কাজী সাজিদুরের কাগজের কাপ-প্লেট দেশ ছেড়ে বিদেশে

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১১:৪৯, জুলাই ১৯, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪০, জুলাই ১৯, ২০১৬

ইউরোপ আমেরিকার মতো বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব কাগজের তৈরি কাপ ও প্লেট। প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে প্রতিদিন কয়েক লাখ মানুষ চা, কফি ও পানি পান করছেন কাগজের কাপে।
কাজী সাজিদুর রহমান

এ তথ্য জানিয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা কাজী সাজিদুর রহমান যিনি ২০১৬ সালের বর্ষসেরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে তিনি পেয়েছেন ‘জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার’। মাত্র ৪ বছরেই দেশে তিনি সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

কাজী সাজিদুর রহমান রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় গড়ে তুলেছেন কেপিসি ইন্ডাস্ট্রি নামে একটি কোম্পানি। পরিবেশবান্ধব কাগজের কাপ ও প্লেট উৎপাদন করে তার এই কোম্পানি। এখান থেকে প্রতিদিন স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তৈরি হচ্ছে প্রায় তিন লাখ পিস কাগজের কাপ ও প্লেট। দেশের সেবাখাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে তিনি একচেটিয়াভাবে এই কাপ,প্লেট সরবরাহ করছেন।

বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন,প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে শিক্ষিত ও সচেতন ব্যক্তিদের অনেকেই কাগজের কাপ ও প্লেট ব্যবহার করছেন।সরকারের সহায়তায় পরিবেশবান্ধব এই পণ্য সব শ্রেণী মানুষের কাছেই পৌঁছাতে চান তিনি।

বাংলা ট্রিবিউন: কাগজের কাপ-প্লেট তৈরির এই শিল্পের সম্ভাবনা কতটুকু?

কাজী সাজিদুর রহমান: বিশ্ববাজারে কাগজের তৈরি এই শিল্পের একটি বড় বাজার রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশেও এসব ওয়ানটাইম পণ্যের প্রচলন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা ব্যবহারের ফলে সময় বাঁচে। পরিবেশবান্ধব আবার স্বাস্থ্যসম্মতও। প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে শিক্ষিত ও সচেতন ব্যক্তিদের অনেকেই কাগজের কাপ ও প্লেট ব্যবহার করছেন। আগামীতে সব শ্রেণীর মানুষ এই পণ্য ব্যবহার করবেন।এসব কারণে এই পণ্য একদিন দেশের সব চেয়ে বড় শিল্প হিসেবে পরিগণিত হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: এই শিল্প নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?

কাজী সাজিদুর রহমান: এই ব্যবসা কেবল ব্যবসা নয়,এটি দেশের ও মানুষের জন্য কল্যাণকর একটি সেবা। এ কারণে এ শিল্পকে আমি দেশের মধ্যে একটি বড় শিল্পখাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। পাশাপাশি এই পণ্য বিদেশে রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার জন্য চেষ্টা থাকবে। ইতোমধ্যে, আমাদের প্রতিষ্ঠানের তৈরি কাগজের কাপ ও প্লেট কয়েকটি দেশে রফতানি শুরু হয়েছে। নেপাল, মালয়েশিয়া ও দুবাইতে আমাদের কাপ-প্লেট যাচ্ছে।এছাড়া জার্মানিতেও রফতানির প্রক্রিয়া চলছে।

বাংলা ট্রিবিউন:  অন্য কিছু রেখে কাগজের কাপের দিকে ঝুঁকলেন কেন?

কাজী সাজিদুর রহমান: দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মানুষের নানা ধরনের রোগব্যাধি দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে,পরিবেশবান্ধব জিনিসপত্র ব্যবহার না করাই এর অন্যতম কারণ। কাগজের কাপ এমন একটি ব্যবহারি পণ্য,যাতে পরিবেশ দূষণ হওয়ার সুযোগ নেই। পরিবেশবাদীরা পরিবেশ বাঁচানোর কথা বলে থাকেন। কিন্তু তারা তো বিকল্প পণ্যের ব্যবস্থা করতে পারেন না। আমি উদ্যোক্তা। তাই, আমি পরিবেশ রক্ষা করে এমন পণ্য কাগজের কাপ-প্লেট তৈরি করে বাজারজাত করছি।

বাংলা ট্রিবিউন: এই ব্যবসার উৎসাহ পেলেন কার কাছ থেকে?

কাজী সাজিদুর রহমান:  ২০১০ সালে মাকে নিয়ে হজে যাই। সারাদিন রোজা রাখার পর মদিনা শরীফে মাগরিবের নামাজ পড়ি। সেখানে একজন অ্যারাবিয়ান আমাকে পেপার কাপে খেঁজুর ও কফি খেতে দেন। তখনই বাণিজ্যিকভাবে পেপার কাপ ও প্লেট তৈরি করার আইডিয়া মাথায় আসে। এরপর মালয়েশিয়া গিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিই।

বাংলা ট্রিবিউন:এই ব্যবসা শুরু করলেন কীভাবে?

কাজী সাজিদুরের তৈরি কাগজের কাপ-প্লেট

কাজী সাজিদুর রহমান:  তখন ২০১২ সাল। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আমার কাছে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার মতো ছিল। মূলধন স্বল্পতা দূর করতে ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে কথা বললাম। তারা আমাকে অর্থায়ন করে। তবে তার পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অল্প। আমার মূলধন ছিল ৩৩ লাখ আর ব্যাংক দিলো ৪০ লাখ। তিনটি মেশিন দিয়ে পেপার কাপ ও প্লেট তৈরি করি। এখন মূলধন দাঁড়িয়েছে প্রায় চার কোটি টাকার ওপরে। আমার প্রতিষ্ঠান থেকে এখন প্রতিদিন স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তৈরি হচ্ছে প্রায় তিন লাখ পিস কাগজের কাপ ও প্লেট। শুরুতেই পেপসি, ইস্পাহানি, ঈগলু এবং বিএফসির মতো বড় বড় ব্র্যান্ডের অর্ডার পেতে শুরু করি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার প্রতিষ্ঠানের পণ্য যে স্বাস্থ্যসম্মত মানুষ তা বুঝবেন কীভাবে?

কাজী সাজিদুর রহমান:  আমাদের পণ্যগুলো প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সহজেই পচনশীল, শতভাগ পরিবেশবান্ধব। ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া এবং জীবাণুমুক্ত। ক্ষতিকর রাসায়নিক থেকেও মুক্ত। আমার কারখানাতে এইচএসিসিপি বা হেসাপ (হ্যাজারড অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কন্ট্রোল পয়েন্টস)প্র্যাকটিস করা হয়। আমার নিজস্ব ল্যাব রয়েছে। এখানে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষা করা হয়। কাগজের গায়ে আমরা যে আস্তরণ বা প্রলেপটা ব্যবহার করছি, তা ১০০ ভাগ পরিবেশবান্ধব। কাগজের ওপর পলিইথিলিন নামক পদার্থের একটি প্রলেপ বা আস্তরণ রয়েছে এটি শতভাগ পচনশীল পদার্থ। এটি মাটির সংস্পর্শে যাওয়ার ২১ দিনের মধ্যে মাটির সঙ্গে মিশে যায়।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার পণ্যের ক্রেতা কারা?

কাজী সাজিদুর রহমান:  বর্তমানে ৯৫ শতাংশ কাপ যাচ্ছে করপোরেট প্রতিষ্ঠানে। এর মধ্যে পেপসি, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, ইউনিলিভার, ওয়েস্টিন হোটেল, নেসলে, কাজী অ্যান্ড কাজী টি, ব্রিটিশ হাইকমিশন, ব্রিটিশ কাউন্সিল, প্রাণ, আকিজ গ্রুপ,অ্যাপোলো হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল, আনোয়ার ইস্পাত, প্যানপ্যাসিফিক হোটেল সোনারগাঁও, ইগলু, ডানো, সেভরন, আজিনোমোটো, নিউজিল্যান্ড ডেইরি, ইস্পাহানি গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আমাদের পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউন: এই ব্যবসার মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো কী কী?

কাজী সাজিদুর রহমান: আমার জানা মতে, দেশে এখন পর্যন্ত আমারটি ছাড়া এ ধরনের ছয়টি প্রতিষ্ঠান হয়েছে। এর মধ্যে চারটি এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি দুটির অবস্থাও বেশি ভালো নয়। অথচ পরিবেশবান্ধব হওয়ায় ভারত, আমেরিকাসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এই ব্যবসা বেশ জনপ্রিয়। অবশ্য ওই সব দেশে এই পণ্যের কাঁচামাল আনতে কোনও ডিউটি (শুল্ক) দিতে হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে কাঁচামাল আমদানি করতে মোট ৬১ শতাংশ ডিউটি দিতে হয়, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দেশের স্বার্থে এসব পেপার কাপ ও প্লেট তৈরির কাঁচামাল ডিউটি ফ্রি করা উচিত।

বাংলা ট্রিবিউন: যারা নতুন উদ্যোক্তা তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

কাজী সাজিদুর রহমান:  সততা,নিষ্ঠা আর পরিশ্রম থাকলে যে কেউই ব্যবসায় সফল হতে পারেন।তবে যারা নতুন উদ্যোক্তা তাদের শুরুটা করা উচিত সম্ভাবনাময় কোনও ব্যবসা দিয়ে।এক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব নতুন নতুন বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। নতুন কিছু তৈরি করতে হবে। তবে সব কিছুর আগে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে ব্যবসা করতে হবে।  

এবি/ আপ- এপিএইচ/

আরও পড়ুন:
বাংলাদেশ ব্যাংকের জড়িতরা চিহ্নিত, দালিলিক প্রমাণ হাতে নিয়েই গ্রেফতার

‘চিন্তা করো না, আমরা মুসলিম কান্ট্রিতে আছি’

মুখ বন্ধ রাখার সময়ে হুমায়ূনই বলেছিলেন ‘তুই রাজাকার’

 

লাইভ

টপ