ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি থাকতেও হাতের ইশারাই ভরসা! (ভিডিও)

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ২২:০৩, অক্টোবর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৮, অক্টোবর ১৭, ২০১৯

ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যালরাজধানীতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সড়কগুলোয় ডিজিটাল রিমোট কন্ট্রোল ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়েছে। এই পদ্ধতিতে রিমোট কন্ট্রোল ও সময় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করার কথা। ইতোমধ্যে ৯৯টি ইন্টারসেকশনের সিগন্যাল বাতি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ বলছে, এসব বাতির অধিকাংশই নষ্ট। ভালো সিগন্যাল বাতিগুলোর মধ্যে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি সিগন্যাল রিমোট ও সময় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কন্ট্রোলের দাবি করা হলেও এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। এখনও ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় সব সিগন্যাল নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই বাতিগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্রাফিক পুলিশকে ৩৯ জন জনবলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) শীর্ষ প্রকল্পের আওতায় এই সিগন্যাল বাতিগুলো স্থাপন করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। বর্তমানে দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯৯টি ইন্টারসেকশনে নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানো হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি এলাকায় ৫৩টি ইন্টারসেকশন রয়েছে। বাকি ৪৬টি ইন্টারসেকশন ঢাকা উত্তর সিটিতে অবস্থিত। দক্ষিণের ৫৩টি ইন্টারসেকশনের মধ্যে ২৮টি ইন্টারসেকশনের সিগন্যাল বাতি রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এ থেকে মেট্রোরেলের কারণে ৬টি ইন্টারসেকশনের বাতি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাকি ২২টি ইন্টারসেকশন রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রতি হবে। এ ছাড়া বাকি ইন্টারসেকশনের বাতিগুলোর সময় ট্রাফিক বক্স থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

৪এদিকে, উত্তর সিটির ৪৬টি ইন্টারসেকশনের মধ্যে মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের কারণে ১৯টি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাকি ২৭টি ইন্টারসেকশনের মধ্যে ২০টি কেইস প্রকল্প ও ৭টি ডিএনসিসি থেকে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে।

স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল চালুর স্থানগুলো পরিদর্শন করে দেখা গেছে, বাতিল জায়গায় বাতি জ্বলছে। কিন্তু দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছেন। আবার দুই একটি স্থানে সিগন্যালের মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হলেও সেটি চলমান রাখা যায় না। তবে, নগরীর শত শত মোড়ের মধ্যে দুই-একটিতে যখন সিগন্যাল বাতির মাধ্যমেই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, তখন যানবাহন চালকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন।

মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মফিজ উদ্দিন আহমেদের দাবি, ‘নগরীর ট্রাফিক ইন্টারসেকশনগুলোর মধ্যে হাতিরঝিল, মগবাজার, শান্তিনগর, মৌচাক, মালিবাগ, মালিবাগ রেলগেট ও বিজয় সরণিতে সিগন্যাল বাতির মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।’ তবে সরেজমিন পরিদর্শনের সময় তার এ দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি।

শনিবার হাতিরঝিল সংলগ্ন এফডিসি মোড়ে দেখা গেছে, লাল বাতি জ্বলা অবস্থায় যানবাহন চলছে। সঠিকভাবে সিগন্যাল বাতি কাজ করলেও ট্রাফিক সদস্যরা হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এই সিগন্যাল বাতির মাধ্যমে চালাই। কিন্তু যখন গাড়ি কম থাকে তখন দেখা গেছে, একদিকে ফাঁকা, অন্যদিকে অনেক গাড়ি। কিন্তু তখন সিগন্যাল পড়ে থাকে। এসবের কারণে তখন হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এছাড়া, বারবার সুইচ ঘোরানোর কারণে যন্ত্রগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে।’

৩একই চিত্র দেখা গেছে মগবাজার মোড়েও। ওই মোড়ে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক সার্জেন্ট আশরাফ ও আনসার সদস্য নূর ইসলাম বলেন, ‘মগবাজার রেলক্রসিংয়ের কারণে রিমোটের মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এছাড়া যান্ত্রিক ত্রুটি, কখনও যানবাহনের বেশি চাপ আবার কখনও কম, ভিআইপি মুভমেন্ট, মানুষের অসহযোগিতা ও অসচেতনতাসহ নানা কারণে সিগন্যালের মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’

মৌচাক, মালিবাগ ও মালিবাগ রেলগেট ও বিজয় সরণিতেও একই চিত্র দেখা গেছে। তবে, যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টি মানতে নারাজ সিটি করপোরেশন। সংস্থাটির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকল্প পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সব বাতি ঠিক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে দিয়েছি। কোনও বাতি নষ্ট নেই। তবে, কোথাও সমস্যা দেখা দিলে আমাদের ইঞ্জিনিয়াররা ঠিক করে দেন। এ জন্য ট্রাফিক পুলিশকে ৩৯ জন জনবল দেওয়া হচ্ছে। তাদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’

দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে এসব সিগন্যাল বাতি স্থাপন করায় এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। একযোগে সবক’টি সিগন্যাল চালু না হওয়ায় যানবাহন চালকরাও নিশ্চিত হতে পারছেন না কোথায় সিগন্যালে চলে আবার কোথায় সিগন্যাল ছাড়া চলে। যে কারণে সিগন্যালের পাশাপাশি হাতের ইশারায়ও কাজ করতে হয়।

প্রসঙ্গত, যানজট নিরসনে ২০০১-০২ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮৮টি সড়ক মোড়ে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানো হয়। নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পের মাধ্যমে সিগন্যাল বাতিগুলো স্থাপন করে সিটি করপোরেশন। কিন্তু নানা ধরনের ত্রুটির কারণে নির্মাণ শেষে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। এতে যে সময় নির্ধারণ করে দেওয়া আছে, তার সঙ্গে বাস্তব যানবাহনের পরিসংখ্যানের কোনও সামঞ্জস্য ছিল না। সে কারণে বেশ কয়েকবার পরীক্ষামূলক চালু করার পর সফলতা না পাওয়ায় তা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ।

২০০৮ সালের শেষের দিকে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়। ওই সময় উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও ভেঙে পড়ে। শহরে দেখা দেয় ভয়াবহ যানজট। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে কিছু সময় পরই কাউন্টডাউন বন্ধ করে আগের মতো হাত দিয়ে সিগন্যাল ব্যবস্থায় ফিরে যায় ট্রাফিক পুলিশ। পরে ২০১০ সাল থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটির দ্বিতীয় দফায় অর্থায়ন করা হয়। মেয়াদ শেষ হয় ২০১৪ সালের জুনে। কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রকল্পটির সফলতা পায়নি নগরবাসী।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশে এই সিগন্যাল বাতিগুলো চালু করার উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন। তবে, সিগন্যাল বাতিগুলোর সময়ের নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা রেখে তা ট্রাফিক পুলিশকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ট্রাফিক সদস্যরা রিমোট কন্ট্রোল ও ট্রাফিক বক্সের কন্ট্রোলারের মাধ্যমে এই সময় নিয়ন্ত্রণ করবেন। এ জন্য নতুন করে যন্ত্রাংশ পরিবর্তনসহ নতুন ডিভাইস লাগানো হয়। এরপর সব সিগন্যাল বাতি ঠিক করে চলতি বছরের জুনের দিকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের ‘ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন’ সংক্রান্ত এক সভায় সিটি করপোরেশনে বাস্তবায়ন করা ট্রাফিক সিগন্যালে স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনা পুলিশকে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার রেজুলেশন অনুযায়ী, শহরের ট্রাফিক সিগন্যালগুলোয় রিমোট কন্ট্রোল অটোমেটিক বৈদ্যুতিক সিগন্যাল চালু করতে হবে। এজন্য ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-কে সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে সংস্থা দু’টি বিষয়টি কার্যকর করতে পারেনি। পুরো ব্যবস্থাপনাটি একটি প্রকল্পের আওতায় থাকায় প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশ থেকে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানি করে সম্প্রতি সিগন্যাল বাতিগুলো ঠিক করা হয়।

২
জানতে চাইলে ডিএসসিসির নগর পরিকল্পনাবিদ ও কেইস প্রকল্পের পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দুই সিটি এলাকার ৯৯টি ইন্টারসেকশনের সবক’টি সিগন্যাল বাতি ঠিক করেছি। এরমধ্যে মেট্রোরেল ও কিছু উন্নয়ন কাজের জন্য কয়েকটি বাতি খুলে নেওয়া হয়েছে। বাকি বাতিগুলো ঠিক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন যদি কোথাও কোনও সমস্যা দেখা দেয়, আমাদের ইঞ্জিনিয়াররা সেগুলো ঠিক করে দেবেন। কিন্তু পুলিশের সব চাহিদা পূরণ করার পরেও পুলিশ সেটি ব্যবহার না করলে আমাদের করার কী আছে?’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে হাতিরঝিল (এফডিসি মোড়), মগবাজার, শান্তিনগর, মৌচাক, মালিবাগ, মালিবাগ রেলগেট ও বিজয় সরণিতে সিগন্যাল বাতির মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কিন্তু বাকিগুলো নষ্ট। সেগুলো ঠিক করে দিতে বলেছি। সে কারণে সেগুলো চালু করা যাচ্ছে না। আবার অনেক জায়গায় সিগন্যাল বাতি খুলে নেওয়া হয়েছে।’

ট্রাফিক জনবলের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের এই অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ‘এজন্য আমাদের ৩৯ জন জনবল নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে এখনও নিয়োগবিধি চূড়ান্ত না হওয়ায় নিয়োগ দিতে পারছি না। মন্ত্রণালয় থেকে বিধি চূড়ান্ত হলে নিয়োগ দিতে পারবো।’ তখন অনেক সমস্যা কেটে যেতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। 

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ