behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

সবার বুকে ছিল নৌকার ব্যাজগুলিবিদ্ধ শুভ ছটফট করলেও পুলিশ নিরাপদে দোতালায় ছিল

আমানুর রহমান রনি, কেরানীগঞ্জ থেকে ফিরে০২:৩২, এপ্রিল ০২, ২০১৬

শুভর দাদিকেরানীগঞ্জের মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রের মাঠে গুলিবিদ্ধ শিশু শুভ কাজী (৯) যখন ছটফট করছিল,তখন পুলিশ স্কুলের গেট বন্ধ করে দোতালার কক্ষে নিরাপদে ছিল। সন্ত্রাসীরা গুলি করতে করতে ভোট কেন্দ্র থেকে বের হয়ে গেলেও পুলিশ পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি। এমন অভিযোগ হযরতপুর ইউনিয়নের ঢালিকান্দি এলাকার ভোটারদের। একই অভিযোগ নিহতের পরিবারের সদস্যদেরও। ওই কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সেখানে পুলিশের সংখ্যা ছিল অপ্রতুল।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টার দিকে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্র দখলের সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয় শুভ কাজী (৯)।শিশুটি ওই স্কুলটিতেই চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তো। বাবার নাম হালিম কাজী। তিনি ভাড়ায় অটোরিকশা চালান। হালিমরা চারভাই। গত দশকে নদীভাঙনে তারা ভিটেমাটি হারিয়েছেন।এখনও ঢালিকান্দিতে অন্যের জমিতে ঘর তুলে থাকেন তারা।  

শুক্রবার দুপুরের পর সরেজমিনে ঢালিকান্দিতে নিহত শুভদের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই ছোট ছোট কয়েকটি টিনের ঘর।সরুপথ দিয়ে ভেতরে গিয়েই চোখে পড়ে ছোট্ট উঠানে নারীদের ভিড়। ভিড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখা যায়,মাঝখানে সত্তরোর্ধ্ব এক নারী বিলাপ করে ‘ভাই ভাই’ বলে কান্না করছেন।

শুভর স্কুল ব্যাগশরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে কাঁদলেও দেশের জ্যেষ্ঠ এই মানবীর কান্নার শব্দ হয়তো বিচার পেতে কোনও সহায়তাই করবে না। কারণ, তারা বিচার চাইতেও ভয় পান। করতে চান না কোনও মামলা।ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর কাছ থেকে জানা গেল, বৃদ্ধা নিহত শিশু শুভর দাদী।তার নাম সালেহা বেগম। তিনি যেখানে বসে কাঁদছিলেন তার সামনের পূর্বপাশের ঘরটিতেই স্ত্রী সুবর্ণা বেগম ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন অটোরিকশা চালক হালিম কাজী। দুই সন্তানের মধ্যে শুভ ছিল বড়। উঠানে বসে কথায় হয় সালেহা বেগমের সঙ্গে। নয় বছরের নাতির সঙ্গে থাকা স্মৃতিগুলো বারবার মনে করে ঢুকরে কেঁদে ‍উঠেন তিনি।
সালেহা বেগম বলেন,‘বৃহস্পতিবার সকালে ঘরের সঙ্গে থাকা আঁতা গাছ থেকে একটি আঁতা তাকে পেড়ে দিয়েছিল শুভ।পাখি পাকা আঁতাটি খেয়ে ফেলবে বলে ভাই আমার কাছে সেটি রেখেছিল। কিন্তু ভাই আমার আর এলো না। এর একটু পরই শুনি আমার ভাই আর নাই।’
তার অস্পষ্ট কথায় বারবারই বোঝা যাচ্ছিল তিনি ভাই-ভাই করে ‍শুভকে খুঁজছেন এখনও। শুভ তাকে বুইনা বলে ডাকত বলেও জানান তিনি।
সালেহা বেগমের কথা শোনার মধ্যেই চলে আসেন তার বড় ছেলে সালাল কাজী। তিনি দেশের বাইরে থাকেন।কিছুদিন আগে দেশে ফিরেছেন।ঘটনার সময় তিনি ভোটকেন্দ্র এলাকায় ছিলেন। শুভকে তিনিই স্কুলমাঠ থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।


ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সালাল কাজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘এক থেকে দুই মিনিট গোলাগুলি হলো। গুলি করতে করতে তারা (সন্ত্রাসীরা) ভোটকেন্দ্র থেকে বের হয়ে যায়। সবার বুকে নৌকার ব্যাজ লাগানো ছিল। ভোটকেন্দ্র থেকে দৌড়ে বাইরে আসা অনেকেই ওই সময় একটি বাচ্চাকে স্কুল মাঠে উপুর হয়ে পড়ে থাকতে দেখে। তারা ধারণা করছিল ছেলেটি আমার।আমি দৌঁড়ে ভেতরে গিয়ে দেখি সে আমার ছোট ভাই হালিমের ছেলে শুভ।আমি বাবা বলে চিৎকার করি। তাকে কোলে নিয়ে দৌড় দেই।কিন্তু স্কুলের মাঠের বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে শুভ দুটি শব্দ করে। তখনই আমি বুঝতে পারি বাবা আমার নেই। এরপর স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেই। তারা সেখান থেকে শিকদার মেডিক্যালে নিতে বলে। সেখানে নিয়ে যাই। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানায় শুভ আর নেই। আমরা শুভকে বাড়িতে নিয়ে আসি।পরে গুলি বের করার কথা বলে পুলিশ শুভর লাশ নিয়ে যায়।তারা রাতে আবার লাশ ফেরত দিয়ে যায়।’
শুভর চাচা সালাল কাজীর সঙ্গে কথা বলার মধ্যেই দুই বছরের মেয়ে হাফসাকে কোলে নিয়ে উঠনে আসেন শুভর বাবা হালিম কাজী।বাবা মা ও দাদির আহাজারি দেখে মাঝেমাঝেই কেঁদে উঠে হাফসা। ঘটনার সময় হালিম কাজীও ভোটকেন্দ্রেই ছিলেন। গোলাগুলির ঘটনার পর তিনি দৌড়ে স্কুলের বাইরে চলে আসেন। কিন্তু ছেলে যে ভোটকেন্দ্রে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে,তা তিনি জানতেন না।
হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ৪০ থেকে ৫০ জন একসঙ্গে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন। তাদের প্রত্যেকের বুকে নৌকার ব্যাজ লাগানো ছিল। এদের মধ্যে ১০ থেকে ১৫ জনের হাতে অস্ত্র ছিল। তারা গুলি করতে করতে বের হয়।কিন্তু কোনও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে দেখলাম না। তারা কাদের গুলি করে তাও বুঝতে পারিনি। গোলাগুলি যখন শুরু হয় আমি দৌড়ে বের হয়ে আসি। ভোট দেইনি। এসময় ভোটকেন্দ্রে ৩ থেকে ৪ জন পুলিশ ছিলেন। তারা স্কুলের গেটে তালা দিয়ে দোতালায় বসে ছিলেন। এক মিনিটের মধ্যে ভোটকেন্দ্রটি খালি হয়ে যায়। এরপর শুনি আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আমি সিএনজি নিয়ে শিকদার মেডিক্যালে যাই। গিয়ে শুনি ছেলে আমার বেঁচে নেই।’

শুভদের ঘর (2)এই ঘটনায় কারা জড়িত? কারোর নাম জানেন কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভাই আমি ছেলে হারিয়েও ভয়ে আছি।আমি চাই না আর কারও লাশ পড়ুক। আমি কাউকে চিনি না।’
মামলা করবেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে অসহায় বাবা বলেন,‘মামলা করে কি হবে। আমার ছেলে গেছে ছেলে তো পাবো না। আমার টাকা নাই, পয়সা নাই। মামলা দিয়ে কি হবে। আমার বিচারের দরকার নাই। আপনারা এসব বুঝবেন না।’
শুভর বাবার মুখে-চোখে আতঙ্ক।ছেলের হত্যাকারীদের চিনলেও তাদের নাম বলতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ খুনিরা যদি তাকেও হত্যা করে! তাই তিনি কথা বলতে ভয় পান।
তার সঙ্গে কথা বলে ঘরের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়,ঘরের খাটে আহাজারি করছে শুভর মা। তিনি শ্রাবণ, শ্রাবণ বলে কাউকে ডাকছেন। বার বার খাট থেকে উঠে বাইরের দিকে যেতে চাচ্ছেন। কিন্তু প্রতিবেশীরা তাকে ধরে রাখছেন। আবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছেন তিনি।
শুভর কালো স্কুল ব্যাগটিতে বই ভর্তি। ঘরের একটি কোনের চেয়ারে ব্যাগটি পড়ে আছে। যা দেখে বাবা-মা বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। শুভর বাবা-মা,দাদি ও স্বজনদের আহাজারিতে বাড়ির পরিবেশে ভারী। পুরো এলাকায় আতঙ্ক ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে।মুখ খুলেছে না কেউ।
এই ঘটনায় হাজেরা বেগম (৯০) নামে আরও এক বৃদ্ধা আহত হয়েছেন। তিনি একই গ্রামের বাসিন্দা। তাকে প্রথমে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয়।পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
শুভদের ঘর থেকে সন্ধার একটু আগে যখন বের হই,তখনই হযরতপুর ইউনিয়নের নবনির্বাচিত আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের (আয়নাল) আসেন ওই বাড়িতে। তিনি এসে সোজা শুভদের ঘরে চলে যান। সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর বের হয়ে শুভর বাবা হালিম কাজী ও চাচা সালাল কাজীকে বাড়ির পেছনে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে মিনিট পাঁচেক একান্তে কথা বলেন চেয়ারম্যান।
চেয়ারম্যান যখন শুভর বাবার সঙ্গে কথা বলে চলে যাচ্ছিলেন তখন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে তার কথা হয়। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার সমর্থকরা কেন্দ্রে সংঘর্ষ ও গোলাগুলি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, আপনি জানেন কিনা? এর উত্তরে চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আয়নাল বলেন, ‘এখানে মেম্বার প্রার্থীদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল বলে আমরা শুনছি। এখানে আমাদের বাড়ি না। এখানে বিএনপি প্রার্থী চেয়ারম্যানের বাড়ি। আমি কিছু জানি না। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই ব্যক্তিকে দেখিয়ে তিনি বলেন এরা আমার এজেন্ট।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান,আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থক রানা মোল্লার নেতৃত্বে ২৫-৩০ জন সশস্ত্র যুবক মধুরচর প্রাথমিক সরকারি বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন। তারা ছয়টি বুথ দখল করে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় সেখানে অবস্থানরত ভোটার ও পোলিং এজেন্টসহ অন্যরা দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। একপর্যায়ে ওই যুবকেরা পিস্তল দিয়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ভোটকেন্দ্র ত্যাগ করেন। এ সময় ভোটকেন্দ্রের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিশু শুভ কাজীর পেটে ও বৃদ্ধা হাজেরা বেগমের মাথায় গুলি লাগে। শুভকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নেওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। গুরুতর আহত হাজেরা বেগমকে প্রথমে স্থানীয় একটি ডাক্তারখানায় প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে তাকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
শুভর বাবা ও বোনপ্রিসাইডিং কর্মকর্তা সোলায়মান কবির ঘটনার পর সাংবাদিকদের বলেন, ‘সকাল ১০টার দিকে একটি গুলির শব্দ শুনতে পাই। এ সময় লোকজনকে দৌড়ে পালাতে দেখি। পরে শুনি একটি শিশু মারা গেছে। এ ঘটনায় প্রায় ১৫ মিনিট ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকে।’
উপপরিদর্শক (এসআই) তন্ময়সহ চারজন পুলিশ এবং ১২ জন আনসার সদস্য ওই ভোট কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন। ভোটকেন্দ্রটি বিএনপি প্রার্থীর বাড়ির পাশেই। এটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত। তারপরও সেখানে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়নি। নেওয়া হয়নি বাড়তি কোনও নিরাপত্তা।

ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছে,রানাসহ ২৫-৩০ জন যুবক ভোটকেন্দ্রে ঢুকে পোলিং কর্মকর্তার কাছ থেকে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তারা এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে বের হয়ে যান। তাদের গুলিতে শিশু শুভ নিহত হয়। এক পর্যায়ে ধাওয়া করলে তারা পালিয়ে যান।
পুলিশ ঘটনার সময় গেটে তালা লাগিয়ে স্কুলের দোতালায় অবস্থান করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।পুলিশ সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করার চেষ্টা করেনি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদাউস হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভোটকেন্দ্র থেকে ১শ গজ দূরে ঘটনাটি ঘটেছে। বাইরে দুই পক্ষ সংঘর্ষ করেছে। এসময় ওই ছেলেটি রাস্তায় আইসক্রীম খাচ্ছিল। তার গায়ে গুলি লেগেছে। এটা ভোটকেন্দ্রের কোনও ঘটনা না।’
এই ঘটনায় কোনও মামলা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, শিশুটির চাচা সালাল কাজী একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নম্বর ২৭। আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
/এআরআর/ এমএসএম /

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ