সড়কে শৃঙ্খলা: নির্দেশনার বাস্তবায়ন কবে

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ০৭:৪৯, অক্টোবর ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৫৭, অক্টোবর ২২, ২০১৯

রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা আনতে বিভিন্ন সময়ে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে গঠন করা হয় একাধিক কমিটিও। তবে সেসব বাস্তবায়নে গতি নেই। যতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তারও ঠিকঠাক তদারকি হচ্ছে না। পরিবহন বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম সজীব নিহত হন। এর প্রতিবাদে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। এর জেরে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্তগুলো গত বছরের ২০ অক্টোবরের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হলেও তা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। 

এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে সড়কে সিগন্যাল বাতি, বাস স্টপেজ ও আন্ডারপাস ব্যবহার উপযোগী করার দায়িত্বে ছিল দুই সিটি করপোরেশনের। শুরুতে এর কিছুটা বাস্তবায়ন করা হলেও একপর্যায়ে এসে সেগুলো গতি হারিয়েছে। তবে এর মধ্যে নগরীর ৯৯টি ট্রাফিক ইন্টারসেকশনে রিমোট কন্ট্রোলড অটোমেটিক বৈদ্যুতিক সিগন্যাল বাতি ঠিক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এর মধ্যে তারা ৭টি ইন্টারসেকশন চালু করেছে।

মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মফিজ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাতিগুলোর অধিকাংশই নষ্ট। তবে আমরা হাতিরঝিল, মগবাজার, শান্তিনগর, মৌচাক, মালিবাগ, মালিবাগ রেলগেট ও বিজয় সরণিতে সিগন্যাল বাতির মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছি।’

দুই সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে সংস্থা দুটি দেড় শতাধিক বাস স্টপেজ ও যাত্রী ছাউনি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ডিএসসিসির কেইস প্রকল্পের আওতায় দুই সিটিতে ১০টি করে ২০টি যাত্রী ছাউনি নির্মাণ করা হয়। এছাড়া ডিএসসিসির মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়েছে আরও ২০টি। বাকিগুলো নির্মাণাধীন রয়েছে।

তবে সরেজমিনে দেখা যায়, দৃষ্টিনন্দন এসব ছাউনির বেশির ভাগের সামনেই বাস দাঁড়ায় না। তবে মাঝেমধ্যে সেসব স্থান থেকে যাত্রী তুলতে বাসগুলোকে বাধ্য করতে দেখা গেছে।

পাশাপাশি চলন্ত অবস্থায় গাড়ির দরজা বন্ধ রাখা, দূরপাল্লার বাসে যাত্রীদের জন্য সিট-বেল্ট রাখা, বাসের মধ্যে চালক ও হেল্পারের বৃত্তান্ত, বড় অক্ষরে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর লাগানোসহ অন্যান্য নির্দেশনার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। তবে প্রথম দিকে বিআরটিসির কিছু বাসে এসব তথ্য টাঙিয়ে রাখতে দেখা গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সড়ক ব্যবস্থাপনায় যে ৯টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে শুধু জেব্রা-ক্রসিং ও কিছু সিগন্যাল সাইন লাগানো হয়েছে। বাকিগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি।

এ ব্যাপারে ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের যে নির্দেশনা রয়েছে, সে অনুযায়ী আমরা কাজ চলমান রেখেছি। রাস্তায় দৃষ্টিনন্দন যাত্রী ছাউনি, রোড মার্কিং, ট্রাফিক সিগন্যাল ও ট্রাফিক সাইন করে দিয়েছি।’ এসব কাজ চলমান থাকবে বলেও জানান তিনি।

সংস্থাটির একজন প্রকৌশলী জানান, রোড মার্কিংয়ের রঙ থাকে তিন মাস। এ কারণে তিন মাস পরপর কাজ করতে হয়। এজন্য তারা মন্ত্রণালয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছেন। সেটি অনুমোদন পেলে কাজগুলোর ধারাবাহিকতা রাখা যাবে।

ঢাকা উত্তর সিটির (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘নিরাপদ সড়কের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে সচেতনতা। সড়কে রোড মার্কিং, ট্রাফিক সাইন বসিয়েছি। অবৈধ লাইসেন্স বন্ধ করতে বিআরটিএকে বলেছি। সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বেশ কয়েকবার বৈঠক করেছি। আমি বলে দিয়েছি সিগন্যালের মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’ কিন্তু কেন হচ্ছে না সেটা নিয়ে পর্যালোচনা চলছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের (বিআরটিসি) সচিব নূর-ই-আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের পরিবহনে চালকের ছবিসহ জীবনবৃত্তান্ত লাগানো হয়েছে। আমরা সবসময় চেক করি।’ কোথাও এসব পাওয়া না গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গণপরিবহনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তবে এখনও অনেক বাকি রয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য সব পরিবহন মালিককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ যারা নির্দেশনা মানছেন না তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। অনেক পরিবহন এখন আর আগের মতো যত্রতত্র যাত্রী ওঠায় না এবং চলন্ত অবস্থায় দরজা বন্ধ রাখে বলেও দাবি করেন সড়ক পরিবহনের এই নেতা। 

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘২০১২ সাল থেকে সড়ক পরিবহন আইন পাসের জন্য আন্দোলন করে আসছি। গত বছর সেটি সংসদে পাস হয়েছে। রাষ্ট্রপতিও সই করেছেন। কিন্তু তা এখনও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে প্রধান বাধা মালিক ও শ্রমিকরা।’ সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভয় পায় বলে দাবি করেন তিনি।

ইলিয়াস কাঞ্চন আরও বলেন, নির্দেশনাগুলো যারা প্রথমে বাস্তবায়ন করবে সেই সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিসির বাসে দরজা নেই। তাহলে কীভাবে হবে? তাছাড়া মানুষের মধ্যে সচেতনতা নেই বলেও মন্তব্য করেন নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের এই নেতা।

/এইচআই/এমএমজে/

লাইভ

টপ