behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

একান্ত সাক্ষাৎকারে শবনম ফেরদৌসীমুক্তিযুদ্ধের বেশিরভাগ ইতিহাস চাপা পড়ে আছে

উদিসা ইসলাম২০:৪১, এপ্রিল ০১, ২০১৬




শবনম-ফেরদৌসী
মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের পর বীরাঙ্গনাদের জন্য এদেশ কিছু করতে পারেনি বলে মনে করেন নির্মাতা শবনম ফেরদৌসী। তার মতে, যে সমাজ ‘লজ্জা ঢাকতে’ এতোগুলো সদ্যজাত শিশুকে ‘হত্যা’ করতে পারে, সে সমাজ মানবিক নয়, নিষ্ঠুর। অন্তত মুক্তিযোদ্ধারাতো সত্যটা জানতেন, তারা কয়জন শিশুর দায়িত্ব নিয়েছেন? যে শিশুদের মাদার তেরেসা হোমসের মাধ্যমে বিদেশ পাঠানো হলো, বড় হয়ে তারা মাকে খুঁজতে বাংলাদেশে এসেছে, কেউতো বাবাকে খুঁজতে পাকিস্তান যায়নি। এই ক্ষোভ এই ক্রোধ নিয়ে তিনি তৈরি করেছেন যুদ্ধশিশুদের নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র ‘জন্মসাথী’। ২০০০ সাল থেকে কাজ শুরু করে ১৮টি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন শবনম। তিনি মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের বেশিরভাগ ইতিহাসই চাপা পড়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধ, জীবনযুদ্ধ এবং নির্মাণ নিয়ে বাংলা ট্র্র্রিবিউনের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন।

জন্মসাথীর কাজ শুরু হলো কবে?
কাজটা শেষ করার পর এখন মনে হচ্ছে, শুরু আমার জন্মকে ঘিরে, জন্ম থেকেই।

একটু খুলে বলুন...
মা খুব ভাল গল্প বলতে পারতেন। প্রতি সন্ধ্যায়, রাতে, খেতে খেতে মা আমাদের গল্প শোনাতেন। আমাদের জন্মের ইতিহাসটা তিনিই এতো সুন্দর করে গল্পের মতো করে বলেছেন। তাই সে সময় যা ঘটেছে আমরা তার পুরোটা চিত্রিত করতে পারি। আমার জন্ম ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে হলিফ্যামিলি হাসপাতালে। ওইদিন সেখানে ১৩ টা বাচ্চা জন্মেছিল, তার মধ্যে ৩/৪জন যুদ্ধশিশু ছিল। মা এই গল্প শোনাতে শোনাতে আমাদের বড় করেছেন। শুরুতে হয়তো বুঝতাম না কেন তারা গুরুত্বপূর্ণ। পরে গল্প শোনার কারণেই আমি মনে মনে তাদের খুঁজেছি, তারা কোথায়, সবাই জন্মদিন পালন করে কিনা, ছেলে না মেয়ে। এভাবেই আমার জন্মের গল্পকে ঘিরে এদের জানা, তাই মনে হয় এর শুরুও সেই জন্ম থেকেই।

জন্মসাথী বানানোর সময় বীরাঙ্গনা মায়ের সঙ্গে

এই যে আপনি শুরুতে মনে মনে এবং পরে প্রামাণ্যচিত্র বানানোর জন্য এই ১২ জনকে খুঁজতে গেলেন, পেলেন কি?
আমি একই সময়ে একই দিনে জন্ম নেওয়া আমার হারিয়ে যাওয়া সঙ্গীদের খুঁজতে চাইলাম। কিন্তু তাদের কাউকে পাইনি। তাদের পাওয়া যাবে না, এটা বেশ আগেই বুঝতে পেরেছি। কারণ কোনও নথিপত্র রাখা হয়নি, কারও জন্মের কোনও ইতিহাস রক্ষিত নেই। এমনকি সেইদিন ওই একই হাসপাতালে আমিও যে জন্মেছিলাম সেই চিহ্নও নেই, কেবল আমাদের কাছে তখনকার নেওয়া ছোট যে জন্মকার্ড আছে সেটা ছাড়া।

যুদ্ধশিশু শামসুন্নাহারের সঙ্গে

এই যে কোনও দালিলিক চিহ্ন নেই, তাহলে কাজটা শুরু করলেন কীভাবে?
এ ছবির শুটিং হয়েছে এক বছর ধরে। শুটিং করে এসেই এডিটিংয়ে বসেছি। একটা থেকে একটা সূত্র খুলে গেছে। তথ্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে নির্মাতার সামনে একটা মুহূর্ত আসে যখন সব খুলে যায়। বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করছিলাম, এইসময় মনোয়ারা ক্লার্ককে পাওয়া গেল। ঠিক তখন কেমন করে আরেকজন ‘যুদ্ধশিশু’ সুধীরকে পেলাম, হঠাৎই। আর শামসুন্নাহার যেহেতু যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষী, তাকে পেলাম প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজের মাধ্যমে। শুরু থেকেই আমি চেয়েছিলাম, দেশে যারা বেড়ে উঠেছেন তাদের জীবনটা কেমন কাটলো সেটা খুঁজে দেখতে।

কিন্তু তারা ক্যামেরার সামনে কি কথা বলতে চাইলেন?
আমি খুব ভয়ে ছিলাম, রাজি হবে কি না। কিন্তু ওদের সঙ্গে মিশে, কথা বলে দেখলাম, ওরা এখন জানাতে চায়। প্রক্রিয়াটা শুরুর সময় একবার খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছে ওদের, আবার কোথায় যেন অন্যরকম। প্রথম দেখায় আমরা কেউ কারও সঙ্গে কথা বলিনি। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে থেকেছি। কিন্তু ওই তাকিয়ে থাকাতেই দ্রুত আমাদের বন্ধুত্ব হয়েছে এবং এই যে বন্ধুত্ব-সখীত্ব, সেখান থেকেই আমার ছবির নাম বেরিয়ে এলো ‘জন্মসাথী’। প্রথমে নাম ছিল ‘জন্মেছি এই বঙ্গে’।

 

 

শবনম ফেরদৌসীর সঙ্গে প্রতিবেদক

 

সম্প্রতি আমিও বীরাঙ্গনাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখেছি, কেউ তাদের পরিচয় দিতে এখনও চান না। আমরা যে তাদের ‘বীরাঙ্গনা’ নামটা দিলাম, এটা কি তাদের চোটের ওপর আরও আঘাত হিসেবেই সে সময় এসেছিল বলে মনে করেন, নাকি সঠিক মূল্যায়নই হয়েছে?
আমরা অনেকেই ‘বীরাঙ্গনা’ বলার বিপক্ষে কথা বলি। সেই দলে পুরুষরা নেই। তারা ভিকটিম হিসেবে দেখতে চান। আমার কথা হলো, ঠিক আছে ভিকটিমই বলেন, এই ভিকটিমদের জন্য কী করেছেন? একটা নাম দিয়ে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। একজন আহত ব্যক্তি যদি আহত মুক্তিযোদ্ধা হন, তাহলে ওই নারীরা কেন মুক্তিযোদ্ধার সম্মান পেলেন না শুরু থেকে? এতোদিন পরে বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নতুন করে পরিচয় করাতে চাওয়ার মানেই হলো- সে সময় নামকরণ ঠিক ছিল না, এটা এখন প্রমাণিত। আজকে তাদের স্বীকৃতি দিলেই কি না দিলেই কি। তারা যে ৪৫ বছর কাটিয়ে এলেন, সেটা কি আমরা ধারণ করি। আমাদের অনেক কৃষক আছেন হাল ছেড়ে যুদ্ধ করতে গেছেন, ফিরে এসে লাঙল নিয়েছেন, সার্টিফিকেটের জন্য অপেক্ষা করেননি। মুক্তিযোদ্ধারা কখনও কোনও বীরাঙ্গনার খোঁজ নিয়েছেন, তারাতো সত্যটা জানতেন। এই কাজটা করতে গিয়ে মনে হয়েছে, আমাদের আশেপাশেই কিন্তু তারা হয়তো কষ্ট চেপে জীবন পার করেছেন, আমরা জানিও না।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম

/এজে/

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ