(বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকারি কর্মকাণ্ড ও তার শাসনামল নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে বাংলা ট্রিবিউন। আজ পড়ুন ওই বছরের ১২ অক্টোবরের ঘটনা।)
১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর স্বাধীনতার দশ মাস পর গণপরিষদে বাংলাদেশের প্রথম শাসনতন্ত্র পেশ করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদিন শাসনতন্ত্র বিলের ওপর বক্তৃতা দেন। কমিটিকে দ্রুততম সময়ে শাসনতন্ত্র প্রস্তুত করার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন তিনি। বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্যদের প্রয়োজনীয় সংশোধনী ও সংযোজন-বিয়োজনের বিষয় থাকলে তা জানানোর আহ্বানও জানান।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জনগণের রক্তে শাসনতন্ত্র লেখা শুরু হয়। সুদূর অতীতে ১৯৪৮ সালে। তখন থেকে আমরা অকুতোভয় সংগ্রাম করেছি শাসনতন্ত্রের জন্য। বারবার রক্ত দিয়েছি, আমার সেদিনের স্বপ্ন সফল হবে শাসনতন্ত্রের মধ্য দিয়ে। ১৯৭২ সালের এই দিনে গণপরিষদে উত্থাপিত শাসনতন্ত্র বিলের ওপর বক্তৃতাকালে পরিষদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, এ দেশের জনগণ দীর্ঘকাল সংগ্রাম করেছেন। এটা তাদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের এক বিরাট সাফল্য। সেজন্য বাংলাদেশের জনগণ গর্বিত। আমাদের দল এবং স্বাধীনতার জন্য যারাই সংগ্রাম করেছেন তারা সকলেই আজ গর্বিত।
পরিষদ ভবনে শুরু হয় স্বাধীন বাংলার গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশন। আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষদের কাজ শুরু হওয়ার পর আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন শাসনতন্ত্র বিল পেশ করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শাসনতন্ত্রের ওপর বক্তৃতা করেন। বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেন, শাসনতন্ত্র জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে রচিত।
সদস্যদের প্রতি আহ্বান
বঙ্গবন্ধু বলেন, শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হলে তা নিশ্চয়ই মেনে নেওয়া হবে। দেশের মঙ্গলের জন্য ভালো সংশোধন থাকলে পরিষদ সদস্য সেটা দেবেন। তাদের সংশোধনী নিয়ে যদি শাসনতন্ত্রকে আরও উন্নত করা যায় তাতে দেশের মঙ্গল হবে। শাসনতন্ত্রের বিলটি ভালো করে পড়ার এবং তারপর চিন্তাভাবনা করার জন্য তিনি আওয়ামী লীগ, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলীয় সদস্যদের প্রতি অনুরোধ জানান। বঙ্গবন্ধু বলেন, শাসনতন্ত্র একদিনের জন্য নয়। আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য এটি একটি পবিত্র দলিল। শাসনতন্ত্রে মানুষের অধিকার রক্ষিত থাকে। সুতরাং সেটা হতে হবে নিখুঁত। আজ আমরা এমনই একটি শাসনতন্ত্র তৈরি করতে যাচ্ছি, এর চেয়ে আনন্দ আর কিছু হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শাসনতন্ত্র দেওয়ার অধিকার আমাদের আছে। দেশের শতকরা ৯৮ জন লোক আমাদের ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছেন। সেজন্য আমরা মাত্র দশ মাস সময়ের মধ্যে দেশবাসীকে তাদের আকাঙ্ক্ষিত শাসনতন্ত্র দিচ্ছি। স্বাধীনতার ১০ মাসের মধ্যে শাসনতন্ত্র দেওয়ার ঘটনা দুনিয়ার কোনও দেশের ইতিহাসে নেই।
সমালোচকদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু
বক্তৃতাকালে বঙ্গবন্ধু বলেন, শাসনতন্ত্র সম্পর্কে সমালোচনা করা সহজ কিন্তু দেশকে একটি শাসনতন্ত্র দেওয়া খুবই কঠিন কাজ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অল্প সময়ের মধ্যে শাসনতন্ত্র দিচ্ছি। কারণ, শাসনতন্ত্র ছাড়া কোনও দেশ চলতে পারে না। শাসনতন্ত্রবিহীন দেশ হলো মাঝিবিহীন ও হালবিহীন নৌকার মতো। শাসনতন্ত্রে জনগণের অধিকার থাকবে, তাদের কর্তব্য নির্ধারিত থাকবে। কারণ ফ্রি-স্টাইলে কোনও কিছু বলতে পারে না।
আওয়ামী লীগের জয়গান
গণপরিষদের সদস্য তথা আওয়ামী লীগ শাসনতন্ত্র তৈরি হবার পর আবার জনগণের কাছে ফিরে যাবেন। বিশ্বের ইতিহাসে এটা হবে আর একটি বিরল দৃষ্টান্ত। কারণ, দুনিয়ার ইতিহাসে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের পরে কেউ ক্ষমতা ছেড়ে যায়নি, বিশেষ করে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে। এখানেও আওয়ামী লীগের ইতিহাস সৃষ্টি করলো। কারণ, ইচ্ছে করলেই তারা ক্ষমতায় থাকতে পারতেন কিন্তু তারা তা করবেন না।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতার রাজনীতি করে না উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ক্ষমতার মোহ থাকলে আওয়ামী লীগ অতীতে বহুবার ক্ষমতায় যেতে পারতো। আওয়ামী লীগ সব সময় জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য তাদের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছে। শাসনতন্ত্র হবার পর নির্বাচন হবে। জনগণ ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনলে আওয়ামী লীগ সে দায়িত্ব গ্রহণ করবে। আর অন্য দল ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ তাদের হাতে দায়িত্বভার ছেড়ে দেবে। বঙ্গবন্ধু বলেন, আমাদের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমার মন একদিকে দুঃখ ভারাক্রান্ত, অন্যদিকে আনন্দে উদ্বেল। দুঃখ এজন্য যে দেশের স্বাধীনতার জন্য আমরা যত রক্ত দিয়েছি দুনিয়ার কোনও দেশের ইতিহাসে তার নজির নেই। জনগণ গত ২৪ বছর শাসনতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন। তাদের অধিকার আদায়ের জন্য রক্ত দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে জনগণের বিজয় সূচিত হয়েছে কিন্তু তার জন্য বাংলার অগণিত মানুষ শহীদ হয়েছেন।
ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা
বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ধ্বংসস্তূপের ওপর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমার সহকর্মীরা কঠোর পরিশ্রম করে বন্ধুরাষ্ট্রের সাহায্য নিয়ে দেশকে বর্তমানে স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। আশঙ্কা করা হয়েছিল দুর্ভিক্ষে ৫০ লক্ষ লোক মারা যাবে। কিন্তু আমরা দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করেছি। বন্ধুরাষ্ট্র ভারত লক্ষ লক্ষ টন খাদ্যশস্য না দিলে আমরা দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করতে পারতাম না। সেজন্য বঙ্গবন্ধু তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।








