‘জাস্ট ফর ফান’ফেসবুকে বিকৃত ‘আলাপে’ মত্ত প্রজন্ম

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৭:১৯, এপ্রিল ০১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৯, এপ্রিল ০১, ২০১৬




ফেসবুক চ্যাটফেসবুকে ‘ফানপেজ’ হিসেবে খ্যাত একটি পেজে পরিচয় হয় রুমানা-রায়হানের। ‘ফানপেজ’ নাম হলেও সেখানে প্রতি পোস্টে ‘বিকৃত যৌনালাপ’ হয়ে থাকে। বিভিন্ন পোস্টে কমেন্ট করার মাধ্যমেই তাদের পরিচয় থেকে প্রেম হয়। একসময় মফস্বল শহরের মেয়ে রুমানা একদিনের জন্য বন্ধুর বোনের বিয়েতে ঢাকায় এসে রায়হানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একসঙ্গে একদিন থাকেন তারা। পরে জানতে পারেন, রায়হানের ঘর-সংসার আছে, রুমানা তখন কলেজের প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী।
সাইবার অপরাধ নিয়ে যে আইনজীবীরা কাজ করছেন তারা বলছেন, এ ধরনের অভিযোগ প্রায়ই পান তারা। প্রমাণসহ প্রতারণার নানা জিনিস নিয়ে স্কুল-কলেজের মেয়েরা উপস্থিত হন। কিন্তু সমাজ ও পরিবারের ভয়ে ঠিকমতো অভিযোগ করতেও পারেন না। আইনজীবীরা বলছেন, স্কুলিং আর মনিটরিংয়ের অভাবে কিশোর-কিশোরীরা ভুলভাবে সাইবারজগৎ ব্যবহার করে বিপথে যাচ্ছে, বিপদে পড়ছে। তাদের পর্যবেক্ষণ, ১০ থেকে ১৮ বছরের ছেলেমেয়েরা মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে।
ফেসবুকে এ ধরনের ৫টি পেজ দুই সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সেখানে নারীদের প্রতি অসম্মানজনক মন্তব্য, যে কোনও মেয়ের ছবি অনুমতি ছাড়াই ট্যাগ দিয়ে প্রকাশ করা, মাদক নেওয়ার ছবি দিয়ে হিরো সাজা, চটুল যৌন গল্প থেকে শুরু করে ইঙ্গিতপূর্ণ ভিডিও আপ করা হচ্ছে। এসব পেজে কেবল ছেলেরা মেয়েদের হয়রানি করে এমন না, এখানে অনেক মেয়েও ছেলেদের টোনেই মেয়েদেরই হয়রানি করে। কিন্তু এমন ফান করতে গিয়ে, পরস্পরকে কথার মাধ্যমে হয়রানি করার পাশাপাশি জড়িয়ে পড়ছে বড় ধরনের অপরাধের সঙ্গে।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে এ ধরনের প্রায় অর্ধশত পেজ সক্রিয়। এসব ফেসবুক পেজে যে কোনও আলাপের ক্ষেত্রেই যৌন উদ্দীপক শব্দের ব্যবহার করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছদ্মনাম ব্যবহারের প্রবণতা আছে। এদের অনেকের সঙ্গে আলাপ করে বোঝা গেছে তারা স্কুল শিক্ষার্থী। এমন দশজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা দল বেঁধেই এসব পেজে থাকে। বড়দের সঙ্গে থাকতে পারার লোভে তারা তাল মিলিয়ে যৌনালাপ চালিয়ে যায়।

এই পেজগুলো সাধারণত রাত ১০টার পর থেকে বেশি সক্রিয় থাকে। তবে সারাদিনই কমবেশি আলাপ চলে। এদের বেশিরভাগই শহুরে ছেলেমেয়ে, যাদের কাছে রাতদিন ইন্টারনেট চালানোর যথেষ্ঠ অর্থ আছে।

বাজে ভাষায় কথা বলার বিষয়ে জানতে চাইলে এক স্কুলছাত্র খিস্তি দিয়েই কথপোকথন শুরু করে। পরে উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে স্বাভাবিক হয়ে বলে, ‘জাস্ট ফর ফান, নাথিং এলস’ (শুধুই মজা করার জন্য, অন্য কিছু নয়)। সে জানায়, তার পরিচিত প্রায় ৩০ জন নানা পেজে আছে। কেউ একজন আক্রান্ত হলে সবাই মিলে সেখানে আক্রমণ করে। এটাই খেলা। কিন্তু এই খেলায় তারা যে ভাষা ব্যবহার করছে, তা শিখলো কিভাবে জানতে চাইলে সে বলে, ‘বড় ভাইয়েরা আছেন, বিভিন্ন পর্নোসাইট আছে। ছেলেদের নামে অনেক মেয়েও অ্যাকাউন্ট চালায় বলে সে জানায়।

তিন লাখ সদস্যের ‘যৌনশিক্ষা’ নামের পেজে +১৬ লেখা থাকলেও সেখানে ১৬ বছরের নিচে যে কেউ ঢুকতে পারে। নেই কোনও মনিটরিং। গবেষণা বা জরিপ নয়, নিজেদের মনিটরিং থেকে বলা যায়, এই বয়সী ছেলেমেয়েরা সাইবার জগতকে যেভাবে ব্যবহার করছে সেটা ভয়ানক রূপ নিতে পারে।

সাইবার হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে গঠিত সাইবার হেল্প ডেস্কের তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিন তারা শতাধিক অভিযোগ পেয়ে থাকেন, যার ৬০ ভাগেরও বেশি ফেসবুক নিয়ে। যার ১০ ভাগের মধ্যে রয়েছে অন্যের ছবিতে ছবি জুড়ে দেওয়া এবং পর্নোগ্রাফি।

সাইবার হেল্প ডেস্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত প্রায় দুই বছরে অভিযোগ জমা পড়েছে ১৭ হাজারের বেশি। এর মধ্যে গত মাসে ৭ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ে।

ব্যাংক কর্মকর্তা রিয়াজুল বারীর ১২ বছর বয়সী সন্তান আছে। তিনি বলেন, এখনকার ছেলেমেয়েরা যা করতে চায়, তা থেকে বিরত রাখাটা মুশকিল। আমরা চেষ্টা করি, যাতে সে খুব বেশি সময় অনলাইনে না কাটায়। তাকে পারিবারিক কাজগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখার চেষ্টা করা হয়। তারপরও চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু এদিক সেদিক করে নিশ্চয়। অভিভাবকদের সতর্ক থাকার বাইরে করণীয় কিছু নেই বলেই আমার ধারণা। কারণ প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তাদের এসব থেকে সরিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় কোনও উদ্যোগ নেই।

মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, এসব পেজ কেউ পর্যবেক্ষণ করে বলে মনে হয় না। আর অভিভাবকদের ধারণাও নেই তাদের ছেলেমেয়েরা রাত জেগে কোন জগতে বাস করছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পেজগুলো বন্ধ করা দরকার আর অভিভাবকদের দেখা দরকার, নির্দিষ্ট একটা বয়সের বাইরে সন্তানরা যেন এসব যৌনালাপে অভ্যস্ত না হয়, ফেসবুক ব্যবহার না করে।

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এ বিষয়ে বলেন, খেয়াল করেছি, পর্নোগ্রাফি এবং অন্যের ছবির সঙ্গে ছবি জুড়ে দিয়ে ছবি বিকৃত করার অভিযোগ বেশি আসছে। ফেসবুকের চ্যাট বা ভিডিও চ্যাটের ছবি একটু এদিক-ওদিক করে বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিডিওচিত্র, অডিও রেকর্ডিং ইউটিউবে বা বিভিন্ন পর্নোসাইটে শেয়ার করা হচ্ছে। মনিটরিং মানে যে সব বন্ধ করে দেওয়া নয় এটা অনুধাবনে নিতে হবে।

/এজে/

লাইভ

টপ