বাংলা ট্রিবিউনকে ‘বাংলাদেশি বজরঙ্গি ভাইজান’ সনুকে ফিরিয়ে দিয়ে বুকটা খালি খালি লাগে

Send
তরিকুল রিয়াজ, বরগুনা
প্রকাশিত : ১৮:০৭, জুন ৩০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৮, জুন ৩০, ২০১৬

২০১০ সালে ভারতের দিল্লি থেকে পাচার হওয়া শিশু সনুকে বাংলাদেশের বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার গেরামর্দন গ্রামে নিয়ে আসে রাহিমা ও তার বোন আকলিমা। এখানেই কাটে সনুর ছয়টি বছর। রাহিমার বোন হাসি বেগমের বাড়িতেই থাকতো শিশু সনু, এলাকার সবাই হাসির বোনের সন্তান বলেই জানতো তাকে। কিন্তু হঠাৎ করে সনু এলাকা থেকে পালিয়ে যায়। তখনই জানাজানি হয় সনু ভারতের সন্তান তাকে পাচার করে বাংলাদেশে আনা হয়েছে।

জামাল ইবনে মুসাএরপর সনুকে বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সংগ্রামে নামেন জামাল ইবনে মুসা। এই কারণে তিনি শিকার হয়েছেন মামলার, হারিয়েছেন চাকরি, খেটেছেন জেলও। তবুও সনুকে ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াই থামাননি মুসা। এর মধ্যে সনুকে গতকাল বুধবার (২৯ জুন) ভারতীয় হাইকমিশনের জিম্মায় তুলে দিয়েছেন মুসা। সনুকে ফিরিয়ে দেওয়ার এই দীর্ঘ সার্থক লড়াইয়ের পর সমস্ত বিষয় নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের বরগুনা প্রতিনিধি তরিকুল রিয়াজের মুখোমুখি হয়েছিলেন ‘বাংলাদেশি বজরঙ্গি ভাইজান’।

বাংলা ট্রিবিউন: সনুকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারলেন, এখন কেমন লাগছে?
মুসা: (কান্নাজড়িত কণ্ঠে) একটি শিশু তার বাবা-মাকে ফিরে পাবে এ পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত। অনেক কষ্টে এ জয় পেয়েছি। আমি খুব খুশি যে, শেষ পর্যন্ত সনুকে তার বাবা-মায়ের পৌঁছে দিতে আদালতের মাধ্যমে ভারতীয় হাইকমিশনের জিম্মায় দিতে পেরেছি। আজ এ বিজয় আমার একার নয়, এ বিজয় বরগুনাবাসীর, এ বিজয় সারা বাংলার।

বাংলা ট্রিবিউন: সনুকে প্রথমে কীভাবে পেলেন?
মুসা: আমাদের এলাকার রাহিমা ও আকলিমা ভারত থেকে সনুকে নিয়ে আসে। সনুর পরিচয় দেয় তাদের এক বোনের সন্তান বলে। রাহিমার বোন হাসির বাড়িতে থেকে বড় হতে থাকে ছেলেটি। আমরা একই এলাকার এবং হাসির বাড়ির পাশে আমার শ্বশুরবাড়ি সেখান থেকেই পরিচয় সনুর সঙ্গে।

বাংলা ট্রিবিউন: কীভাবে জানতে পারলেন সনু ভারতীয়?
মুসা: সনু একবার বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলে জানাজানি হয় যে সনু ভারতের নাগরিক। অন্য কারও সন্তান। তাকে অপহরণ করে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছে। সনুকে আবার খুঁজে পেয়ে এলাকায় নিয়ে এলে তার সঙ্গে কথা বলি। তখন সে জানায়, তার বাবার দিল্লিতে একটি গাড়ির গ্যারেজ আছে। তখন বুঝি যে সনু প্রতারক চক্রের হাতে পরে এ দেশে পাচার হয়েছে।

সনুকে বিদায় জানাচ্ছেন জামাল ইবনে মুসাবাংলা ট্রিবিউন: সনুকে বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগ নিলেন কেন?
মুসা: আমার সন্তান যদি আমার কাছ থেকে অপহরণ হতো আমার কেমন লাগতো। আমিও তো কোনও সন্তানের বাবা। সেই জায়গা থেকে সনুর কান্না আমাকে ব্যথিত করে। তাই ওর বাবা-মাকে খুঁজে বের করার জন্য পথে নামি। তাই সনুর কাছ থেকে যতটুকু ঠিকানা পেয়েছি তা নিয়েই ভারতে চলে যাই।

বাংলা ট্রিবিউন: সনুকে বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে কি রকমের ঝামেলা পোহাতে হয়েছে?
মুসা: সনুকে ভারতে আসল বাবা-মায়ের কাছে ফেরানোর উদ্যোগ নিতেই এলাকার হাসি আমার বিরুদ্ধে মামলা করেন। এমনকি সনুকে অপহরণের মামলাও দেওয়া হয় আমার নামে। শুধু আমি নয় আমার স্ত্রী সন্তান ও প্রতিবেশিদের নামেও মামলা করা হয়। মামলায় হাজিরা দিলে একমাসের বেশি জেলে থাকতে হয় আমাকে। এ কারণে ঢাকায় একটি বেসরকারি ফার্মের চাকরিও চলে যায় আমার। পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে মামলার কারণে।

বাংলা ট্রিবিউন: সনুকে যশোরের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয় কেন?
মুসা: সনুকে বাসস্ট্যান্ডে ফিরে পাওয়ার পর আমি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে আদালতে হাজির করি। শিশু সনুর বক্তব্য শুনে আদালত তাকে যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর থেকে সনু সেখানেই ছিল।

বাংলা ট্রিবিউন: ভারতে যেতে কি ধরনের বাধা পার হতে হয়েছে?
মুসা: প্রথমে ভারতে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট করি, কিন্তু পুলিশি তদন্তে তা আটকে দেওয়া হয় মামলা রয়েছে বলে। পরে ঢাকায় গিয়ে গোপনে দালাল চক্রের মাধ্যমে দ্রুত পাসপোর্ট করি। তারপর একবছরের ভিসা নিয়ে প্রথমে কলকাতা যাই, সেখান থেকে দিল্লি।

আইনি লড়াই শেষে আদালতের গেটে জামাল ইবনে মুসাবাংলা ট্রিবিউন: কীভাবে খুঁজে পেলেন সনুর বাবা-মাকে?
মুসা: সনু শুধুমাত্র ঠিকানা বলেছিলো দিল্লি দিলশান গার্ডেনে তার বাবা মেহেবুবের একটি গাড়ির গ্যারেজ রয়েছে। সেই সূত্র ধরে দিল্লি গিয়ে দিলসান গার্ডেন এলাকার গাড়ির গ্যারেজগুলোতে সনুর ছবি দেখাতে থাকি। এভাবে প্রায় ৫০/৬০টি গ্যারেজে ছবি দেখানোর পরে এক লোক বলে এতো মেহেবুবের সন্তান। তখন তার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে সেখানে যাই। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাদের পায়নি, তারা সেই জায়গা ছেড়ে নতুন এলাকায় গিয়েছে। সেখানের এক স্থানীয় মেহেবুবের সঙ্গে ফোনে কথা বলে লোক দিয়ে তার গ্যারেজে আমাকে পাঠিয়ে দেন। সেখানে গেলে মেহেবুবকে সনুর একটা ছবি দেখানোর সঙ্গে সঙ্গেই সে চিৎকার করে বলে, এতো আমার সন্তান। এরপর তাদের বাড়িতে গিয়ে আমি সনুর ছবি দেখাই এবং সব খুলে বলি।

বাংলা ট্রিবিউন: ভারতে থাকা অবস্থায় সনুকে ফিরিয়ে দিতে কি কি করেছেন?
মুসা: সনু যে তাদের সন্তান তা সঠিক প্রমাণ করার জন্য থানায় গিয়ে তাদের ছেলে হারানোর জিডি নিয়ে আসি, এবং সেই সময়ের পত্রিকায় ছাপানো খবর সংগ্রহ করি। এরপর স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েও তাকে পাইনি। পরে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে দেখা করলে তিনি সব ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেন।

বাংলা ট্রিবিউন: সনুকে ভারতীয় হাইকমিশনের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে, এখন?
মুসা: সনুকে আদালত ভারতীয় হাইকমিশনের জিম্মায় দিয়েছে। এখন সে তার বাবা-মায়ের কাছে যেতে আর কোনও বাধা নেই। সনু ও তার পরিবারের হাসিই দেখতে চেয়েছিলাম। আমি এখন দায়মুক্ত হয়েছি একটি শিশুর মানবিক আবেদন থেকে। ভারতীয় হাইকমিশনের মুখ্য সচিব রমাকান্ত গুপ্তা বলেছেন এখন যত দ্রুত সম্ভব সনুকে তার বাবা মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: সনুকে কতটা মিস করেন?
মুসা: সনু আমার বুকের মধ্যে একটা জায়গা করে নিয়েছে, যা বোঝানোর নয়। সনু যাবার সময় বলে গেছে আমি আমার বাবা মা ও ভাইদের নিয়ে বড় আব্বা (মুসা) তোমায় দেখতে আসবো। আমিও সময় করে ভারতে গেলে সনুকেও দেখে আসবো। তবুও সনুকে ফিরিয়ে দিয়ে বুকটা খালি খালি লাগে।

 দীর্ঘ লড়াই শেষে বিজয়ী মুসা ও সনুবাংলা ট্রিবিউন: সনুর জন্য কি প্রত্যাশা করেন?
মুসা: যখন সনুর মা আমায় ফোন করে বলবে, আমি আমার ছেলে সনুকে কোলে পেয়েছি তখন আমি পৃথিবীর সব চেয়ে সুখী মানুষ হবো। সনুর জন্য আমার দোয়া সব সময় থাকবে। সনু লেখাপড়া করে অনেক বড় হবে এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করবে এই প্রত্যাশা করি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার বিরুদ্ধে সনুর জন্য যেসব মামলা হয়েছে সে বিষয়ে কী বলবেন?
মুসা: সনুকে ঘিরে আমার ও আমার পরিবারের উপরে চালানো হয়েছে মানসিক নির্যাতন। আমার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। আমার সঙ্গে আমার পরিবারের সদস্যদের এবং প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে এখনও ৫টি মামলা রয়েছে। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাবো আমার বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে তার নিরপেক্ষ তদন্ত করে ন্যায়বিচার করার।

আরও পড়ুন: ভারত ফিরছে সনু

/এমও/টিএন/

লাইভ

টপ