পুলিশের নাকের ডগায় মাদক বাণিজ্য

Send
চৌধুরী আকবর হোসেন ও আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ১৯:১৫, এপ্রিল ০৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০৪, এপ্রিল ০৫, ২০১৬

জেনেভা ক্যাম্প
উপপুলিশ কমিশনারের কার্যালয় থেকে সামান্য দূরে জেনেভা ক্যাম্পে গড়ে উঠছে মাদকের বড় বাজার। ক্যাম্পের ভেতরে ও আশপাশে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে মাদকদ্রব্য। প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ টাকারও বেশি মাদকদ্রব্য বিক্রি হয় এখানে। এই মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে প্রায়ই বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পুরো এলাকার মাদক ব্যবসায় মদদ দিচ্ছেন ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজান। স্থানীয় বাসিন্দা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

পুলিশের তেজগাঁও জোনের উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ক্যাম্পটি কোনও পাহাড়ি এলাকা না হলেও বেশ দুর্গম। সেখানে বিভিন্ন সময় রেইড হয়। তারা রেইডের পর গুজব ছড়িয়ে মিছিল করে, সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুর করে। বিষয়টা খুবই জটিল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, তেজগাঁও জোনের উপপুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ের অদূরে, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনের উল্টো দিকে, কলেজ গেটের পাশের রাস্তা দিয়ে পশ্চিম দিকে এগোলেই হাতের ডান পাশে মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প। এই ক্যাম্পে বসবাস করেন আটকে পড়া পাকিস্তানিরা, বিহারি বলে পরিচিত। তাদের সংখ্যা ৩০ হাজার।

জেনেভা ক্যাম্পের ভেতরের গলিতে ঢুকতেই একটি চায়ের দোকানের সামনে থেকে এক যুবকের ডাক- ‘লাগবে নাকি, কয় পিস, বড় না ছোট।’ জেনেভা ক্যাম্পজুড়ে রয়েছেন এমন আরও অনেক যুবক। এরাই মাদক বিক্রেতা। বাইরে থেকে কেউ এলে তারা পকেট থেকে ইয়াবা বের করে দেখান। ক্রেতারাও কিনে নিয়ে যান। আর এসব ঘটছে সবার সামনে। ক্যাম্পের ভেতরে ঘরে বসে টাকার বিনিময়ে মাদক সেবনের ব্যবস্থাও রেখেছেন বিক্রেতারা। এমনকি এখান থেকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে মাদক সরবরাহও করা হয়।

জানা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা করে আসছেন ইশতিয়াক। এর জন্য তিনি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানকে প্রতিদিন দিচ্ছেন প্রায় ৩০ হাজার টাকা। ইশতিয়াক জেনেভা ক্যাম্পে মূলত মাদক ব্যবসা পরিচালনা করেন ‘পঁচিশ’ নামে এক ব্যক্তির (পঁচিশ নামে পরিচিত তিনি, প্রকৃত নাম নাদিম) মাধ্যমে। ‘পঁচিশ’ জেনেভা ক্যাম্পের যুবকদের দিয়ে মাদক বিক্রি করান। বিক্রির হিসাব-নিকাশ দেন ইশতিয়াকের কাছে।

সূত্র জানায়, হাবিবুর রহমান মিজানের হয়ে জেনেভা ক্যাম্প থেকে মাদক ব্যবসার চাঁদার টাকা তোলেন মর্তুজা আহমদ খান ও মাছওয়ালা সাঈদ। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা পান কাউন্সিলর মিজান। বাকি ৫ হাজার নেন মতুর্জা, ৫ হাজার নেন মাছওয়ালা সাঈদ। মতুর্জা হচ্ছেন জেনেভা ক্যাম্পের এসপিজিআরসির (স্ট্রান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটি) সভাপতি আবদুল জব্বার খানের ছেলে। আবদুল জব্বার খানের আরেক ছেলে শাহনেওয়াজ আহমদ খান সান্নু। সম্প্রতি সান্নু ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে চাঁদা দিয়ে ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা শুরু করেন। সান্নু শান্তি কমিটির নামে নিজের নেতৃত্বাধীন প্রায় ৪০ জন মাদক ব্যবসায়ীকে নিয়ন্ত্রণ করেন। সান্নুর মাদকের ব্যবসা চালাচ্ছেন আলমগীর, মুন্না (পোপলা মুন্না), আসলাম (ভেজাল আসলাম)। সান্নু এসপিজেআরসির সভাপতি জব্বার খানের ছেলে হওয়ার সুবাদে এলাকার বিভিন্ন বিচার-আচারও করতেন। ‘শান্তি গ্রুপ’ নামে তারা ক্যাম্পে পরিচিত। সান্নুর নেতৃত্বে ‘শান্তি গ্রুপ’ মাদক ব্যবসা শুরু করলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ইশতিয়াক গ্রুপ। ফলে ইশতিয়াক গ্রুপের সঙ্গে বিরোধের জেরে সান্নুর নিয়ন্ত্রণাধীন শান্তি গ্রুপ ও মিজানের লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় বিভিন্ন সময়ে।

জানা গেছে, ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজান স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের আস্থাভাজন। প্রভাবশালী হওয়ায় মাদক নিয়ে স্থানীয় লোকজন তার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন না।

জেনেভা ক্যাম্পের এক মাদক বিক্রেতা কোরবান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এখানে মাদক বিক্রি হয়। ক্যাম্পে বেশি বিক্রি হয় ইয়াবা। ক্যাম্পের ভেতরে অনেক ঘরে মাদক সেবনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। আগ থেকেই ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা করে ইশাতিয়াক গ্রুপ। এজন্য তারা কাউন্সিলরকে টাকা দেন। সম্প্রতি সান্নু গ্রুপ ব্যবসা শুরু করলে সংঘর্ষ বাধে। কাউন্সিলর ব্যবসা চালানোর জন্য উভয় গ্রুপের কাছ থেকেই টাকা নেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত কমিশনার হাবিবুর রহমান মিজান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়নি যে মাদক বিক্রি করে খাইতে হবে। রাজনৈতিক কারণে কেউ কেউ এই অভিযোগ করতে পারেন। কারণ, সেখানে সবাই আওয়ামী লীগ করে না। বিএনপিরও লোক আছে। তারা এসব গুজব ছড়াচ্ছে। এর সঙ্গে তৃণমূলের প্রশাসনের লোকও জড়িত আছে। তবে প্রশাসনের ওপরের লোকজন চায় এটা বন্ধ হোক। আমাদের নতুন প্রজন্ম এই বিহারি ক্যাম্পের মাদকের ছোবলে পড়ছে। এ থেকে আমরাও বের হতে চাই। প্রায়ই অভিযান চালানো হচ্ছে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও জোনের উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্পের ভেতরে বিহারিরাই স্পট চালায়। মাদক ব্যবসার সঙ্গে নারীরাও জড়িত। ক্যাম্পটি পাহাড় না হলেও দুর্গম এলাকা। সেখানে বিভিন্ন সময় রেইড দেওয়া হয়েছে। তবে ক্যাম্পে ৩০ হাজার মানুষ থাকে। তারা রেইডের পর গুজব ছড়িয়ে মিছল করে, সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুর করে। বিষয়টা খুবই জটিল। আমরা চেষ্টা করছি মাদক প্রতিরোধের জন্য। তবে তাতে বিহারিরা কেউ সহযোগিতা করে না। তাদের নিজেদের মধ্যেও গ্রুপিং আছে।’

ছবি: নাসিরুল ইসলাম

/সিএ/এপিএইচ/আপ-এজে/

লাইভ

টপ