(বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকারি কর্মকাণ্ড ও তার শাসনামল নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে বাংলা ট্রিবিউন। আজ পড়ুন ওই বছরের ৭ নভেম্বরের ঘটনা।)
যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলায় আসন্ন উৎসবের পদধ্বনি দ্বারপ্রান্তে। ঈদুল ফিতরের মাত্র একদিন বাকি। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে শাওয়ালের চাঁদ নিয়ে আসছে খুশির মিলন উৎসব। খুব সমারোহ নেই। আনন্দের বাহ্যিক প্রকারণ যোগাতে সাধ যত আছে সাধ্য তত নেই।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে শাওয়ালের চাঁদ যখন এসেছিল তখন আমাদের সংগ্রাম চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছিল। মুজিবনগর আর হানাদার কবলিত অধিকৃত বাংলাদেশের মুক্তিপাগল বাঙালির কণ্ঠে ছিল স্বাধীনতার প্রার্থনা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সেবার ঈদুল ফিতরের রাতে প্রচারিত হয়েছিল ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও’।
স্বাধীনতাকামী বাঙালির কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়েছিল সেই অনুষ্ঠানে। ৩০ লাখ লোকের হত্যার ক্ষত আজও বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে রয়েছে। প্রিয়জনের বিচ্ছেদের বেদনায় মানুষ অতিশয় আক্রান্ত। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশের নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষ ১৯৭২ সালে ঈদ করতে যাচ্ছে বিচ্ছেদের বেদনা নিয়ে। সমস্যা ভারাক্রান্ত দিনযাপনের পথ বেয়ে আনন্দের প্রবচন নিয়েই হয়তো আসছিল ঈদ।
মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ছিল না
ঈদের বাজারে বিপণীকেন্দ্র ও ফুটপাতের দোকানগুলোতে ভিড় যত বিক্রি তত নয়। সব জিনিসের দাম আগুন। আগের বছরের তুলনায় অধিকাংশ সামগ্রীর দাম বেড়েছে তিন-চার গুণ করে। যাদের হাতে কাঁচা পয়সা রয়েছে, যারা উচ্চবিত্ত সচ্ছল তাদের কথা আলাদা। কেনাকাটা-বাজার তারাই মুখর করে রেখেছে। কিন্তু উৎসবের স্পন্দন সার্বিকভাবে সবার মনে জেগেছে। হয়তো কম বা বেশি।
যাদের সাধ মেটানোর সাধ্য নেই তারাও সীমিত সামর্থের মধ্যে ঈদের প্রস্তুতি নিয়েছে। উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেয়ার জন্য দেশের বাড়ি যাচ্ছে। সেই পরিচিত দৃশ্যগুলো ফিরে এসেছে পত্রিকার পাতায়। ট্রেনে বাসে লঞ্চে করছে সবাই যাচ্ছেন ঈদ করতে। বোঝাই কম্পার্টমেন্ট বোঝাই গাড়ি। ট্রেনের বগিগুলোর ছাদেও যাত্রীদের ভিড়।
ঈদের বাজারে প্রতিবছর জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। এবার দাম বেড়েছে আরও অনেক বেশি। ঈদের ছুটিতে যাত্রী প্রতিবারই থাকে। এবার রয়েছে। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে এবার এক বিশেষ তাৎপর্যে চিহ্নিত। বাংলার মানুষ এবার স্বাধীন মাতৃভূমিতে ঈদ উদযাপন করতে যাচ্ছে। আমাদের সকল কাঁটা ধন্য হবে অন্তত এই মহান তাৎপর্য নিয়ে সেবার ঈদের প্রহরগুলো ফুল হয়ে যেন প্রস্ফূটিত হয় সেই কামনা ছিল সকলের চোখেমুখে।
স্বীকৃতির প্রশ্নে পাকিস্তান
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সেক্রেটারি ইফতেখার আলী ১৯৭২ সালের ৬ নভেম্বর আবারও বাংলাদেশের স্বীকৃতি নিয়ে নতুন করে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন যে বাংলাদেশ যে একটা কার্যকর সম্পর্ক চায় এর প্রমাণ পাওয়া না গেলে পাকিস্তানের জনগণ বাংলাদেশের স্বীকৃতি দান মেনে নেবে না। তিনি বলেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান এবং জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের বিষয়ে পাকিস্তানের বিরোধিতা অপরিবর্তনীয় নয়। তবে পাকিস্তানের কথা হল দুটি হাত এগুলেই তখন হাত মিলানো যায়।
সংবিধান সুখী সমাজ কায়েম নিশ্চিত করবে
তথ্য ও বেতারমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন সম্প্রতি গণপরিষদ যে সংবিধান অনুমোদন করেছে সেই সংবিধান দেশ একটি সুস্থ ও সুখী সমাজ প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা দেবে। তিনি চাঁদপুরে আয়োজিত এক জনসভায় বক্তৃতা করছিলেন। তিনি বলেন রক্তাক্ত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র দশ মাসের মধ্যেই আওয়ামী লীগ জাতিকে একটি সংবিধান দিতে পেরেছে। এমন নজির দুনিয়ায় আর কোথাও নেই। তিনি উল্লেখ করেন যে সংবিধানে দেশের অবহেলিত মেহনতী মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়েছে এবং এর মাধ্যমে দেশে কৃষক-শ্রমিক রাজ নিশ্চিত হবে।
জনসভায় তিনি আওয়ামী লীগের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস বর্ণনা করেন। তিনি বলেন জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আওয়ামী লীগ সংগ্রামের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। আত্মনির্ভরশীলতার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, দেশ বড় হোক আর ছোট হোক, যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে তবে সেই দেশের সমৃদ্ধি ও উন্নতি হয় না।








