আর বাজবে না রব ফকিরের দোতারা

Send
মীর রাব্বী
প্রকাশিত : ১৯:৫৬, আগস্ট ০৭, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০১, আগস্ট ০৭, ২০১৬

মীর রাব্বীবহুদিন বিদেশে থাকা বাঙালির দেশের প্রতি অন্য ধরনের একটা টান থাকে, আমি সেই সুক্ষ্ম ব্যাপারটা লক্ষ করেছি সময়-অসময়। এক প্রবাসী খালু দেশে আসবেন বহুদিন পর। কোথায় যাওয়া যায়, কার সঙ্গে দেখা করা যায়, কোথায় নাটক-গান হয়। কোথায় কোথায় তারুণ্য জয় করছে সব কিছু জানতে তার ভীষণ আগ্রহ । ক্যালিফোর্নিয়ার সুন্দর সন্ধ্যায়; বিশাল সুর্য যখন সমুদ্রের ওপারে ডুব দিচ্ছিল, আমি ভদ্রলোকের চোখে চক্চকে বিস্ময় আর চাপা উত্তেজনা লক্ষ করছিলাম প্রতিটা প্রশ্নে। লালনের দেশ কুষ্টিয়াতে যাবেন তিনি, ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কারা এখনও বিশ্বাস আর ভালোবাসার জায়গা থেকে ধারণ করছে লালনকে, বলছে তার কথা, গাইছে তার গান? এ রকম কথোপকথনে বলেছিলাম, রব ভাইয়ের বাড়ি গিয়ে কদিন থাকেন।
রব ভাই, রব ফকির। একজন ফকির, অথচ সমুদ্র সমান সম্পদের মালিক একজন মানুষ। ভালোবাসা যার সম্পদ। ভালোবাসা যার অস্ত্র । আমার খালু এসেছিলেন দেশে, গিয়েছিলেন কুষ্টিয়ায়। কিন্তু রব ভাই ব্যস্ত সময় পার করছিলেন খুব । চাকরি তাকে অবসর দেয়নি সে সময়। দেখা হয়নি খালুর সঙ্গে রব ভাইয়ের। বলেছিলাম, পরেরবার আমিও যাব।
আমাদের ভালবাসাহীন যন্ত্রের শহরে, রব ভাই আসতেন সরলতার পৃথিবী নিয়ে। বুকে জড়িয়ে ধরতেন প্রথম দেখায়। ছোট খাট গঢ়নের হাড্ডি প্রধান শরীরটা চেপে ধরতাম বুকের সঙ্গে। বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম, কথা বলতাম তার সঙ্গে। তিনি বলতেন, ‘এতদিন পরপর এই আত্মাগুলোর দেখা হলে কী করে হবে বলো তো?’
আমাদের বন্ধু, বুনো, লাবিক, মারুফ, আনুশেহ’রমতো যারা, যারা তাকে আরও ভালো করে চিনত, তাদের কাছে যেতেন রব ভাই, প্র্যাকটিস করতেন, থাকতেন, রেকর্ড করতেন কখনও কখনও। আর রেডিওতে একটা ‘শো’। আমাদের ধান্দা থাকত, কী করে নিজেরা বাজিয়ে হলেও, কম টাকায় একটা অনুষ্ঠান করা যায়। কেননা, রব ফকিরের মতো মানুষের জন্য, করপোরেট পুঁজির বরাদ্দ থাকে না। তাই ইচ্ছে থাকলেও, এই আত্মাগুলোর দেখা তাড়াতাড়ি সম্ভব হতো না। আমাদের সুধী সমাবেশে তার প্রয়োজন হতো শুধু পার্বণে, বৈশাখে বা চৈত্র সংক্রান্তির ঘোরলাগা লাগা সন্ধ্যায় । আমরা যখন রঙিন পাঞ্জাবির দিন পার করে, বোকা বাক্সের সামনে ক্লান্তির বিছানায়, রব ফকির ও তার দল তখন; দূরপাল্লার কোনও বাসের ভাঙা চেয়ারে; এক গাল ক্লান্তি আর হাসি নিয়ে হয়তো ছুটে চলতো নিজের ঘরে। আমাদের ধারণার মেইনস্ট্রিমের বাইরে যারা কাজ করে।

আমাদের সেই বন্ধুদের সঙ্গে, সেই অসাধারণ ট্যালেন্টেড মিউজিসিয়ানদের সাথে, দেশে বিদেশে বহু যায়গায় গিয়েছেন এই মানুষটা । গান গেয়েছেন, কথা বলেছেন। এত স্বাদের অন্য ঘরানার মিউজিসিয়ান আর যন্ত্রকে গ্রহন করতে অন্য কাউকে দেখিনি কোনদিন । সব যোগাযোগের সেই একটায় যেন সুতো ছিল তাঁর, ভালোবাসা। সুফিয়া কামালের মাঠে ওয়াল্ড মিউজিক ফেস্ট-এ,‘ শিঁকড়ে’র সঙ্গে উঠেছিলেন রব ফকির । বিশাল বড় একটি দল বাজাচ্ছে। অসাধারণ সব মিউজিশিয়ান। তুমুল দোলা যেন মাঠের সকলের শরীরে। রব ভাই এলেন তার দোতারা নিয়ে, ছোটখাটো একজন মানুষ, কী অদ্ভুত ভঙ্গিমায় পুরো মঞ্চ দখল করে বসলেন! স্বভাবসুলভ কথাও বলেছিলেন । মঞ্চের আলো-আঁধারী আর ফিউশনের ছন্দে গাঁথা তার সব কথা; ভাবের কথা। এই সরল কথা মনে রাখবার অভ্যেস আমাদের গেছে বহুদিন আগেই। শহুরে বাস্তবতায়, একজন রব ফকিরের দর্শন, আমাদের রাজনৈতিক-সামাজিক, অর্থনৈতিক জীবনে বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। রব ফকিরকে আমরা পন্যের সঙ্গে ভালো ম্যাচ করাতে পারিনি । ভ্যারিফাইড পেইজ তার ছিল না। ছিল না লাখ-লাখ ফ্যানও। তাকে নিয়ে কোনও ঈদের নাটকও হয়নি তাই। তারুণ্যের মোড়কে; নেটওয়ার্কের উদ্দীপনায় সে খাপ খায়নি কোনও দিন । তার কথা-গান আর বিশ্বাস, পৌঁছে যায়নি তমুল প্রচারযন্ত্রে। তবু, একজন রব ফকির চলে গেলে, কী যেন হারালাম বলে হাহাকার করে ওঠে চারপাশ। অনেক নিঃস্ব লাগে এই সন্ধ্যায়। কখনও কারও নামে কোনও অভিযোগ না রাখা, আর ভালোবাসায় আপন করে নিতে পারা একজন মানুষ চলে গেল। কী আশ্চর্য! কথায় কথায় রব ভাই বলছিলেন, ‘সাইজি বল্লেন, বড় মাপের কিছু হতে হলে, মানুষকেই ভালোবাসতে হবে। তবে এখন দেখছি, মানুষ মানুষকে মারতে একটুও দ্বীধা করছে না, মানুষ মানুষকে ঠকাচ্ছে! ‘ওরে মানুষ মানুষ সবাই বলো, আছে কোন মানুষের বসত কোন দলে’। মানুষ মানুষকে কষ্ট দিলে, লোকটা কষ্ট পেত। মানুষের আনন্দে সুখি হতো। কত কম চাহিদা নিয়ে সুখী থাকা যায়, দেখিয়ে দিতেন যেন ক্ষণিকের দেখায়। মানুষের পাশে মানুষ হয়ে দাঁড়ানোর কথা পুরোটা সময় বলে গেল লোকটা। জানি না কতটা ভাবাবেন তিনি আমাদের, কতদিনই বা থাকবে এই দুঃখবোধ। ব্যস্ততার শহরে একজন রব ফকির চলে যাওয়ার খবর, বন্ধুদিবসের আয়োজনকে ছাপিয়ে যেতে পারে না কোনও দিন। চারদিকের রঙিন হৈচৈ ধূসর হয় না তার না থাকায়। তিনি বিদায় নেন নীরবে।আমাদের জলসা মাতিয়ে, ঠিক যেমন প্রতিবার দূরপাল্লার রাতের বাসে চড়ে বসতেন । শুধু এবার আর তিনি ফিরে আসবেন না এ শহরে। সেই আত্মাগুলোর আর দেখা হবে না। রব ভাই আর বলবেন না মানুষকে ভালোবাসার কথা, তার দোতারা আর ইথারে ভাসবে না সংক্রান্তির রাতে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

আরও খবর: ফসিলস কাণ্ড: মাইলসের বদলে চন্দ্রবিন্দু

লাইভ

টপ