রক্তের সেতুবন্ধনে যত বাধা ছিল

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১০:১৬, জুন ২১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৭, জুন ২১, ২০১৬

গত ২১ মে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন ২৫ বছরের তরুণ কামরুজ্জামান। দুর্ঘটনায় তার বাম হাত ও পা ভেঙে গেছে এবং কোমরের নিচে সংযুক্ত পায়ের হাড়ের জোড়াও ভেঙে গেছে। রাজধানীর অ্যাপোলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কামরুজ্জামানকে বাঁচাতে চার ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন ছিল। তবে সাধারণ কোনও গ্রুপের রক্ত নয়। তার রক্তের গ্রুপের কোনও লোকের খোঁজ মেলেনি বাংলাদেশে। শেষ পর্যন্ত দুর্লভ ‘বোম্বে ব্লাড গ্রুপের’ রক্ত দান করে বাংলাদেশি এই তরুণকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছেন ভারতের মুম্বাইয়ের চার নাগরিক।

হাসপাতালে কামরুজ্জামান

কিন্তু এই রক্ত মেলাতে এবং তা মুম্বাই থেকে বাংলাদেশে আনতে কামরুজ্জামানের বন্ধু-স্বজনদের পোহাতে হয়েছে অনেক ঝক্কি আর বাধা-বিপত্তি। সেসব অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন তার কর্মস্থল আরিনোবা প্লাস্টিক ইন্ড্রাস্ট্রিজের পরিচালক তুহিনুর আলম।

তুহিনুর আলম বলেন, দুর্ঘটনার পর আমরা যখন আইসিইউতে কামরুজ্জামানকে দেখতে যাই, তখন তিনি আমাদের প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান জামানকে বলেন, ‘স্যার, আমি আগে যেখানে কাজ করেছি সেখানে প্রায় পাঁচশ’ মানুষ কাজ করে, ওইখানে একটু খুঁইজা দেখেন না, পাওয়া যায় কি না- তাইলে আমি বাঁচতে পারবো। বেঁচে থাকার এই আকুতিটাই আমাদের প্রতিষ্ঠান প্রধানকে নাড়া দেয়। তিনি নির্দেশ দেন কামরুজ্জামানের রক্ত যেখান থেকে পাওয়া যাবে সেখানেই আমরা চেষ্টা করবো, আমরা ওকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাবো শেষ সুযোগ পর্যন্ত।

তিনি বলেন, প্রায় একমাস ধরে কামরুজ্জামান অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রক্তের অভাবে তার অস্ত্রোপচার করতে পারছিলেন না চিকিৎসকরা। সারাদেশ খুঁজেও তার রক্ত আমরা পাইনি। শেষ পর্যন্ত ভারত থেকে কামরুজ্জামানের জন্য রক্ত এনেছি। গত ১৮ জুন তাকে প্রথম রক্ত দেওয়া হয়েছে। আর ২০ জুন তার অস্ত্রোপচার হয়েছে। অস্ত্রোপচারের সময় তাকে আরেক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছে এবং তিনি ভালো আছেন।

তিনি জানান, এর আগে যখন রক্ত পাওয়া যাচ্ছিলো না, তখন কামরুজ্জামানের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বন্ডসই নিয়ে ‘ও নেগেটিভ’ রক্ত দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ২৫ থেকে ৩০ মিলিলিটার যাওয়ার পরই তার রিঅ্যাকশন শুরু হয়, তখন তা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা। এরপর তাকে দুইটি হিমোগ্লোবিন ইনজেকশন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয় হিমোগ্লোবিন বাড়ানোর জন্য। 

জানা গেছে, বাংলাদেশেতো নয়ই, ভারতেও ১২০ কোটি মানুষের মধ্যে বিরল এই রক্তের গ্রুপের মানুষ আছে মোটে আড়াইশ’ থেকে তিনশ’।

অস্ত্রোপচার কক্ষে যাওয়ার আগে হাসপাতালের বেডে শুয়ে কামরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি কৃতজ্ঞ আমার অফিসের বসসহ সবার কাছে, যারা আমাকে বাঁচানোর জন্য এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।’

তিনি জানান, তার বাম পা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, বাম হাতের কবজিও এবং কোমরের পেলভিস ভেঙেছে। পায়ের অপারেশনের পর ধীরে ধীরে অন্যগুলোর চিকিৎসা করাবেন।

২৫ বছরের তরুণ কামরুজ্জামান ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, গত ২১ মে গাজীপুর থেকে পুবাইল মীরের বাজারের কাছে একটা বাইপাস রোড ধরে কোম্পানির কাভার্ড ভ্যানে করে মালামালসহ ঢাকায় আসছিলাম আমরা তিনজন। পথে বড় আরেকটি কাভার্ড ভ্যানের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় এটুকু মনে আছে, এরপর আর কিছু জানি না।

দুর্ঘটনার কথা আমরা জানতে পারি ফোনকলের মাধ্যমে, বলেন পাশে থাকা তুহিনুর আলম। তিনি বলেন, ‘এমনভাবে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে যে কারোরই বেঁচে থাকার কথা ছিল না। স্থানীয় লোকজন ওদেরেকে টঙ্গীতে অবস্থিতে ক্যাথারসিস হাসপাতালে পাঠায়, এরইমধ্যে আমিও সেখানে পৌঁছাই। প্রাথমিকভাবে তার চিকিৎসা দেওয়া হয় সেখানে। তবে এক্সরে রিপোর্ট পাওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান তার অবস্থা খুবই মারাত্মক এবং ওই অবস্থায় তার রক্ত দেওয়ারও প্রয়োজন ছিল। ওখানে রক্তের গ্রুপ জানতে পারলাম তার ‘ও পজেটিভ’। এরই মধ্যে কামরুজ্জামানের অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। চিকিৎসকরা তাকে অতি দ্রুত ঢাকা পঙ্গু হাসপাতাল কিংবা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার জন্য বলেন। আমি এটা জানাই আমাদের প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে। তিনিই পরামর্শ দেন বেটার ট্রিটমেন্টের জন্য অ্যাপোলো হাসপাতালে নেওয়ার জন্য। তখনই আমরা কামরুজ্জামানকে নিয়ে আসি অ্যাপোলো হাসপাতালে। এখানে আসার পরই অর্থোপেডিকসের কনসালটেন্ট ডা. ও এফ জি কিবরিয়া রক্ত দেওয়ার কথা বলেন। আমিও তাকে জানাই, রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করা আছে, পাঁচ ব্যাগ রক্ত দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে ডোনারও। তখনও জানতাম না, কী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

রক্তের জন্য হাহাকার

তুহিনুর জানান, অ্যাপোলো হাসপাতালেই যখন রক্ত ক্রস ম্যাচিং করা হলো, তখনই ধড়া পড়লো কামরুজ্জামানের শরীরে কোনও রক্তই ম্যাচ করছে না, সেল ভেঙে যাচ্ছে। কারণটা তখনও আমরা জানি না। এরইমধ্যে অ্যাপোলোর ব্লাড ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম, তারা বললেন, আরও রক্তদাতা প্রস্তুত রাখার জন্য। আমরা প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জনের রক্ত নিলাম, কিন্তু সেগুলোও মিলছিল না। একসময় অ্যাপোলো কর্তৃপক্ষ ভাবলেন, পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনও জটিলতার কারণে এটা হতে পারে। তখন কামরুজ্জামানের রক্তের অ্যান্টি বডি ডিটেকশন এবং ক্রস ম্যাচ করার জন্য পাঠানো হলো স্কয়ার হাসপাতালে। সেখানেও একই ফল এলো। তখন এখানকার চিকিৎসকরা রক্ত পাঠালেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, বারডেম, বিএসএমএমইউতে। বিএসএমএমইউতে ধরা পড়লো কামরুজ্জামানের রক্তের গ্রুপ ‘ও পজেটিভ’ না, ‘এইচএইচ ব্লাড গ্রুপ’। বোম্বেতে এই গ্রুপের রক্ত ১৯৫২ সালে একজন উপজাতির শরীরে পাওয়া গিয়েছিলম, যার জন্য এর আরেক নাম ‘বোম্বে ব্লাড গ্রুপ’। এটি একটি বিরল রক্তের গ্রুপ, যেটি বাংলাদেশে এই প্রথম পাওয়া গেল। রক্তের নাম জানার পর বাংলাদেশে রেড ক্রিসেন্ট, কোয়ান্টাম, বাঁধন, সন্ধানীসহ সব জায়গায় রক্তের খোঁজ করলাম কিন্তু পেলাম না। চিকিৎসকরাও এ বিষয়ে জানেন না। অনেকেই বলছিলেন, জীবনে তাদের প্রথম দেখা এই ঘটনা।

রক্তের সন্ধানে মুম্বাই

জুনের প্রথম সপ্তাহের দিকে যখন বাংলাদেশে কোথাও রক্ত পেলাম না, তখন একজন চিকিৎসক আমাদের ভারতীয় বিনয় শেঠির ফোন নম্বর দিলেন। যিনি মুম্বাইয়ে বেসরকারি সংস্থা থিংক ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তার সঙ্গে আমি যোগাযোগ করলাম। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন, রক্ত পাওয়া যাবে। তিনিও ওখানে অনেক খুঁজে একে একে চারজন ডোনার পেয়ে আমাকে জানান। আমি তাকে বলি, যতো টাকা লাগে আমরা দেব। আপনি তুমি রক্ত সংগ্রহ রাখুন। আমি পাঁচ ব্যাগ রক্ত চেয়েছিলাম, তিনি চার ব্যাগ সংগ্রহ করতে পারেন। স্বপ্না সাওয়ান্ত, কৃষ্ণানন্দ কোরি, মেহুল ভেলেকার এবং প্রবীণ সিন্ধে নামের চার ভারতীয় এই বিরল রক্ত দেন বাংলাদেশি কামরুজ্জামানকে। তাদের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই, বলেন তুহিন।

রক্ত আদান-প্রদানে জটিলতা

তুহিন বলেন, রক্ত পাওয়া গেলেও এর চেয়েও বেশি জটিলতা যে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সেটি তখনও বুঝিনি। কারণ, রক্ত ক্রস ম্যাচ না করে তো আনা যাবে না এবং সেজন্য তাকে রক্তের স্যাম্পল নিয়ে মুম্বাই যেতে হবে। কিন্তু রক্তের স্যাম্পল আদান প্রদানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কোনও আইনি বিধান না থাকায় আমাকে আরও বেশি জটিলতায় পড়তে হয়। আমি অনুমতি না পাওয়ায় বিনয়কে বলি ওখান থেকে পাঠানো যায় কি না ক্রস ম্যাচের জন্য। কিন্তু তিনিও একই সমস্যায় পড়েন। কিন্তু বিনয় শেঠি স্টেট ব্লাড ট্রান্সফিউশন কাউন্সিল (এসবিটিসি) থেকে অনুমতি নেন রক্ত পাঠানোর জন্য এবং ভারতীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকেও তিনি আমাকে অনুমতি নিয়ে দেন। তখন আমিও সাহস পাই। তাকে বলি, ওখানকার অনুমতিপত্র আমাকে পাঠানোর জন্য যেন আমি আমার দেশে এগুলো দেখিয়ে অনুমতি পেতে পারি। আমি বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছি। একসময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি পেলাম কিন্তু আটকে গেলাম কাস্টমস সিকিউরিটিতে। তখন সরকারের একজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা আমাকে সাহায্য করেন কাম্টমসের অনুমতি পেতে।

রক্ত প্যাকেজিংয়ে সমস্যা

এরপর শুরু হয় আরেক সমস্যার, বলেন তুহিনুর আলম। স্যাম্পল প্রস্তুত করতে গিয়ে ব্লাড প্যাকেজিংয়ে সমস্যায় পড়ি। কারণ ব্লাড প্যাকেজিংয়ে আমাদের দেশে অভিজ্ঞতা কারও নেই। কীভাবে প্রিজারভেশন হবে সেটা কেউ বলতে পারছিলেন না। বিভিন্ন ব্লাড ব্যাংকে যোগাযোগ করলাম। অবশেষে অ্যাপোলো হাসপাতালের বিজনেস ডেভলপমেন্ট বিভাগের ডিজিএম আখতার জামিল এই ব্লাড প্যাকেজিংয়ে সাহায্য করলেন তার বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে। টাকার বিনিময়ে এই কাজটা করা হলো। কোনও কিছুই আমাদের দেশে এতো সহজ না এই কাজটা করতে গিয়ে প্রতি পদে টের পেয়েছি। আমি যে সাহায্যটা মুম্বাইতে পেয়েছি, সেটা আমি এখানে পাইনি। থার্মোকল বক্সে (বিশেষ ধরনের প্লাস্টিকের প্যাকেট) আইজেল দিয়ে আমাকে অবশেষে স্যাম্পল রেডি করে দিলেন তারা। অবশেষে আমি সেই বক্স নিয়ে গত ১৬ জুন চলে যাই মুম্বাই। আবার ২৪ ঘণ্টার বেশি এই স্যাম্পল কার্যকর থাকবে না এই ভয়ও ছিল আমার। থিংক ফাউন্ডেশনের বিনয় শেঠিসহ সবাই আমাকে নিয়ে গেলেন মুম্বাইয়ের মহাত্মা গান্ধী সেবা মন্দির ব্লাড ব্যাংকে। সেখানেই আমার নিয়ে যাওয়া রক্তের ক্রস ম্যাচ হলো। সেখানে আমি কামরুজ্জামানের জন্য চার ব্যাগ রক্ত পেলাম অবশেষে। গত ১৮ জুন ঢাকায় এসে সোজা আসি অ্যাপোলোতে। এখানে ক্রস ম্যাচ হলো, অবশেষে কামরুজ্জামানকে সেদিনিই এক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হলো এবং রক্ত দেওয়ার পর কোনও জটিলতা সৃষ্টি হয়নি।

কঠিন সমস্যার মুখোমুখি প্রতিনিয়ত

তুহিনুর আলম বলেন, আমরা পুরো সময়টাতে নানাবিধ জটিলতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। কেবল আমরাই জানি আমাদের কী কী করতে হয়েছে। শুধু বলবো, যে পরিশ্রম, যে জটিলতা আমরা দেখেছি আর যেন কাউকে এ অবস্থার স্বীকার হতে না হয়। সরকারের কাছে অনুরোধ করবো, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ আরও যারা এসব নিয়ে কাজ করেন, তারা যেন এই ব্লাড গ্রুপ কারও শরীরে আছে কি না সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। তাহলে হয়তো অন্য অনেকে উপকৃত হবেন। কারণ, বিভিন্ন জায়গা থেকে আমরা সাহায্য পেয়েছি, কিন্তু সবাইতো সেটা পাবে না, সবার সে সুযোগ নেই। আর মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি প্রক্রিয়া আরও সহজ হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। যেহেতু এটা মানবিক এবং মানবিকতার বিষয় সেখানে একেবারেই নিরাপত্তার বিষয়টুকু রেখে বাকি কাজ সহজ করে দিলে সাধারণ মানুষ অনেক বেশি উপকৃত হবে। 

এজে/

আরও পড়ুন: 
হত্যার পর খুনিরা বৈঠক করেছিল রেডিসনে, একবছর আগেই খুনিদের প্রোফাইল তৈরি করেন গোয়েন্দারা

মুকুলের স্ত্রীর বড় ভাই এবিটি নেতা মুজিবুর ঢাকায় গ্রেফতার হন এপ্রিলে

১৯ প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি চার ব্যাংক

 

লাইভ

টপ