বাংলা ট্রিবিউনকে মে. জে. (অব.) আব্দুর রশীদ মানুষ বাঁচাতে হলে সন্ত্রাসী শিকারে যেতেই হবে

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ০৪:৪৭, জুন ২২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৯, জুন ২২, ২০১৬

মে. জে. (অব.) আব্দুর রশীদসন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাহলে গুলি বের হবেই। সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হলে আপনাকে সন্ত্রাসী শিকারে যেতেই হবে। তবে এসব অভিযানের সময় আইনের মধ্যেই থাকতে হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে  এই কথা বলেন।
বাংলা ট্রিবিউন: হঠাৎ গুপ্তহত্যার সঙ্গে ক্রসফায়ারও বেড়েছে, বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?
আব্দুর রশীদ: গুপ্তহত্যা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাউন্টার টেররিজম থেকে জঙ্গিবিরোধী কৌশল কী হবে? সেটি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যেহেতু আমাদের চলমান কৌশলটি কাজ করছে না, সেখানে কৌশল পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে কাজ করতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: সেই কৌশলটি কী হতে পারে?

আব্দুর রশীদ: জঙ্গি প্রতিরোধে বা বিরোধী অভিযানে কৌশলের ভেতরে আমরা তিনটি বিষয় সবসময় দেখতে পাই। সেগুলো হলো- প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা, আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এই তিনটির সমন্বয় করতে হবে। এখন এসবের কোন বিকল্প আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রহণ করবে,সেব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাহলে গুলি বের হবেই। এতে আনুষঙ্গিক কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। এখন কতটুকু আক্রমণাত্মক হবে, তা নির্ভর করবে তাদের ওপর।আর আপনি যখন আক্রমণাত্মক হবেন না, তখন সাধারণ মানুষ এভাবে মরবে। সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হলে আপনাকে সন্ত্রাসী শিকারে যেতেই হবে। তবে এসব অভিযানের সময় আইনের মধ্যেই থাকতে হবে। মাত্রার ভেতরে রাখার চেষ্টাই হয়তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী করে। কোনও সময় যেন এধরনের অভিযান  আইনের বাইরে না যায়। সেই চেষ্টাও হয়তো তারা করেন। তবে একটিও যে আইনের বাইরে যাবে না, সেই গ্যারান্টিও পাওয়া যায় না। সেজন্য এখন জনগণ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে, তা তাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: আক্রমণাত্মক কৌশলে কি ক্রসফায়ার বৃদ্ধি পেয়েছে?

আব্দুর রশীদ: জঙ্গি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আক্রমণাত্মক হতে হবে। আমরা বলছি সন্ত্রাস শিকার করা। এই শিকার করতে গেলে সন্ত্রাসীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা করবেই। তখন গোলাগুলিতে কিছুলোক নিহত হবেই। আর যদি আপনি শিকার করতে না যান, তাহলে সন্ত্রাসীরা মানুষ মারবেই। তবে ক্রসফায়ার মূলভিত্তি হতে পারে না। সন্ত্রাসী শিকারের অর্থ শুধু ক্রসফায়ার না। আক্রমণাত্মক হতে হবে। প্রয়োজনে আইন তৈরি করতে হবে। তবে আইনের বাইরে যাওয়া যাবে না।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে প্রকৃত উপায় কী?

আব্দুর রশীদ: যারা জঙ্গি আক্রমণ করছে তাদের  নেতৃত্ব ও সংগঠন ভেঙে দিতে হবে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আক্রমণাত্মক হতেই হবে। সেই কৌশল তাদেরই নির্ধারণ করতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন:আপনার পর্যবেক্ষণে গুপ্তহত্যার নেপথ্যের কারণগুলো কী?

আব্দুর রশীদ: গুপ্তহত্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা পুলিশের ক্রসফায়ারের সংখ্যাও বৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি। রাজনৈতিক কারণে, রাজনৈতিক একটি গোষ্ঠির মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতায় এই গুপ্তহত্যা বেড়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বছরের মাঝামাঝি সময় হঠাৎ গুপ্তহত্যা বেড়ে যায় আবার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পর কমেও যায়। এটি তারই একটি লক্ষণ, আমরা বর্তমানে সেই দৃশ্য দেখছি। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের এখনও অনেকের দণ্ড কার্যকর হয়নি। তাদের বাঁচানোর জন্য একটি গ্রুপ এই হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে বলেও আমি মনে করছি। এই গুপ্ত হত্যাকাণ্ডকে তারা কৌশল হিসাবে নিয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: আর কোনও কারণ আছে কি?

আব্দুর রশীদ: আরেকটি বিষয় হলো, বর্তমান সরকারকে যারা পছন্দ করে না, তারা হয়তো বুঝতে পেরেছে গণতান্ত্রিক উপায়ে এই সরকারের পরিবর্তন করা সম্ভব না, তারাও এই হত্যাকাণ্ড উপায় সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টা করছে। তবে সাধারণ মানুষকে হত্যা করে ক্ষমতা নেওয়া যায় না। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দুটি প্রবাহ দেখি। 

আমরা এর নিন্দা জানাই। রাজনৈতিক কারণে দেশের সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। আমরা যদি গুপ্তহত্যার ঘটনাগুলো দেখি তাহলে দেখব খুবই অচেনা, সাধারণ, অপরিচিত, যারা কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত না ও নিরীহ মানুষকে তারা হত্যা করছে।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি কী হবে?

আব্দুর রশীদ: শুধু পুলিশ দিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। কারণ প্রত্যেকের ঘরে ঘরে পুলিশ দেওয়া যাবে না। জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, সরকার উৎখাতসহ বিভিন্ন হিসেব কষেছে সন্ত্রাসীরা। ১৬ কোটি মানুষকে গানম্যান দিয়ে রক্ষা করা যাবেন না। সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: গুপ্তহত্যার কারণে আতঙ্ক বিরাজ করছে কিনা?

আব্দুর রশীদ: হ্যা, আতঙ্ক আছে। কারণ আপনি আমি কেউ জানি না পরবর্তী টার্গেট কে? এনিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আছে। তবে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রতিরোধে মানুষ এগিয়ে আসছে না কেন?

আব্দুর রশীদ: আচমকা আক্রমণের কারণে মানুষ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। জঙ্গিরা অপারেশন শেষ করে খুব কম সময়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আর যেসব জায়গায় পালিয়ে যেতে বেশি সময় নিচ্ছে সেখানেই মানুষ তাদের ধরে ফেলছে।

বাংলা ট্রিবিউন: জঙ্গি প্রতিরোধে আপনার পরামর্শ কী?

আব্দুর রশীদ: আমাদের জনসচেতনতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে। জঙ্গি প্রতিরোধের উপায় ঠিক করতে হবে। তাহলেই আমাদের এই সমস্যার উত্তরণ সম্ভব হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাকে ধন্যবাদ।

আব্দুর রশীদ: আপনাকেও।

/এপিএইচ/আপ-এনএস/

লাইভ

টপ