একান্ত সাক্ষাৎকারে মৌসুমী ইসলাম ‘যারা কর ফাঁকি দেন, তারাই ভালো আছেন’

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১০:৩৮, জুন ২৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৮, জুন ২৫, ২০১৬

মৌসুমী ইসলামঅ্যাসোসিয়েশন অব গ্রাসরুটস্ উইমেন এন্টারপ্রেনার্স বাংলাদেশ (এজিডব্লিউইবি)-এর প্রেসিডেন্ট মৌসুমী ইসলাম মনে করেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষ কর দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। অথচ মাত্র ১২ লাখ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মতে, দেশের অন্তত ৩ কোটি মানুষকে করের আওতায় আনা গেলে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ত, যা আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে সহায়ক হতো। তিনি জানান, যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরকারকে কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি তাদেরকে নানাভাবে নাজেহালও করা হচ্ছে। মৌসুমী ইসলাম বলেন, ‘মানুষ আনন্দের সঙ্গে কর দিতে চায়, কিন্তু দেশে সেই পরিবেশ নেই। কর যারা ফাঁকি দেন, তারাই যেন ভালো আছেন। আর যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই।’ বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলা ট্রিবিউন: অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে যে বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তাতে ভালো দিক কোনটি?

মৌসুমী ইসলাম: আগামী অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী যে বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তার অন্যতম ভালো দিক হচ্ছে, এটি একটি বড় বাজেট। এটা পজিটিভ। আমরা বড় হচ্ছি। আমাদের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। আগামীতে আরও বড় বাজেট আসতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রস্তাবিত বাজেটের মন্দ বা দুর্বল দিক কী?

মৌসুমী ইসলাম: প্রস্তাবিত বাজেটের মন্দ বা দুর্বল দিক হচ্ছে, অনেক বড় ঘাটতির বাজেট এটি। ঘাটতি পূরণ হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনও দিক নির্দেশনা নেই। মাত্র ১২ লাখ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। এছাড়া বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়ে কোনও দিক নির্দেশনা নেই। বিনিয়োগ বাড়াতে যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেই ধরনের পদক্ষেপের বিষয়ে পরিষ্কার কিছু বলা হয়নি।

বাংলা ট্রিবিউন: কত মানুষ কর দিলে বাজেটের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে?

মৌসুমী ইসলাম: দেশের জনসংখ্যা এখন ১৭ থেকে ১৮ কোটির ওপরে, অথচ আমরা কর দেই মাত্র ১২ লাখ। এটা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষ কর দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। দেশের অন্তত ৩ কোটি মানুষকে করের আওতায় আনা গেলে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ত, যা আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে সহায়ক হতো।

বাংলা ট্রিবিউন: সবাই বলছে করের আওতা বাড়ানো দরকার, কিন্তু করের আওতা বাড়ছে না কেন?

মৌসুমী ইসলাম: যারা কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি কর যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দিচ্ছেন তাদের নানাভাবে নাজেহাল করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী মহোদয় আরও বড় বাজেট উপহার দিতে পারেন, কিন্তু মূল সমস্যা হলো – যারা কর দেন, তাদেরকে যেন হয়রানি করা না হয়, এই নিশ্চয়তা দিতে হবে। আমরা যারা নিয়মিত কর দিচ্ছি, তাদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন, কর দেওয়ার ফলে অনেক ধরনের জটিলতা আমাদের মোকাবিলা করতে হয়। আমি সরকারকে কর দিচ্ছি, সে জন্য আমাকে স্বাগত জানানো উচিত, কিন্তু উল্টো যদি হয়রানি হতে হয়, তাহলে অনেকেই কর দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ হারাবে।

বাংলা ট্রিবিউন: করের আওতা বাড়াতে হলে সরকার বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর কী করা উচিত?

মৌসুমী ইসলাম: মানুষ আনন্দে কর দিতে চায়, কিন্তু সেই পরিবেশ নেই। কর যারা ফাঁকি দেন, তাদের চেয়ে যারা কর দেন, তারা ভোগান্তিতে পড়েন বেশি। আমি মনে করি, এখন সময় এসেছে সুশাসন নিশ্চিত করার। ২০২১ সালের মধ্যে আমরা বাংলাদেশকে যে জায়গায় নিতে চাই, তা পূরণ করতে হলে এনবিআর-এর লোকজনকে সৎ হতে হবে। যারা কর আদায়ের সঙ্গে যুক্ত তাদেরকে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। যারা নিয়মিত কর দেন, তাদেরকে অহেতুক হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: করের আওতা বাড়াতে এনবিআর-কে উদ্যোগ নিতে হবে, নাকি কর দেওয়ার সামর্থ্যবানদের স্ব-উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে?

মৌসুমী ইসলাম: আমাদের সংগঠনের অনেক নারী উদ্যোক্তা আছেন, যারা কেবল মাত্র এনবিআর-এর কিছু অসৎ কর্মকর্তার হয়রানির কারণে ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন করতে চান না। টিন খুলতে চান না। টিন খুললেই এনবিআর-এর ফিল্ড অফিসাররা গিয়ে বলেন, ‘আপনি এটা করেছেন, ওটা করেছেন’, কিন্তু তাদের ঘুষ দিলে আর কোনও প্রশ্ন থাকে না। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো – যেসব কর্মকর্তা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাদের কোনও শাস্তি হয় না।

বাংলা ট্রিবিউন: যারা কর ফাঁকি দেন, তাদের কি শাস্তি হওয়া উচিত নয়?

মৌসুমী ইসলাম: সরকার বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর ওপর মহল থেকে যদি নির্দেশনা থাকে যে, কোনও ফাইল আটকানো যাবে না, তাহলে নিচের কোনও কর্মকর্তাই ফাইল আটকাতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবে হয় এর উল্টো। কোনও ব্যবসায়ী যদি মিথ্যা তথ্য দেন, তাহলে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। এমনকি কোম্পানির লাইসেন্সও বাতিল করা যেতে পারে। তবে অহেতুক হয়রানি করা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারও যেন শাস্তি হয়, সেই ব্যবস্থাও করতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রস্তাবিত এই বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

মৌসুমী ইসলাম: দেশের উন্নয়নে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এই বাজেটে তেমন পজিটিভ কিছু আমার চোখে পড়েনি। আমরা সব সময় বলে থাকি, নারীদের এগিয়ে নিতে হবে। এক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণ খুব জরুরি। কিন্তু বাজেটে সে রকম কোনও উদ্যোগ আমাদের চোখে পড়েনি। ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নে এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে চাইলে নারীরা কারিগরি শিক্ষায় ২৫ শতাংশ শিক্ষিত হওয়ার কথা, কিন্তু সেখানে মাত্র ৮ শতাংশ নারী কারিগরী শিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছেন। এই পরিস্থিতিতে স্বনির্ভর বাংলাদেশ হবে, এটা রূপকথা ছাড়া আর কিছুই না।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রস্তাবিত এই বাজেটে বিনিয়োগ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

মৌসুমী ইসলাম: বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে কোনও দিক নির্দেশনা নেই। বিনিয়োগ বাড়াতে যে ধরনের অবকাঠামো দরকার, তা নেই। এখনও শিল্প উদ্যোক্তারা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। গ্যাস পাচ্ছেন না। সুশাসনও নেই। যারা বিনিয়োগ করতে চান, তারা হয়রানির শিকার হন, এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে কে বিনিয়োগে যাবে?

বাংলা ট্রিবিউন: রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল তারপরও বিনিয়োগে হতাশা কেন?

মৌসুমী ইসলাম: বিনিয়োগকারীদের অনেকে এখনও আস্থা পাচ্ছেন না। নিরাপত্তা না থাকার কারণে বিনিয়োগ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। এটা অর্থনীতির জন্য খুবই খারাপ সংবাদ।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্জন সম্ভব কি না?

মৌসুমী ইসলাম: বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-র সঙ্গে আমি একমত। প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্জন করতে হলে বেসরকারি খাতে আরও ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। এ কারণে প্রবৃদ্ধি অর্জনও সম্ভব হবে না।

বাংলা ট্রিবিউন: বিনিয়োগ না হওয়াতে অর্থনীতির ওপর কোনও নেতিবাচক প্রভাব কি পড়ছে?

মৌসুমী ইসলাম: অনেক ব্যাংক নতুন নিয়োগ না দিয়ে উল্টো কর্মী ছাটাই করছে। আর যারা ২০ বছর ধরে ব্যাংকে চাকরি করছেন, তারা অন্য পেশাতেও যেতে পারছেন না। এক সময় ব্যাংকের চাকরি সব চেয়ে বেশি পছন্দের ছিলো। কিন্তু এই চাকরিতেও অনেকে ভয় পাচ্ছেন। ব্যাংকের এই অবস্থা হওয়ার জন্য মূল কারণ, ব্যাংকের আয় কমে গেছে। ব্যাংকের আয় ভাল থাকলে তারা ছাঁটাই করত না। বরং আরও লোক নিয়োগ দিতো। আর ব্যাংকের আয় কমার কারণ, শিল্প প্রতিষ্ঠানের আয় কমে গেছে। এখানে এইচএসবিসি-র ১৩টি শাখা ছিল, কিন্তু গত মাসে তারা ৬টি শাখা বন্ধ করে দিয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের তালিকায় নেওয়ার জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ থাকা উচিত?

মৌসুমী ইসলাম: দেশকে উন্নত দেশের তালিকায় নিতে হলে নতুন নতুন শিল্প গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু নতুন শিল্পকে প্রসারিত করার জন্য সরকারের তেমন কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। শিল্পের ওপর কোনও গবেষণা নেই। অনেক শিক্ষার্থী আছেন, যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে চাকরি করতে চান না। ব্যবসা করতে চান। তাদের সেই সুযোগ দিতে হবে। ব্যাপকভাবে দেশজুড়ে শিল্প গড়ে তুলতে হবে। শিল্প স্থাপনের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে দেশে শিল্প বিপ্লব হতে পারে। আর শিল্প বিপ্লব হলে কর্মসংস্থান বাড়বে।

আরও পড়ুন- 

ব্রেক্সিট:বাংলাদেশকে এখন সতর্ক থাকতে হবে
চিনি নিয়ে সংকট

/এসএ/এপিএইচ/

লাইভ

টপ