স্বাধীন বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টির পাশাপাশি দালাল ও দেশের শত্রুদের অধিকার সংকোচনেরও বিধান থাকবে। চট্টগ্রামে এক সমাবেশে বক্তৃতাকালে অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম এই ঘোষণা দেন। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, ‘অধিকার সংকোচন করা হচ্ছে বলে যে অভিযোগ এসেছে, সেটি পাকিস্তানি হানাদারদের দালাল ও দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারকে সাহায্য করার জন্য করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘একটি দেশপ্রেমী জনগণের কোনও ক্ষতি হবে না এবং এমনকি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে না।’ তিনি বলেন, ‘অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বিষয়টি আসলে আদৌ তা নয়। এতে কেবলমাত্র দালাল ও সহযোগী দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেশপ্রেমিক নাগরিকদের এতে কোনও ক্ষতি হবে না।’
অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রের কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টি থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘কেবলমাত্র যেসব বিষয় সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষভাবে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, সেসব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রে জনগণের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা থাকবে।’
সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যেহেতু গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র পরস্পরবিরোধী না হয়ে পরস্পরের পরিপূরক, সেই কারণেই মৌলিক অধিকারের সংকোচনের প্রয়োজন।’ তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন, জনগণের মৌলিক অধিকার অস্বীকার করা যাবে না। তবে মনে রাখতে হবে যে, আমাদের লক্ষ্য হলো—দেশে শোষণমুক্ত একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলা।’
সরকার কেন ফিরিয়ে নিচ্ছে না: প্রশ্ন আটকে পড়া বাঙালিদের
পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের অবস্থা সংকটাপন্ন। অনেকের মাথায় ইতোমেধ্যে গোলমাল দেখা দিয়েছে। এমন অনেক লোক আছেন, যাদের কোনও আত্মীয়-স্বজন নেই, তারা অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। করাচি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচ্যুত এক অফিসার গত সপ্তাহে তার মাকে যে চিঠি লিখেছিলেন, তার অংশবিশেষ তুলে ধরে দৈনিক বাংলা পত্রিকা। ওই ব্যক্তি তার মাকে উদ্দেশ লিখেছেন—‘এখানে বাঙালিদের অবস্থা ভীষণভাবে শোচনীয়। এমন পরিবার আছে যাদের এখানে কেউ নেই। একটা পয়সা কোথাও থেকে পাওয়ার উপায় নেই। তারা একবেলা খেয়ে কোনও কোনও দিন না খেয়ে বেঁচে আছেন। বাঙালিদের মধ্যে যারা কিছু টাকা পয়সা জমাতে পেরেছিলেন, তারা তা দিয়ে লঙ্গরখানা খুলেছেন ও নিরুপায় অসহায় রোগীদের খাবারের বন্দোবস্ত নিজেরাই করছেন। এখানে চতুর্থ ও তৃতীয় শ্রেণীর বাঙালি সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীরা কোনোমতে আধাপেট খেয়ে জীবন ধারণ করছেন। অনেকে কষ্ট সহ্য করতে না পেরে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে ছয় মাসের জন্য কারাবন্দি হচ্ছেন।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার আমাদের ফিরিয়ে নিতে চান না। জাতিসংঘে আমাদের বন্ধু দেশগুলো বেআইনি আটকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে না কেন।’ উপসংহারে এসে চিঠিতে তিনি তার মাকে লিখেছেন, ‘আমরা মাথা নিচু করে দেশে ফিরতে চাইনে। পাক নরপশুদের বিচার চাই। এতে যদি আমরা পাঁচ লাখ লোক মরেও যাই, তাতে দুঃখ নেই।’
রুটি খেতে পরামর্শ
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও চালের সংকটের মাঝে আটা খাওয়ার পরামর্শ দেন অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষ করে দেশের খাদ্য পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জনগণকে কঠিন ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।’ বর্তমান খাদ্য ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার জন্য জনগণকে তিনি অধিক পরিমাণ আটা ও চাল কম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আটা গ্রহণে অভ্যস্ত হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে এই জন্যই যে, সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে ও বন্ধু দেশগুলো থেকে অধিক পরিমাণ চাল সংগ্রহ করতে পারেনি।’
বঙ্গবন্ধু ফিরবেন ১৩ সেপ্টেম্বর
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৩ সেপ্টেম্বর দেশের উদ্দেশে জেনেভা থেকে রওনা দেবেন। বঙ্গবন্ধুর প্রাথমিক কর্মসূচির উদ্ধৃতি দিয়ে জেনেভা থেকে গোলাম রসূল মল্লিক একথা জানান। একটি চার্টার্ড বিমানযোগে স্বদেশে ফেরার পথে বঙ্গবন্ধু নয়াদিল্লিতে এক রাতের জন্য বিশ্রাম নেবেন। এদিকে বঙ্গবন্ধু সুস্থ হয়ে উঠছেন বলে জানান তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘অস্ত্রোপচারের স্থানে গত তিন দিন ধরে তিনি যে ব্যথা অনুভব করছিলেন, বর্তমানে তা সেরে গেছে। বঙ্গবন্ধু হেঁটেছেন কিছুটা। দূর থেকে উপভোগ করেছেন লেকের মনোরম দৃশ্য। বঙ্গবন্ধুর চিকিৎসকরা অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, অস্ত্রোপচারের স্থানে যদি তিনি আর কোনও ব্যথা অনুভব না করেন, তাহলে জেনেভা থেকে ঢাকা প্রত্যাবর্তনে তার কোনও অসুবিধা হবে না। তারা আরও বলেছেন, নয়াদিল্লিতে অন্ততপক্ষে একদিন বিশ্রাম নিলে বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যের জন্য খুবই মঙ্গলজনক হবে। তাতে করে তিনি সুস্থ দেহ নিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারবেন। এটা খুবই প্রয়োজন। কেননা, ঢাকায় ফিরে তাকে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিতে হতে পারে।’








