পুনর্গঠনের আগে গোয়েন্দা শাখায় দুর্বলতা ছিল: ডিজি, বিজিবি

Send
জামাল উদ্দিন
প্রকাশিত : ২৩:২০, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৮, ডিসেম্বর ২০, ২০১৬

বিজিবির নতুন মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল আবুল হোসেন।গোয়েন্দা শাখা পুনর্গঠনের আগে এই সংস্থায়  দুর্বলতা ছিল বলে জানিয়েছেন বিজিবির নতুন মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল আবুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘বিজিবির পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে এর গোয়েন্দা শাখাকেও ঢেলে সাজানো হয়েছে। সিকিউরিটি ইউনিট থেকে এখন সেটিকে ব্যুরোতে রূপান্তর করা হয়েছে। রিজিয়ন পর্যায়েও ব্যুরো ও ব্যাটালিয়ন গোয়েন্দাদের আলাদা প্লাটুন রয়েছে। ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাযজ্ঞের পর বাহিনীর পুনর্গঠন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলা ট্রিবিউনসহ কয়েকটি গণমাধ্যমকে বিজিবির ডিজি আবুল হোসেন এসব কথা বলেন।

মেজর জেনারেল আবুল হোসেন বলেন, ‘আগে ইন্টেলিজেন্সে দুর্বলতা ছিল, এজন্য এটাকে ব্যুরো করা হয়েছে। রিজিয়নাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোও করা হয়েছে। ব্যটালিয়ন পর্যায়েও ইন্টেলিজেন্স প্লাটুন আছে। সবক্ষেত্রে সব ব্যাপারে নজরদারি করার জন্য ডিজি হিসেবে আমারও সক্ষমতা বেড়েছে। রিজিয়ন কমান্ডারদেরও হয়েছে। গোটা বাহিনীর সক্ষমতা বেড়েছে। তবে ভালোমন্দ মিলিয়েই একটি বাহিনীতে লোক থাকতে পারে। বিভিন্ন সময় আমাদের যেসব ভুল ত্রুটি হয়, সেগুলো ধরিয়ে দেওয়ার জন্য সার্বক্ষণিকভাবে ইন্টেলিজেন্স কাজ করছে।’

বিজিবির ডিজি বলেন, ‘বিজিবি দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন আমাদের জন্য। পুনর্গঠিত বিজিবির জন্য এটি আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। ২০১০ সালে বিজিবির পুনর্গঠনের আইন হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ শেষ হয়ে এসেছে। এ ধাপে আমরা চারটা রিজিয়ন করেছি। দক্ষিণ-পূর্ব রিজিয়ন, উত্তর-পূর্ব রিজিয়ন, উত্তর-পশ্চিম রিজিয়ন ও দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়ন। ১৬টি সেক্টর করা হয়েছে। আগে ছিল ১২টি সেক্টর। নতুন ১৫টি ব্যাটালিয়ন করা হয়েছে। ৬০০ কিলোমিটার মতো সীমান্ত অরক্ষিত ছিল। সেখান থেকে ৪৬৯ কিলোমিটার সীমান্ত নজরদারিতে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। ১১০ কিলোমিটারের মতো এখনও বাকি আছে। যেটুকু অরক্ষিত আছে, সেখানেও বিওপি স্থাপন করে  শিগগিরই সেটাও নজরদারিতে নিয়ে আসা সম্ভব হবে।’

পুনর্গঠনের মাধ্যমে বিজিবির গতি বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে উল্লেখ করে মেজর জেনারেল আবুল হোসেন বলেন, ‘আর গতিটাই হচ্ছে প্রাণ। একটি বাহিনী সচল থাকলে সেই বাহিনীর কর্ম তৎপরতা অনেক বেড়ে যায়। বিগত কয়েক বছরে বাহিনীর অর্ধেকেরও বেশি সদস্যকে আমরা প্রমোশন দিতে পেরেছি। নতুন সৈনিক নিতে পেরেছি প্রায় ২৪ হাজারের মতো। এটা আমাদের বড় অর্জন।’ তিনি বলেন, ‘২২১ বছরের ইতিহাস বিজিবির। ১৭৯৫ সালে এটা ফ্রন্টিয়ার প্রটেকশন ফোর্স হিসেবে কাজ শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যেই এটাকে রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর ফ্রন্টিয়ার গার্ডস থেকে স্পেশাল রিজার্ভ কোম্পানি ও বেঙ্গল মিলিটারি পুলিশ করা হয়। তখনই তাদের অস্ত্র ও পোশাক দেওয়া হয়েছিল বেঙ্গল প্যারা মিলিটারি ফোর্স হিসেবে। ১৭৯৯ সালে চারটি কোম্পানির একটি পিলখানায় কাজ শুরু করে। এই বিবর্তনের পথ ধরে পরে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) ও সর্বশেষ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হয়েছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এসব পরিবর্তন করা হয়েছে। যুগের সঙ্গে চলতে না পারলে কেউ টিকে থাকতে পারে না।  এ জন্যই বিজিবিতে অনেক পরিবর্তন আসছে।’

যুগের সঙ্গে চলতে গেলে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই চলতে হবে উল্লেখ করে বিজিবি ডিজি বলেন,  ‘সন্ত্রাস এখন ঘরে-ঘরে। আপনিও কিন্তু সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাগ্রত থাকেন সবসময়। কখন আপনি ভিকটিম হয়ে যান। শৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে আমাদের একটা প্রশিক্ষণ থাকে ও নিতে হয়। সেই প্রশিক্ষণেরও অনেক কিছু পরিবর্তন হয় যুগের প্রয়োজনে। এগুলো আমরা শিখছি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেগুলো আত্মস্থ করার চেষ্টা করছি। আমরা দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ নিচ্ছি কাউন্টার টেররিজমের ওপরও।’ তিনি বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণা সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ইপিআরের বাঙালি সদস্য সুবেদর মেজর শওকত আলী। যিনি পরে শহীদ হন। স্বাধীনতা যুদ্ধে ইপিআরের প্রায় সাড়ে ১২ হাজার সদস্য অংশ নিয়েছিলেন। ২ জন বীরশ্রেষ্ঠ, আটজন বীর উত্তম, ৩২ জন বীর বিক্রম ও ৭৭ জন বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন। মোট ৮১৭ জন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে বিজিবির দায়িত্ব পালন সম্পর্কে জানতে চাইলে বিজিবির ডিজি বলেন, ‘‘আমাদের প্রথম কাজ বর্ডার সুরক্ষা করা। নারী ও শিশু পাচার, চোরাচালান দমন করা। এছাড়া অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করতে হয়। দেশের যেকোনও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করছি। যুদ্ধের সময় আমরা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করি। এখন বর্ডারে সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছি। যখন ক্রাইসিস সৃষ্টি হবে, তখন ‘ফার্স্ট লাইন অব ডিফেন্স’ টা আমরাই করি। এছাড়াও দেশের নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার ও স্থানীয় প্রশাসন প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে কাজ করছে। এজন্য একটি কোর কমিটিও আছে। যেখানে সবাই আছে।’’

বিজিবির ডিজি আরও বলেন, ‘বর্ডার সুরক্ষিত করার জন্য অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ থাকে। পৃথিবীতে ‘মডার্ন বর্ডার ম্যানেজমেন্ট’ বর্তমান কনসেপ্ট। সেটা কিভাবে করা যায়। উন্নত দেশগুলো কিভাবে করে। সবারই একটি গার্ডিং ফোর্স থাকে। তারা কিছু কিছু পরিকল্পনা করে। যেমন বর্ডার রুটস। সেটা সার্কুলার রোড, রিং রোড যাই বলেন না কেন, সেটা পুরো বর্ডার জুড়েই থাকে। যেমন আমাদের কাউন্টার পার্টে ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার আছে। তাদেরও কিছু রুট আছে। আমরা এখনও বর্ডার রুটটা করতে পারিনি। সেটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। কারণ, বর্ডার ম্যানেজমেন্ট করতে হলে বর্ডার রুটের প্রয়োজন বেশি। সুন্দরভাবে বর্ডার দেখার অনেকগুলো পথ আছে। যেমন পায়ে হেঁটে, দাঁড়িয়ে ও টাওয়ার করে দেখা যায়। আবার ক্যামেরা ব্যবহার করে এবং স্যাটেলাইট থেকেও দেখা যায়।’ তিনি বলেন, ‘মডার্ন বর্ডার ম্যানেজমেন্টে যেসব সরঞ্জাম আছে, সেগুলো আমরা ব্যবহারের পরিকল্পনা করছি। আমরা হয়তো প্রথম দিকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে বসাব। সরকার এ ব্যাপারে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। বর্ডার রুট কনস্ট্রাকশনের ব্যাপারেও আমরা সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা পাচ্ছি। যেসব সার্ভে সরঞ্জাম আছে, সেগুলো আমরা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহার করব। হিলিতে চোরাচালান একটু বেশি হচ্ছে। সেখানে কিছু ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। এটাও কিন্তু বর্ডার ম্যানেজ মেন্টের একটি অংশ। বর্ডারে রাস্তা ও কিভাবে আলোকিত সেজন্য চেষ্টা চলছে। ব্যাংকের মাধ্যমে সীমান্তের লোকজনকে সাবলম্বী হতে কিভাবে সহযোগিতা করা যায়, সেই পরিকল্পনাও আছে। তাহলে বর্ডারে ক্রাইম কমে যাবে।’

পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে আরও কিছু ব্যাটালিয়ন গড়ে তোলার কথা জানিয়ে বিজিবি ডিজি বলেন, ‘এরইমধ্যে একটি কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন গঠন প্রক্রিয়াধীন আছে। এয়ার উইং আছে। হেলিকপ্টার ছিল। আরও হেলিকপ্টার কিনছি। একটি বেইজও করব সাতকানিয়াতে। সেটা উদ্বোধন করা হয়েছে। টেকনাফে আমরা কিছু সমস্যা মোকাবেলা করছি। আমাদের ওয়াটার ক্রাফট আছে। এরমাধ্যমে আমরা বর্ডার সার্ভিলেন্স করতে পারব। ’

২০০৯ সালে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে যেসব বিজিবি (তৎকালীন বিডিআর) সদস্যের সাজা হয়েছিল, তাদের অনেকেই সাজার মেয়াদ শেষে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছেন। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের প্রেক্ষাপটে তাদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে  মেজর জেনারেল আবুল হোসেন বলেন, ‘আসলে আমরা কে কখন সন্ত্রাসীদের ফাঁদে পা দেব, সেটা কেউই বলতে পারি না। আমাদের ছেলেমেয়ে নিয়েও বলতে পারি না। পরিবারের কেউ যদি সন্ত্রাসে জড়িয়ে যায়, সেটাও অনেক সময় জানা যায় না। না জানারও কারণ আছে। এখন ডিজিটাল যুগ। নানা মাধ্যমে তারা উগ্রপথে চলে যায়। যাদের ব্যাপারে সন্দেহ করছেন তারাও যেতে পারে। সেজন্য যারা বিচারে সাজা খেটে বেরিয়ে গেছেন, তাদের ওপর নজরদারি আছে। তারা কে কোথায় গিয়েছেন, সেটা আমরা সবাই জানি। এলাকার লোকজনও জানেন।’

সীমান্ত হত্যা ও গরু পাচারের বিষয়ে বিজিবির ডিজি বলেন, ‘আমি পাচার বলব না। গরু আসছে। তবে খাটালের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আগে যে খাটাল ছিল ২৫টি, এখন সেটা বেড়ে ১০০টার মতো হয়েছে। রাখালরা আমাদের অগোচরে চলে যেতো সীমান্তের ওপারে। আর তখনই দুর্ঘটনাটা হতো। এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স আছে। আমরা বলেছি, ব্যবসা করতে হলে তারা আমাদের বর্ডার দিয়ে যাবে। তোমরা বর্ডারের খাটাল থেকে নিয়ে আসো। এ জন্য গরু পাচার অনেকটা কমে গেছে। একেবারেই কমে যাবে, যদি আমরা সীমান্তে রাস্তা করে সার্ভিলেন্স সরঞ্জামাদি বসাতে পারি, তাহলে আমরা যেকোনও সময়ে একজন লোককে শনাক্ত করতে পারব। এই সীমাবদ্ধতা আমাদের আছে। বিএসএফর ডিজিও চান না, কোনও অবস্থাতেই একজন লোক মারা যাক। এটা মানবিক গুণাবলির মধ্যেও পড়ে না। তিনি আমাদের কথা দিয়েছেন যে আমার লোকের ওপর আঘাত না করলে আমি বুলেট ব্যবহার করি না। তবে এটা ঠিক যে চোরাকারবাবিরা উদ্ধত আচরণ করে। এজন্য হয়তো তারা বাধ্য হন।  আমরা জিরোর কোটায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করছি।’

রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বিজিবির ডিজি বলেন, ‘এটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ইস্যু। মিয়ানমার বাহিনী যা করেছে, বিভিন্ন মাধ্যমে সেটা আপনারাও দেখেছেন, আমরাও দেখেছি। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত তাদের সঙ্গে রয়েছে। সেটা সুরক্ষিত রাখার জন্য সব সময় চেষ্টা করছি। একটি দেশের সীমানা আছে বলেই সার্বভৌমত্ব আছে। সীমানা না থাকলে সার্বভৌমত্ব থাকে না। দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার জন্য আমরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো দায়িত্ব পালন করি। কোনও অবস্থাতেই যেন কেউ অবৈধভাবে বর্ডার ক্রস করতে না পারে, সেজন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে আমরা মানবিকতার সঙ্গেই সেটা করে থাকি।’

/এমএনএইচ/ 

 

লাইভ

টপ