behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

রমরমা আইসিইউ ব্যবসায় হাসপাতাল!

জাকিয়া আহমেদ০৮:৪৭, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৬

আইসিইউ ব্যবসায় হাসপাতালসাধারণত সংকটাপন্ন ও জটিল রোগীদের আইসিইউ বা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু স্বজনদের ভুল বুঝিয়ে সাধারণ রোগীদেরও আইসিইউতে নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। রোগীর স্বজনদের আবেগকে পুঁজি করে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিক এ ধরনের অনৈতিক ‘ব্যবসা’করছে। অকারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে রোগীর পরিবার,কেউ কেউ হচ্ছেন নিঃস্ব।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন অর্থ জরিমানা করলেও সে বিষয়ে তোয়াক্কা করছে না হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো। একই কায়দায় চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অর্থ আদায়ের বাণিজ্য। বলা হয়ে থাকে, হাসপাতালগুলো জরিমানা দেয় লাখ লাখ টাকা, আর উপার্জন করে কোটি কোটি টাকা। তাহলে তাদের জরিমানা দিতে সমস্যা কোথায়!
চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যখন কোনও ব্যক্তির স্বাভাবিক সিস্টেমগুলো একদমই কাজ করে না, যখন তাকে ইন্সট্রুমেন্টাল সার্পোট দেওয়ার প্রয়োজন, তখনই কেবল তাকে আইসিইউতে নিতে হয়। যেমন- যদি কারও ব্লাড প্রেসার (রক্তচাপ) অনেক কমে যায়, তখন তাকে একদম কন্টিনিউয়াস মনিটর করে ব্লাডপ্রেসার বাড়ানোর জন্য ওষুধ দিতে হয় কিংবা যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া যদি কারও শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তখন তাকে আইসিইউতে নিতে হয়। অর্থ্যাৎ যার নিবিড় পরিচর্যা দরকার কেবল তাকেই আইসিইউতে নিতে হবে, তার আগে নয়।
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে রোগী ভর্তি হলেই তাকে আইসিইউতে নেওয়া হচ্ছে এবং সেখানে তাকে দিনের পর দিন রাখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন,আইসিইউ থেকে অর্থ আদায় করতেই হাসপাতালগুলো এ ধরনের অনৈতিক কাজ করছে।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল মৃত শিশুকে চিকিৎসার নামে আইসিইউতে রেখে তার পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছিল। র‌্যাব অভিযানে গিয়ে বিষয়টি ধরে ফেলে। এ ঘটনায় জাপান-বাংলাদেশ হাসপাতালের বিরুদ্ধে কেন মামলা হবে না জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

অভিজাত স্কয়ার হাসপাতালে শুধু আইসিইউতে সিট ভাড়া প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা। বাকি খরচ নির্ভর করে রোগীর অবস্থার ওপর। সে ক্ষেত্রে খরচ ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকে। রোগীর প্রয়োজন ভেদে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার ওপর নির্ভর করে খরচের হার।

অন্যদিকে রাজধানীর আরেক অভিজাত ইউনাইটেড হাসপাতালে আইসিইউ ভাড়া প্রতিদিন ৯ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয় রোগীর চিকিৎসা খরচ,চিকিৎসক-নার্স, ওষুধসহ আরও অনেক কিছু। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন খরচ পড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। রোগীর লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন হলে এ খরচ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

আইসিইউমাঝারি মানের শমরিতা হাসপাতালে আইসিইউতে প্রতিদিন বেড ভাড়া ১২ হাজার টাকা। চিকিৎসক ফিসহ অন্যান্য খরচ পড়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। মাঝারি মানের সেন্ট্রাল হাসপাতালে আইসিইউতে প্রতিদিন ভাড়া সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে ছয় হাজার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই হাসপাতালে আইসিইউ দুই ধরনের। একই রুমের ভেতরে দুই ভাগে রাখা হয় রোগীদের। যাদের অবস্থা বেশি সংকটাপন্ন তাদের রাখা হয় সাড়ে ছয় হাজার টাকার বেডে।
অপরদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, নিউরোসায়েন্স অব ইনস্টিটিউট, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, মিটফোর্ড  হাসপাতাল সরকারি বলে সেখানে আইসিইউতে কোনও খরচ হয় না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে খরচ তুলনামূলক কম।
আইসিইউ, সিসিইউ এবং এনআইসিইউ নিয়ে অভিযোগ থেকে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা হাসপাতাল ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে দেশের নামী দামি হাসপাতালগুলোও মুক্ত হতে পারছে না। অহেতুক রোগীদের আইসিইউতে রেখে তারা মোটা অংকের টাকা চার্জ করে থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই রোগীদের রাখা হয় আইসিইউতে।
গত ২ ফেব্রুয়ারি উত্তরার কেয়ার স্পেশালাইজড অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালকে সাত লাখ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, অভিযানের সময় আদালত দেখতে পান, সেদিন ওই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১১ রোগীর ছয়জনকেই আইসিইউতে পাঠানো হয়েছে। এমনকি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই কয়েকজন রোগীকে সেখানে রাখা হয়।

অপরদিকে একই এলাকায় গত ২৫ জানুয়ারি রিজেন্ট হাসপাতালকে ছয় লাখ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সূত্র জানায়, হাসপাতালটি অতি সাধারণ রোগে আক্রান্তদেরও আইসিইউতে রেখে অর্থ আদায় করছিল। ৩০ শয্যার হাসপাতালটিতে সেদিন ১২ জন রোগীর সাতজনই ছিলেন আইসিইউতে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তানভীর আহমেদ বলেন, ‘ছোট ছোট যেসব হাসপাতাল-ক্লিনিক আইসিইউ-এইচডিইউ নিয়ে ব্যবসা করছে, তাদের এসব স্থাপনের কোনো অনুমতি নেই। এগুলো নিয়ে আগে সরকারের তদন্ত করা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘অনেক জায়গাতেই অনৈতিক অনেক কিছু হচ্ছে, সব জায়গায় হচ্ছে এটা বলা যাবে না। সাধারণত লাইফ সাপোর্ট তখনই দেওয়া হয় যখন কেউ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে যায়। অনেক পরিবারই চায় রোগীকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে হলেও বাঁচিয়ে রাখতে। এই সুযোগটাই নেয় হাসপাতালগুলো। বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে আইসিইউয়ের জন্য পর্যাপ্ত কনসালট্যান্ট নেই, যন্ত্রপাতি নেই, সহযোগী সাপোর্টও নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘গলিতে গলিতে ১৫/২০ বেডের হাসপাতালগুলোতেও আইসিইউ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এদের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং মন্ত্রণালয়ের চিরুণি অভিযান চালানো উচিত। এসব ছোট ছোট হাসপাতালেই সবচেয়ে বেশি খারাপ-মর্মান্তিক বিষয়গুলো ঘটে, যেগুলো আমাদের চোখের আড়ালে রয়ে যায়।’

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে  দেখা যায়, অনুমোদন না নিয়েই সেগুলো আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ চালু করেছে। আর এসব তারা করছে রোগীদের সেখানে ভর্তি করিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের আশায়। সেখানে না আছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কিংবা নার্স। এমনকি নেই প্রয়োজনীয় অত্যাবশ্যাকীয় যন্ত্রপাতিও।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) শামিউল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসব বিশেষায়িত সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অধিদফতর কিছু বিশেষ শর্ত ঠিক করে দিয়েছে। নতুন পুরনো সবাইকেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেসব শর্ত মেনে চলতে।’
স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপ-পরিচালক (হাসপাতাল-১) ডা. একেএম সাইদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক পরিচালনার জন্য দ্য মেডিক্যাল প্রাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন্স) ১৯৮২ অনুযায়ী শুধু ক্লিানিক বা হাসপাতালের অনুমোদন নিয়ে কেউ আইসিইউ, এনআইসিইউ, সিসিইউ, ডায়ালাইসিস,৪ মানসিক রোগ ও মাদকাসক্তি এবং ডেন্টাল রোগের চিকিৎসা দিতে পারবে না। শুধু মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি রোগের চিকিৎসা ছাড়া আর কোনও চিকিৎসা দেওয়ারও এখতিয়ার তাদের নেই।’

 

/এমএসএম/এজে/আপ-এফএস/

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ