Vision  ad on bangla Tribune

বাঁশখালীর ঘটনায় বিব্রত সরকারআহতদের হাতে হাতকড়া

উদিসা ইসলাম১৯:১৩, এপ্রিল ০৬, ২০১৬



আহতদের হাতে হাতকড়াচট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় সরকার বিব্রত বলে মন্তব্য করেছেন খনিজ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। অন্যদিকে ওই ঘটনায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আহত এলাকাবাসীদের আটক করে হাতকড়া পরিয়ে রেখেছে পুলিশ।

এস আলম গ্রুপের উদ্যোগে বাঁশখালীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প হলে উচ্ছেদ ও জীবিকা হারানোর শঙ্কায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে এলাকাবাসী। উচ্ছেদের ভয় যেমন আছে, তেমনি এস আলম গ্রুপের কাছে জমি বিক্রি করে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার অভিযোগও আছে। প্রতারণার প্রতিবাদ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ রোজই মুখোমুখি হচ্ছেন হুমকি ধামকির। সোমবার প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ৪ জন। আহতরা এখনও হাসপাতালে।

সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আহত গ্রামবাসীদের উল্টো আটক করে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছে। আর খনিজ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলছেন, সার্বিক পরিস্থিতি সরকারের জন্য বিব্রতকর।

বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা এলাকায় বাংলাদেশের এস আলম শিল্প গ্রুপের এসএস পাওয়ার লিমিটেড এবং চীনের সেপকো ইলেট্রিক পাওয়ার যৌথভাবে ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু করে। সেই লক্ষে ২.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রকল্পে ৬০০ একর ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, তাদের কাছ থেকে যে পরিমান জমি যে মূল্যে নেওয়ার কথা ছিল সে কথা রাখেনি এস আলম গ্রুপ। এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাদের ভিটেমাটিও দখল করে নিচ্ছে। তাদের অনেকেই এখনও কোনও টাকা পাননি।

আন্দোলন শুরুর বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিক শাহেদা পিয়ার কাছে এলাকাবাসী জানিয়েছেন, গত প্রায় চার মাস ধরে তারা এসব অন্যায়ের প্রতিবাদে আন্দোলন করে আসছিলেন। বিশেষ করে লবণচাষী, কৃষিজীবী এবং জেলেরা এর বিরোধিতায় সোচ্চার হন। যারা আন্দোলন সংগঠনের কাজ করছিলেন, তাদের কয়েকজনকে ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ রবিবার রাতে এলাকার কিছু সন্ত্রাসী বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধর করেন। পিয়া বলেন, এলাকাবাসীর বক্তব্য অনুযায়ী, সোমবারের জনসভা ছিল এই মারধরের প্রতিবাদে। সেখানে হঠাৎ এতো পুলিশ কোথা থেকে এলো তা নিয়েও এলাকাবাসীর প্রশ্ন আছে।

সোমবারের জনসভার অন্যতম আয়োজক ছিলেন গণ্ডামারার সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত। তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, এস আলম গ্রুপ প্রথমে যখন ওই এলাকায় জমি কেনে, তখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার কথা গোপন রেখে বলে সুতার কারখানা হবে, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি হবে। পরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাইনবোর্ড লাগানো হলে গ্রামবাসী আপত্তি করে।

তিনি আরও বলেন, বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতের কিছু ক্যাডার ছাড়া গ্রামবাসীদের মধ্যে কোনও বিভেদ নেই।

আহতদের হাতে হাতকড়া
তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘মানুষ ক্ষেপে উঠবে না কেন? চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে তার জমি এবং জীবিকা দুইই চলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে তথ্য গোপন করে জমি নিয়েছে। কিন্তু যে দাম পেলে সে টাকাটা কাজে লাগাতে পারবে সেটাও দেওয়া হয়নি। এখানে দু’ধরনের প্রতারণা হয়েছে। একদিকে আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলা হয়েছে এই মানুষগুলোকে, আরেকদিকে কোনওরকম পরিবেশ সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প শুরুর অপচেষ্টা করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়ন করতে হবে সেটা যেমন ঠিক, সাধারণ মানুষকে না ঠকিয়ে উন্নয়ন করতে হবে এটাও ঠিক। যারা এ প্রকল্প অন্যায়ভাবে অস্বচ্ছভাবে হাতে নিয়েছেন, তাদের বুঝতে হবে বিদ্যুৎ প্রকল্পে সাধারণ মানুষের উপকার হলে তারা বিরোধিতা করতো না। এমনকি কেউ তাদের দিয়ে করাচ্ছে বলে যে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে, সেটাও সফল হতো না। বাইরের কারও পক্ষে সেখানে উত্তেজনা ছড়ানো সম্ভব না।’

তিনি বলেন, ‘ভূমি কেনাবেচায় মধ্যস্বত্ত্বভোগী ও সন্ত্রাসীরা জড়িত হয়ে পড়ায় পুরো কর্তৃত্ব তারা নিয়ে নিতে পারে, এ আশঙ্কাতে গ্রামবাসী শঙ্কিত হয়েছে।’

এদিকে সরেজমিনের তথ্য বলছে, ‘সোমবারের ঘটনার পর এখন প্রকল্প এলাকার পরিবেশ থমথমে। হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় বেশিরভাগই নাম প্রকাশ না করে কথা বলতে চান। তবে তারা জানান, তারা ভয় পান না। এখন প্রতিবাদীরা আরও সংঘবদ্ধ হয়েছেন। সোমবারের পর নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই নিয়েছেন। তারা কোনওভাবেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে দেবেন না।

এদিকে সোমবারের ঘটনায় আহত প্রায় ১৫ জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। পুলিশ যেহেতু হাসপাতালে এসে আহতদেরই গ্রেফতার করছে, তাই এখানেও পরিচয় দিতে রাজি হননি কেউ। বাঁশখালীতে কেন এস আলম গ্রুপ নিয়ে এতো অভিযোগ, মিথ্যে তথ্য দিয়ে সেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরুর পাঁয়তারা চলছিল কিনা সে বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার এস আলমের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি।

খনিজ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, ‘এটা প্রাইভেট সেক্টরের পাওয়ার প্ল্যান্ট। একটা ঘটনা ঘটে গেছে, আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো দেখবে করণীয় কী, তদন্ত হবে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি সরকারের জন্য বিব্রতকর।’

এদিকে আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছে কেন? এমন প্রশ্নে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্বপন কান্তি মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই আহতরা পুলিশ হেফাজতে আছেন।’

আহত গ্রামবাসীরা কীভাবে মামলার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন- প্রশ্ন শুনে তিনি টেলিফোনের লাইন কেটে দেন।

/এজে/

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ