সিরিজ বোমা হামলার ১১ বছর: উত্থান ঘটেছে নব্য জেএমবির

Send
জামাল উদ্দিন
প্রকাশিত : ০৭:১১, আগস্ট ১৭, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০১, আগস্ট ১৭, ২০১৬


সিরিজ বোমা হামলা ১১আজ ১৭ আগস্ট। দেশের ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলার ১১ বছর আজ।  ২০০৫ সালের এই দিনে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। ওই ঘটনার পর কেটে গেছে দীর্ঘ ১১ বছর। এই ঘটনায় সারাদেশে ১৬০টি মামলা দায়ের হলেও বিগত ১১ বছর পরও  নিষ্পত্তির অপেক্ষার রয়েছে ৫১টি মামলা। এদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মতৎপরতার কারণে পুরনো জেএমবির শক্তি কমলেও উত্থান ঘটেছে নব্য জেএমবির। গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলাসহ সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাকে নব্য জেএমবি’র কাজ বলেই মনে করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। গত ৩০ জুন জেএমবি’র পাঠানো এক বার্তায়ও এমন তথ্য উঠে এসেছে। গত ৫ নভেম্বর বাড্ডায় প্রকৌশলী খিজির খান হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত তারা দায় স্বীকার করলেও গুলশান হামলার সঙ্গে জড়িত নয় বলে দাবি করে নিষিদ্ধ এ সংগঠনটি। তবে নব্য জেএমবিও দেশে যেন আর কোনও ঘটনা সংঘটিত করতে না পারে, সে জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কাজ করছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।
জঙ্গি দমনে কাজ করছেন এমন পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান,  সাংগঠনিকভাবে সংঘবদ্ধ হতে না পারলেও অপতৎপরতা থেমে নেই জঙ্গিদের। কিন্তু সারাদেশে ঘাপটি মেরে থাকা জঙ্গিরা ছোটছোট গ্রুপে নাশকতার ছক বাস্তবায়নে ছক আঁকছে সারাক্ষণই। ২০০৫ সালে দেশের ৬৩ জেলায় বোমা হামলা চালিয়ে যে সাংগঠনিক কাঠামোয় দাঁড়াতে চেয়েছিল জঙ্গিরা, সেই কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অব্যাহত তৎপরতার কারণে জেএমবি আর সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হতে পারেনি। তাদের অনেকেই পরে ছোটছোট সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু তারাও একের পর এক গোয়েন্দা জালে ধরা পড়তে থাকে। অনেকেই জেএমবি ছেড়ে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ নিজেদের আইএস-এর অনুসারী বলেও দাবি করতে থাকে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার পর একের পর এক আত্মঘাতী বোমা হামলা চালাতে থাকে জঙ্গিরা। এতে দেশব্যাপী চরম নৈরাজ্য শুরু হয়। এসব বর্বরোচিত বোমা হামলায় বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ তখন ৩৩ জন প্রাণ হারান। আহত হন চার শতাধিক নারী-পুরুষ। এসব ঘটনায় পরে আরও শতাধিক মামলা হয় সারাদেশে।

জঙ্গিবাদে মদদ দেওয়ার অভিযোগে বিএনপি নেতা ও সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক, সাবেক উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী আলমগীর কবির, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, সাবেক এমপি নাদিম মোস্তফা ও শীষ মোহাম্মদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে জঙ্গিবাদে মদদ দেওয়ার অভিযোগে ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ৩১ বছরের সাজা হয়েছিল।

মামলা

সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় সারাদেশে ১৬০টি মামলা দায়ের হলেও বিগত ১১ বছরেও এসব মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। দেশের বিভিন্ন আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে আরও ৫১টি মামলা। ‘আল্লাহর আইন কায়েম ও প্রচলিত বিচার পদ্ধতি’ বাতিলের দাবি জানিয়ে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশের ৬৩ জেলার প্রায় পাঁচশ’ স্পটে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মপ্রকাশ করে জঙ্গি সংগঠন জামা’তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)। ওই ঘটনায় দুই জন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছিলেন।

আদালত সূত্র জানায়, ১৬০টি মামলার মধ্যে ৮৮টি মামলার রায় হয়েছে দেশের বিভিন্ন আদালতে। এসব রায়ে শীর্ষ জঙ্গি নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ ৩৫ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় ১৩১ জনকে। বিভিন্ন মেয়াদে আরও ১৮৪ জনকে সাজা দেওয়া হয়। খালাস দেওয়া হয় ১১৮ জনকে। ঢাকা মহানগরীর ৩৩ স্পটে বোমার বিস্ফোরণ ঘটনায় ১৮টি মামলা হয়। এর মধ্যে চারটি মামলা আদালতে খারিজ হয়ে যায়।

পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ কর্মকর্তা এ কে এম কামরুল আহছান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় সারাদেশে ১৬০টি মামলা হয়েছিল। তদন্ত শেষে ১৪৩টি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়। ফাইনাল রিপোর্ট (চূড়ান্ত প্রতিবেদন) দেওয়া হয় ১৭টি মামলার। ১৬০টি মামলার এজাহারে আসামি করা হয় ২৪২ জনকে। অভিযোগপত্র দেওয়া ১৪৩টি মামলায় আসামি করা হয় এক হাজার ১৫৭ জনকে। এরমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছিল ৯৬০ জনকে।

জেএমবি’র প্রতিষ্ঠাতাদের ফাঁসি

সিরিজ বোমা হামলার তিন মাসের মাথায় ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বোমা হামলা চালিয়ে বিচারক জগন্নাথ পাঁড়ে ও সোহেল আহমেদকে হত্যা করে জঙ্গিরা। ঝালকাঠি জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২০০৬ সালের ২৯ মে এ মামলার নিষ্পত্তি করে সাত শীর্ষ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এ মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে জেএমবি’র শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, খালেদ সাইফুল্লাহ ও ইফতেখার হাসান আল মামুনের (ল্যাংড়া মামুন) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে কারা কর্তৃপক্ষ। তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর দেশে জেএমবি’র জঙ্গি তৎপরতা কিছুটা কমে আসে। তবে তাদের ফাঁসির পর হবিগঞ্জের মাওলানা সাইদুর রহমান জেএমবি’র হাল ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনিও গ্রেফতারের পর পুরনো জেএমবি’র সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

জঙ্গি তৎপরতা দমনে বিশেষায়িত বিভাগ গঠন

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট নামের একটি বিশেষায়িত বিভাগ গঠন করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম এই বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জেএমবি’র উত্থাপন-পতন বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি’র মিডিয়া সেন্টারে মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের বরেন, জেএমবি যারা প্রতিষ্ঠা করেছিল তারা জানান দেওয়ার জন্যই ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট এ সিরিজ বোমা হামলা চালিয়েছিল। পরে তাদের প্রায় সবাই কারাগারে যায়। সাজা হয়েছে অনেকের। শীর্ষ নেতাদের অনেকের মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করা হয়েছে।

মনিরুল ইসলাম বলেন, ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলার ঘটনাটিই সম্প্রতি মূল ধারার জেএমবির বড় কাজ ছিল। এছাড়া তারা আর বড় কোনও ঘটনা ঘটাতে পারেনি। প্রকৌশলী খিজির হায়াত খান হত্যাসহ ছোট ছোট কিছু ঘটনা ঘটিয়েছে। তাই আমরা মনে করিনা যে পুরানো জেএমবির আর কোনও বড় ঘটনা ঘটানোর ক্ষমতা আছে। তবে নব্য জেএমবি যারা, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। পুলিশের অন্যান্য সহযোগী সংস্থাগুলোও তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করছি। এই নব্য জেএমবিও যেন কোনও দিনই আর কোনও ঘটনা সংঘটিত করতে না পারে, সেই লক্ষ্যে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তাই পুলিশের যে সামর্থ্য রয়েছে পুরোটাই আমরা নিয়োজিত করেছি। যেন এ ধরনের হামলা তারা আর করতে না পারে।

/এমএনএইচ/ 

 

লাইভ

টপ