করপোরেট কর ফাঁকির কবলে বাংলাদেশ

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৭:৪৬, এপ্রিল ০৪, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৪৯, এপ্রিল ০৪, ২০১৬

এনবিআরপানামার একটি আইনি প্রতিষ্ঠানের ফাঁস হওয়া এক কোটি ১৫ লাখ কর নথি থেকে জানা গেছে, সাবেক ও বর্তমান ৭২ জন রাষ্ট্রপ্রধান তাদের দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনও তথ্য প্রকাশিত হয়নি। তবে বহুজাতিক (করপোরেট) প্রতিষ্ঠানগুলোর কর ফাঁকির কবলে পড়েছে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশনএইডের প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।
দরিদ্র দেশের কর কর্তৃপক্ষের চেয়ে ক্ষমতা ও বুদ্ধিতে কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকার সুযোগ নিয়ে বহুজাতিক সংস্থাগুলো কর দেওয়া থেকে বিরত থাকে। আর ছলেবলে কৌশলে ওই সংস্থাগুলো হয় আরোপিত কর মওকুফের কোনও বিশেষ সুবিধা প্রাপ্তির বন্দোবস্ত খোঁজে, না হলে কর কর্তৃপক্ষের কর্মপদ্ধতিতে অনধিকার চর্চা করে। গবেষকরা বলছেন, এসব নাটকীয় ঘটনা ঘটতে দেখা যায় দরিদ্র দেশগুলোতেই, যাদের খুব কম সংখ্যক প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা বা বিশেষজ্ঞ থাকে।
এই বিবেচনায় বিদ্যমান করপোরেট কর ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে করে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশনএইড। ‘সমৃদ্ধির পথে অগ্রযাত্রা: দায়িত্বপূর্ণ করপোরেট কর ব্যবস্থা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলছে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কৌশলে কর এড়িয়ে যাওয়ায় বড় অংকের রাজস্ব হারায় বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো। করপোরেট কর ফাঁকির কারণে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় প্রয়োজনীয় কর আদায়ে পিছিয়ে পড়ছে দেশ। ফলে জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় বাড়াতে পারছে না সরকার। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জটিল বিধি ও আইনের ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে এসব কোম্পানি আয়কর খাতায় ছলচাতুরি করে, যাতে বড় অংকের কর দেওয়ার দায়ভার এড়িয়ে যাওয়া যায়।
আর বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর করের আওতা বাড়ানো গেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক বিষয়ে সামাজিক বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে বলে মন্তব্য করেন অর্থনীতিবিদরা। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, পুরনো আইন-নীতি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি এবং স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার অভাবে বাংলাদেশে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কর দেয়ার ভালো প্রবণতা তৈরি হয়নি। যে কারণে বাংলাদেশ এখনও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১১ ভাগের বেশি কর আদায় করতে পারছে না। যেটা হওয়া উচিৎ জিডিপির ১৬ ভাগ।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, বর্তমান করপোরেট কর ব্যবস্থার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো। কীভাবে সেটা হয়, সে বিষয়ে তিনি বলেন, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল ব্যবসা এক দেশে। তারা বাংলাদেশে এসে ব্যবসা করে। আয় নিয়ে যায় তার মূল প্রতিষ্ঠানের দেশে। যুক্তি দেখায়, তারা আয়ের কর ওই দেশে দিচ্ছে। এই কৌশলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলো।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, আমাদের ট্যাক্স জিডিপি অনুপাত ১১ ভাগ। কিন্তু হওয়া উচিত ১৬ ভাগ। আমাদের দেশের করপোরেট প্রতিষ্ঠান দেশীয় আইন, বিদেশে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের জোরের কারণে যে কর দেওয়া উচিৎ, তা দেয় না। ফলে এ দেশের আয় চলে যায় অন্য দেশে। আইন পরিবর্তেনের কথা বলে তিনি বলেন, অধিকাংশ আইনই পুরনো। যার ফাঁক দিয়ে সবাই বেরিয়ে যায়।

কেন এই প্রতিবেদন তৈরি হলো, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, আমরা মনে করছি যে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কর দিচ্ছে না, তাদের ‘পজিটিভলি এনগেজড’ করা দরকার। যারা করের প্রতি আচরণ বদলাতে চায়, তাদের নিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার এটা শুরুর একটা কাজ।

গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের আজগর আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট সংস্থাগুলোর কর আচরণ সম্পর্কিত বিতর্ক যে বিষয়টিতে প্রকটভাবে আলোকপাত করেছে তা হলো- দায়িত্বশীল হওয়ার জন্য করপোরেট সংস্থাগুলো কোন কোন কাজ থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু কর বিতর্কের কোনও সুরাহা হয়নি। এই প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে অ্যাকশনএইড, ক্রিশ্চিয়ানএইড ও অক্সফাম সমৃদ্ধ কর চর্চা শুরুর লক্ষ্যে সেই অসমাধানকৃত বিতর্ক সামনে আনতে চায়।

/এজে/

লাইভ

টপ