আইসিইউ: সরকারি হাসপাতালে সুযোগ কোথায়?

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১৬:৫৬, মার্চ ২৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৮, মার্চ ২৮, ২০১৬

আইসিইউআন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি সরকারি হাসপাতালে মোট বেডের ১০ ভাগ আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চলছে অরাজক অবস্থা। দেশের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালই এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এই হাসপাতালে মোট ৩ হাজার বেডের অনুপাতে ৩০০টি আইসিইউ বেড থাকার কথা, কিন্তু আছে মাত্র ২০টি। এর মধ্যে একটির মেশিন নষ্ট।
এদিকে প্রতিদিনই হাসপাতালটির আইসিইউ বিভাগের খাতায় জমা হচ্ছে আবেদনকারী রোগীর নাম। প্রতিদিন গড়ে অর্ধশত রোগী আবেদন করে থাকেন। ২৭ মার্চ আইসিইউ বিভাগের খাতায় দেখা গেছে, বিকেল পৌনে তিনটা পর্যন্ত আইসিইউয়ের জন্য নাম লিখিয়েছেন ১৮ জন। এ অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ থাকলেও আইসিইউয়ের বেড পেতে অনেক রোগীকে ২০-২৫ দিন অপেক্ষা করতে হয়। বেড না পেয়ে স্বজনরা রোগীকে অন্য হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ভর্তি করান।
আইসিইউতে সিরিয়াল দিতে আসা শামসুর রহমান বাংলাট্রিবিউনকে জানান, তার শাশুড়ি ঢামেকে ভর্তি আছেন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে স্থানান্তরের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু কোনও বেড খালি নেই।
তিনি বলেন, এতো বড় সরকারি হাসপাতাল থেকে যদি রোগীদের ফিরিয়ে নিতে হয়, তাহলে আর কোথায় যাব।

শুধু ঢাকা মেডিক্যালই নয়, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতাল, ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, নিউরোসায়েন্সেস, মিটফোর্ড হাসপাতালসহ বিভাগীয় শহরগুলোতেও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেই পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা। আর জেলা কিংবা উপজেলা পর্যায়েও হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে যেখানে ঠিকমতো স্বাস্থ্যসেবাই পাওয়া যায় না সেখানে আইসিইউ সেবা তো চিন্তাও করা যায় না।

অপরদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইসিইউ বিভাগের সামনে থাকা এক নারী জানালেন, তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। এক পর্যায়ে তাকে আইসিইউতে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ২৬ দিন অপেক্ষার পর তিনি অনেক চেষ্টা-তদবির করে একটি বেড পেয়েছেন।

আইসিইউ

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ কম থাকার কারণে পুকুরচুরি করছে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখেই সরকারের উচিত ঢাকাসহ সব বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বেডের সংখ্যা বাড়ানো।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে রয়েছে ২৮টি বেড, মিটফোর্ড হাসপাতালে ৯টি, জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতাল ও পঙ্গু হাসপাতালে ৮টি, নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে ৬টি, ঢামেকের বার্ন ইউনিট, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ বেড রয়েছে।

জানা গেছে, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৬টি এবং চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১২ শয্যার আইসিইউ রয়েছে। অপরদিকে, রাজশাহী, রংপুর, গোপালগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউয়ের সংখ্যা ১০টি। গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা জেনারেল হাসপাতালে রয়েছে ২টি করে বেড। শেখ আবু নাসের হাসপাতালে ৭টি এবং সাতক্ষীরা হাসপাতালে রয়েছে ৬টি বেড। মোটকথা, দেশের ৩০টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ৯টি ডেন্টাল কলেজের মধ্যে মাত্র ১৩টিতে আইসিইউ ইউনিট রয়েছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউয়ের অপর্যাপ্ততা স্বীকার করে নিলেন হাসপাতালের উপপরিচালক (প্রশাসন) আব্দুল গফুর। তিনি বলেন, ঢামেকে পর্যাপ্ত আইসিইউ বেড নেই। যে কয়টা আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। রোগীর অনুপাতে ঢাকা মেডিক্যালের আইসিইউ বেড সর্বনিম্ন ৫০টি হওয়া উচিত, তবে ১০০টি হলে আরও ভালো।

তবে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে কেবল যে আইসিইউ বেড সংকট তাই নয়, সংকট লোকবল এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিরও। সে কথাও এলো উপপরিচালকের বক্তব্যে। তিনি বলেন, আমাদের শুধু বেড পেলেই হবে না, আইসিইউয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল পেতে হবে। এখানকার জন্য দক্ষ জনবল, চিকিৎসক ও নার্স দরকার, যাদের আইসিইউতে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ থাকতে হবে।

একই কথা বলেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. সামিউল ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের প্রধান সমস্যা এই বিভাগের জনবল। পর্যাপ্ত লোকবল ছাড়া আইসিইউ করা যাবে না। জনবল বাড়ানোর দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। অনেক জায়গায় আমরা যন্ত্রপাতি দিয়েছি কিন্ত জনবলের অভাবে সেখানে আইসিইউ চালু করতে পারছি না। তাই সবার আগে জনবল বাড়িয়ে পর্যাপ্ত আইসিইউ করতে হবে। একইসঙ্গে মানসম্পন্ন আইসিইউ না হলে করা যাবে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়েও মোট বেডের আনুপাতিক হারে আইসিইউ বেড নেই বলে জানালেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার আব্দুল মজিদ ভুঁইয়া। বললেন, এই হাসপাতালের মোট বেড ১ হাজার ৫০০টি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আইসিইউ বেড থাকা উচিত ১৫০টি। কিন্তু এখানে রয়েছে ৯১টি। তবে অন্য সব সরকারি হাসপাতালের তুলনায় এখানে আইসিইউয়ের সংখ্যা সর্বোচ্চ।

সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড কম বলেই ঢাকার অলিগলিতে গজিয়ে ওঠা হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো দেদারসে আইসিইউ ব্যবসা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ঢাকা শহরে আইসিইউয়ের ব্যবসা চলছে বলে আমরা বিভিন্ন সময় জানতে পারি। এ আইসিইউগুলো একেবারেই ব্যবসায়ীক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে নয়। জীবন বাঁচানোর জন্য আইসিইউতে যেসব প্রযুক্তিগত আয়োজন দরকার হয়, এগুলোতে তা আছে কি না তা নিয়ে আমার যথেষ্ঠ সন্দেহ রয়েছে। এসব হাসপাতাল-ক্লিনিকে অভিযান চালালে শতকরা ৮০ ভাগই বন্ধ হয়ে যাবে।

/এজে/

লাইভ

টপ