দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন বিক্ষিপ্ত সহিংসতার ভোটে বেশির ভাগ আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ০৭:১৫, এপ্রিল ০১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:১৫, এপ্রিল ০১, ২০১৬

বিক্ষিপ্ত সহিংসতা ও অনিয়মের মধ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সম্পন্ন হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোট গ্রহণ। প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্যায়ে বৃহস্পতিবার দেশের ৪৭টি জেলার ৬৩৯টি ইউনিয়নে ভোট গণনা শেষ হয়। এ সময় সংঘর্ষ ও অনিয়মের কারণে ৩৩ কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। সংঘর্ষে ৮ ব্যক্তি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও অনিয়মের কারণে সামগ্রিক অর্জন ম্লান হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ। আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য দাবি করলেও বিএনপির দাবি- বেশির ভাগ ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে ভোট গ্রহণ হয়েছে প্রকাশ্যে, এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়নি।সিরাজগঞ্জে বাহুলী ইউনিয়ন-৬

প্রথম পর্যায়ের মতোও এবারও বেশির ভাগ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা। শুক্রবার সকাল সাতটা পর্যন্ত বাংলা ট্রিবিউন প্রতিনিধিদের পাঠানো সর্বশেষ তথ্যে ৫৭৪টি ইউনিয়নের ফলাফল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩৯১টি ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী, ৬৬টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী, ৬০টিতে বিএনপি প্রার্থী, ১০টিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী, ৪টি জাতীয় পার্টি, ২টিতে জাসদ ও ৩৪টি ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।

ভোট চলাকালে সংঘর্ষে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, জামালপুরের মেলান্দহ, যশোর সদর, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, মানিকগঞ্জের দৌলতদিয়ায় নারী ও শিশুসহ মোট ৮ জন নিহত হয়েছেন। সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের চর বাউড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেই আওয়ামী লীগ মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে তিন জন নিহত হয়েছেন। জামালপুর, যশোর, ঢাকা ও মানিকগঞ্জে একজন করে নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বেশির ভাগ জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ হয়েছে দাবি করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেছেন, কয়েকটি বিছিন্ন ঘটনা সামগ্রিক অর্জনকে কিছুটা ম্লান করেছে। বৃহস্পতিবার ইসি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিইসি বলেন, কেরানীগঞ্জে ১টি শিশু ও ভোলায় সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এজন্য দুঃখ প্রকাশ করছি এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করে দোয়া করছি। সিইসি জানান, গোলযোগ ও অনিয়মের কারণে ৩৩টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। বেশির ভাগ এলাকায় শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের ধন্যবাদ জানান সিইসি। সিইসি বলেন, অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রথম ধাপে নিয়েছি। দ্বিতীয় ধাপেও নেব। ভবিষ্যতে পরিস্থতির উত্তরণ হবে, আরও ভালো নির্বাচন হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে আওয়ামী লীগ। বৃহস্পতিবার দলের ধানমণ্ডি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, ছয় হাজারের বেশি কেন্দ্রের মধ্যে ২২টিতে সামান্য কিছুটা ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে। তাই নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ বলার সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে ছিল। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। অভিযোগ ছাড়া কিছু করার না থাকায় বিএনপি শুধু শুধু নালিশ করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, দফতর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, কার্যনির্বাহী সদস্য এসএম কামাল হোসেন ও সুজিত রায় নন্দীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

ইসির তথ্যমতে, দ্বিতীয় ধাপে ৬৩৯ ইউপিতে মোট ৩০ হাজার ৩৮৩ জন প্রার্থী রয়েছেন। চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী দুই হাজার ৬২৬ জন। সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে ছয় হাজার ৪৯৮ জন, সাধারণ সদস্য পদে ২১ হাজার ২৫৯ জন। এসব ইউপিতে মোট ভোটার ১ কোটি ১২ লাখ ১২ হাজার ৩৩৪ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৬ হাজার ২০৫টি। ভোটকক্ষ ২৩ হাজার ২১টি। প্রিজাইডিং অফিসার ছয় হাজার ২০৫ জন, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ৩২ হাজার ২১ জন ও ৬৪ হাজার ৪২ জন পোলিং অফিসারসহ সর্বমোট নির্বাচনে মোট ১ লাখ দুই হাজার ২৬৮ জন ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। এই ধাপে আওয়ামী লীগের ৩১ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় ৬০৮ ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে ভোট গ্রহণ করা হয়।

২২ মার্চ প্রথম দফায় ৭১২ ইউপিতে ভোট হয়। গতকাল দ্বিতীয় দফায় ভোট হয় ৬৩৯ ইউপিতে। তৃতীয় দফায় ২৩ এপ্রিল, চতুর্থ দফায় ৭ মে, পঞ্চম দফায় ২৮ মে ও ষষ্ঠ দফায় ৪ জুন ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, ইউপি নির্বাচনে ঢাকার কেরানীগঞ্জে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে ১০ বছরের এক শিশু নিহত হয়েছে। নিহত শিশুটির নাম শুভ ঘোষ। তার বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হযরতপুর ইউনিয়নের মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল বাশার মো. ফখরুজ্জামান জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানান, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার বাউরিয়া ইউনিয়নে ভোটকেন্দ্র দখলের লড়াইয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন পুলিশের এক কনস্টেবলসহ অন্তত আরও দশজন যাদের পাঁচজনই হয়েছেন গুলিবিদ্ধ। দ্বিতীয় দফার ইউপি নির্বাচনে ভোট গ্রহণ চলাকালে দুপুরের দিকে চর বাউরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সন্দ্বীপের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ওবায়দুর রহমান।

নিহতরা হলেন সানাউল্লাহ, ইব্রাহিম ও জামাল। ‍নিহতরা বাউরিয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী জালাল উদ্দীন ও একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী জিল্লুর রহমানের সমর্থক।

যশোর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের ভাতুড়িয়া স্কুল কেন্দ্রে নির্বাচন চলাকালে পুলিশ-সন্ত্রাসী সংঘর্ষে আবদুস সাত্তার বিশে (৬৫) নামে এক ফেরিওয়ালা নিহত হয়েছেন। তার কপালে গুলি ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে বোমার স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়। জেলার পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ দশ রাউন্ড গুলি ছোড়ে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, ব্যাপক সহিংসতার মধ্য দিয়ে জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার ইউপি নির্বাচন শেষ হয়েছে। এ সময় ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, সংঘর্ষ ও গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। নিহতের নাম রফিকুল ইসলাম (৫০)। তবে মেলান্দহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাসিমুল ইসলাম দাবি করেছেন, রফিকুল ইসলাম হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নে ভোট না দেওয়ায় এক নারীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নিহত নারীর নাম নমেসা বেগম(৫৫)। ইউনিয়নের সদস্য প্রার্থী তোতা দলবল নিয়ে হামলা চালিয়ে তাকে কুপিয়ে হত্যা করেন। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। দৌলতপুর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল নিশাত বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক ছাত্র নিহত হয়েছেন। নিহত সুজন মৃধা (২২) মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র। তিনি বেসরকারিভাবে ইউপি বিজয়ী সদস্য প্রার্থী মোতালেব মৃধার নাতি। মাদারীপুর পুলিশ সুপার সরোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে সুজন মৃধার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ- পুলিশের গুলিতে সুজনের মৃত্যু হয়েছে।

/এআরআর/এএ/এএইচ/আপ-এআর/

লাইভ

টপ