তনু ও লিমনের ইস্যুতে ‘বাড়াবাড়ি’ না করতে পরামর্শ এসেছিল: ড. মিজান

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১১:৫৭, আগস্ট ০৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৪০, আগস্ট ০৫, ২০১৬

ড. মিজানুর রহমানকুমিল্লা সেনানিবাসে হত্যাকাণ্ডের শিকার সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় ও র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমন হোসেনের ব্যাপারে কথা বলার ক্ষেত্রে ‘বাড়াবাড়ি’ না করতে পরামর্শ দিয়েছিল একটি বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। সম্প্রতি দায়িত্ব শেষ করা সাবেক মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, গত ৬ বছর দায়িত্ব পালনকালে এ দু’টি ঘটনায় কখনও তার অফিসে এসে, কখনও টেলিফোন মেসেজে এধরনের পরামর্শ দিয়ে তাকে নিরস্ত করার চেষ্টা হয়েছে। তবে তিনি সেগুলো আমলে নেননি বলেও দাবি করেন। নিজের কাজের মূল্যায়নে তিনি বলেন, আমার সফলতা-ব্যর্থতা দুই-ই আছে এবং ব্যর্থতার দায় আমি নিতে চাই।

বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, আস্থাভাজন হওয়ার প্রক্রিয়ায় কখনও যে জনগণের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছি সেটা খেয়াল করিনি এবং যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল সামর্থ্যের কমতির জন্য তা মেটাতে পারিনি। সেটা নিয়ে এক ধরনের অতৃপ্তি কাজ করে, প্রশ্ন জাগে তাহলে কী আমরা অধিক প্রত্যাশা তৈরি করে দিয়েছিলাম?

৬ বছরের কাজের মূল্যায়ন নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি বলব শিক্ষকতা থেকে এসে সাধারণ মানুষের বঞ্চনা, অভিযোগ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ভিন্নমুখী চ্যালেঞ্জ অনুভব করেছি। মনে রাখতে হয়েছে প্রত্যেকটি অভিযোগ আমাদের সমাজ, রাষ্ট্রনীতি, রাজনীতি, অভ্যন্তরীণ-বৈশ্বিক সম্পর্ক, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেক কিছু জড়িত। এসব মাথায় নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভেবে পা ফেলতে হয়েছে।

রাষ্ট্রের অংশ হয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলা সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নে সাবেক এই মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, সাধারণত যখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলি, প্রধানত ও প্রথমত: যাকে অভিযুক্ত করা হয় সেটা হলো রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করছেন, যে রাষ্ট্র আপনাকে নিয়োগ দিয়েছে সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যখন কথা বলছেন, হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে কাজটি করতে চাইছেন সেই একই উদ্দেশ্যে আপনাকে তারা গ্রহণ নাও করতে পারে। আপনাকে ভুল বুঝবার শঙ্কা-সম্ভাবনা থেকে যায়। প্রতিটি দিন এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হয়েছে।

আমি লিমনের ঘটনায় ফিরতে চাই। ২০১১ সালের মার্চ মাসে ঝালকাঠির সাতুরিয়া গ্রামে নিজের বাড়ির কাছে র‍্যাবের গুলিতে ছাত্র লিমন হোসেন তার একটি পা হারিয়েছিলেন। সেসময় আপনাকে তৎপর হতে দেখা গেছে। সে কারণে কি ধরনের চাপের মুখোমুখী হতে হয়েছিল?

এটা আমি দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিকের কথা। আমি সদ্য শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে এসেছি। একজন ছাত্রকে যেন সামনে দেখেছি যে গভীর স্বপ্ন নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ দেখলাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কারও একটি অপকর্মের কারণে সে স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে চূরমার। এই যে আশাভঙ্গের যাতনা, এটা যখন প্রত্যক্ষ করলাম আমার চোখের জল আটকে রাখতে পারিনি। এরপর হয়তো মানুষের অনেক কষ্ট দেখে দেখে মনটা শক্ত হয়ে গেছে।

প্রতিবেদকের সঙ্গে ড. মিজানুর রহমানদেখতে দেখতে সয়ে যাওয়ার কারণেই কি শেষের দিকে খানিকটা চুপ করে গেলেন?

চুপ আমি করিনি। ওই যে বললাম সবসময় প্রত্যাশা ধরে রাখতে পারিনি। ২০১৪-১৫ সালে এসে কৌশল কিছুটা পাল্টাতে হয়েছে। কেননা সেসময় রাজনৈতিক কারণে যে সহিংসতা সৃষ্টি হলো, মানুষ মানুষকে পুড়িয়ে মারছে, তখন ঢালাওভাবে রাষ্ট্রকে দোষারোপ করা কঠিন হচ্ছে। এই কাজটি এমনভাবে করতে হয়েছে, রাষ্ট্রকেও ফুলস্পেস দিতে পারেন না যাতে চাইলেই যেমন ইচ্ছে তেমন আচরণ যেন না করতে পারে, আবার অন্যদিকে যারা জ্বালাও-পোড়াও করছিল সেটাও যেন নৈরাজ্যবাদী না হয় সেখানে দু’দিক সামলিয়ে চলতে হয়েছে।

এখন জঙ্গিবাদের ‍উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং একই  সঙ্গে দেখা যাচ্ছে অনেক পরিবারের সন্তানেরা নিখোঁজ হয়েছে তাদের অভিযোগ মানবাধিকার কমিশনে এসেছিল কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি গুমের বিষয়ে কাজ করেছি। সেসময় বেশকিছু অভিযোগ এসেছিল যাদের পরিবারের সদস্যদের সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কারা নিয়ে গেছে আমরা নিশ্চিত না, কিন্তু একটি ব্যাপারে নিশ্চিত তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনের জন্য এতোটুকু তথ্যই সক্রিয় হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

তিনি আরও বলেন, সেসময় যার কাছেই ফোন করেছি সেই অস্বীকার করেছে। পুলিশ প্রশাসনকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেছে আমরা না, অন্য কেউ নিতে পারে। র‌্যাবকে ফোন করলে তাদেরও একই উত্তর। কিন্তু এই যে অভিযোগ হলো,আমার দায়িত্ব বর্তাচ্ছে খোঁজ নেওয়ার ব্যক্তিটা গেল কোথায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের মধ্যে সমন্বয় থাকলে, গুম হয়ে যাওয়া প্রত্যেক ঘটনাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে যদি বিবেচনা করতাম, তাহলে আজকে জঙ্গি হামলার পরে এসে বলতে হতো না আমাদের এতোগুলো ছেলেমেয়ে নিখোঁজ হয়ে গেছে। তখনই আমরা সতর্ক হতে পারতাম, প্রস্তুতি নিতে পারতাম। মনে রাখবেন, আমি যে কথাই বলেছি, অভিযোগ ও তথ্যের ভিত্তিতেই বলেছি।  

সদ্য ছেড়ে আসা চেয়ারম্যান হিসেবে নিজেকে ব্যর্থ না সফল বলবেন?

সফলতা আছে এবং ব্যর্থতাও আছে। আমরা সিস্টেমিক চেঞ্জের জায়গায় সফল হতে পারিনি। পুলিশ নির্যাতন করবে না, চাঁদাবাজি করবে না, অযথা হয়রানি করবে না সেই পর্যায়ে আমরা যেতে পারিনি। সেখানে আমি ব্যর্থ। দায় আমি নিতে রাজি আছি। কিন্তু যখন আমি দায়িত্ব নিয়েছিলাম সেখানে রাঁধুনি বা পাচকের কোন পদ ছিল না। ছোট ছোট বাচ্চারা কাজ করতো। সেটা কিন্তু আমরা সবার প্রচেষ্টায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বন্ধ করতে পেরেছিলাম।

আমি চেয়েছিলাম সারা দেশে মানবাধিকার নিয়ে দুর্বার আন্দোলন হোক। প্রাইভেট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আইনে যারা পড়েন তাদের নিয়ে একটি বাহিনী করবো। যারা ছুটিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে মানবাধিকার বার্তা পৌঁছে দেবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

না সম্ভব হওয়ার কারণ কি জানতে চাইলে তিনি আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা বলেন। তিনি বলেন, আমাদের ৩ কোটি টাকা দেওয়া হতো। যেদেশে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা নস্যি, সেখানে ৪৮ জনের বেতন দিতে হচ্ছে এই টাকায়, আমার কোনও সরকারি অফিস নাই, ভাড়া দিতে হচ্ছে এ অর্থ থেকে। অনেকে বলতে পারেন ইউএনডিপির প্রকল্প আছে। কিন্তু সেখান থেকে যে অর্থায়ন তা দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারছি না। তাদের ইচ্ছে-অনিচ্ছা ও খাত অনুযায়ী খরচ করতে হয়।

সংবেদনশীল বিষয়ে কাজ করতে গেলেই নানা ধরনের বাধা আসে। সে ধরনের বাধার বিষয়ে ড. মিজানুর রহমান বলেন, অনেক সময় আমাকে বলা হয়েছে ‘সাবধান হন’,‘বেশি কথা বলছেন’,‘এতটা ভাল না’, এসব মন্তব্য, টেক্সট ম্যাসেজ, উড়োচিঠি হয়নি তা নয়। এমনকি বিশেষ একটি বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমার অফিসে এসেছিলেন। তারা আমাকে নড়াতে পারেননি। এর দু’টো কারণ ছিল। আমি জয়েন করি যখন তখনকার রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমান ও শেখ হাসিনা আমাকে চালিয়ে যেতে বলেছিলেন। ফলে নানাধরনের হুমকি এসেছে। সব উবে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

লিমনের ঘটনার সময়ও না?

ওই যে বললাম। অফিসে একটি বাহিনীর কর্মকর্তারা এসেছিলেন সেটা লিমনের ঘটনার সময়ই। আর তনুর ঘটনার সময়ে আমাকে ফোন করে বাড়াবাড়ি না করতে বলা হয়। আমাকে ওরা প্রশ্ন করে আমি কেন এসব নিয়ে কথা বলছি। আমি তাদের উল্টো প্রশ্ন করি তারা কেনও এই কাজটি করলেন (হত্যাকাণ্ডের স্থান তদন্তের আগে ঘাস কেটে পরিষ্কার করে ফেলা)। ওই সংলাপ ওখানেই শেষ। ওরা বুঝেছিল আমাকে এসব করে বাগে আনা যাবে না।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম।

আরও পড়ুন- 

যে কারণে অলস পড়ে আছে ৬শ’ কোটি টাকা
সাবেক জঙ্গি বললো, বাংলাদেশে এজেন্ট পাঠিয়েছে আইএস

/ইউআই/এমএসএম/আপ-এফএস/ 

লাইভ

টপ