন বানান সচেতন নন, তেমনি আগের তৈরি করা ফরমেটেই নতুন বিষয়টি উপস্থাপন করে চিঠি, নোটিশ বা প্রজ্ঞাপন ফাইলে উপস্থাপন করেন তারা। আর কর্মকর্তারাও কাজের চাপে অথবা বিষয়টিতে গুরুত্ব না দিয়েই স্বাক্ষর করেন।

সরকারি দফতরগুলোর বিষয়ে একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অনেক কর্মকর্তা বানান বা ভাষাগত বিষয়ে ভালো জানেন না। চর্চাও করেন না।’

জানতে চাইলে বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক যতীন সরকার বলেন, ‘এটি খুবই দুঃখজনক। হ্রস্ব ই-কারের জায়গায় দীর্ঘ ই-কার হচ্ছে। সাধু ও চলিতরীতির দূষণ তো রয়েছেই। এ অবস্থায় বানান সম্পর্কে সচেতনতা দরকার। সচেতনতা যদি না থাকে, তাহলে এ রকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে। এটি মোটেও উচিত নয়। কর্তৃপক্ষের উচিত, শুদ্ধ বানানচর্চায়  এখনই মনোযোগ দেওয়া।’

প্রায় একই অভিমত জানালেন সাহিত্যিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে শুদ্ধ বানানচর্চার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয় না। ভয়ানক রকমের আত্মমগ্ন থাকেন তারা। ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়া আর কোনও বিষয়ে তাদের নজর দেওয়ার সময় থাকে না। বৈষয়িক বিষয়ে তারা বেশি গুরুত্ব দেন।  ভাষা নিয়ে তাদের কোনও আগ্রহ নেই।’ এক প্রশ্নের জবাবে এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। এটি যদি বাধ্যতামূলক করে ফেলা হয়, এসিআরে যদি দাগ পড়ে, তখন সবাই নড়েচড়ে বসবেন। যদি বিধান করা যায় যে, যিনি ভাষার শুদ্ধতা রক্ষা করতে পারছেন না, তার এসিআরে দাগ পড়বে, তাহলে অনেকেই সতর্ক হবেন।’

১

এই প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘অন্যান্য ভাষার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ইংরেজির ক্ষেত্রে যে গুরুত্ব আমরা দিচ্ছি, নিজের ভাষার প্রতি সেই গুরুত্ব দিচ্ছি না। শিক্ষার্থীদের ইংরেজি, বিজ্ঞান শিখতে বলছি ভালোভাবে কিন্তু বাংলা ভাষা ভালো করে শিখতে বলছি না। শিক্ষাজীবনের পর চাকরিজীবনেও বাংলাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। চাকরির পরীক্ষায় ইংরেজিকে যত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, বাংলাভাষাকে তত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। চাকরিজীবনে গিয়েও বাংলাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একটি হীনম্মন্যতা বাংলাকে গুরুত্ব না দেওয়া।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, চাকরিতে প্রবেশের পর পেশাগত যেসব প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেখানে বাংলা ভাষা শেখার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন।’  

সরকারি চিঠি-প্রজ্ঞাপন-নোটিশে বানান ভুল ও শিক্ষাবিদদের অভিযোগের প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন বলেন, ‘বানানের বিষয়ে আমাদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সংশোধন হওয়া উচিত।’

প্রমিত বানানরীতি না-মানা ও সরকারি  চিঠিতে বানান ভুলের বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বানানরীতি মেনে শুদ্ধভাবে চিঠি লেখার চর্চা করতে হবে। সরকারের বিভিন্ন দফতরে প্রমিত বানানরীতি মেনে চলার চর্চা করা হচ্ছে না। এছাড়া, আগে শিখে আসা ভুল বানান, প্রচলিত ভুলগুলোও ব্যবহার করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আইন করে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে শুদ্ধ বানানচর্চা বাড়াতে হবে। তাহলে ধীরে ধীরে এই সমস্যা থেকে আমরা বের হতে পারবো।’

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ