যেভাবে তামিমের সঙ্গে দেখা হয়েছিল রাজীব গান্ধীর

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ২৩:০২, জানুয়ারি ১৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০৪, জানুয়ারি ১৪, ২০১৭

তামিম-চৌধুরী-ও-রাজীব-গান্ধীগুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় জড়িত জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী ছিল মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরীর অন্যতম সহযোগী। নব্য জেএমবির আধ্যাত্মিক নেতা উত্তরবঙ্গের এক বড় হুজুরের মাধ্যমে তামিমের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। এরপর ধীরে-ধীরে তামিমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে ওঠে সে। কিলার হিসেবে সংগঠনে বিশেষ স্থানও হয় তার। হলি আর্টিজানে হামলার আগে পাঁচ হামলাকারীকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন আস্তানায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টিও সমন্বয় করে এই রাজীব। গ্রেফতারের পর সে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তাদের এসব তথ্য জানিয়েছে।

শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রেফতার করা হয় রাজীব গান্ধীকে। সংগঠনের প্রয়োজনে সে সুভাষ, শান্ত, টাইগার, আদিল, জাহিদ প্রভৃতি নামে আত্মগোপন করে জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। শনিবার তাকে আদালতে সোপর্দ করার পর ৮ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

সিটির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজীবকে রিমান্ডে নিয়ে তার কাছে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করা হবে। সে কিভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে, হলি আর্টিজানে হামলার পুরো ঘটনা ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন হামলার বিষয়েও তথ্য জানতে চাওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘গুলশান হামলার ঘটনায় জড়িত রাজীব এমন একজন, যার কাছ থেকে অনেক তথ্য উদ্ঘাটন সম্ভব হবে।’

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, পাচক থেকে শীর্ষ জঙ্গি নেতা হয়ে ওঠা রাজীব গান্ধী নব্য জেএমবি সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর। জঙ্গিদের ভাষায় সে ছিল পুরো বাংলাদেশের ইসাবা গ্রুপের প্রধান। ইসাবা গ্রুপের সদস্যরা টার্গেটেড লোকজনকে ‘কতল’ করে থাকে। জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব জানিয়েছে, রংপুরের ওসি কুনিও, পঞ্চগড়ের পুরোহিত যোগেশ্বর, দিনাজপুরে হোমিও চিকিৎসকসহ অন্তত ২২টি হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনার সঙ্গে সে জড়িত।

ওই কর্মকর্তা জানান, পুরনো জেএমবির এই সদস্য মূলত উত্তরবঙ্গের ‘বড় হুজুর’ মাওলানা আবুল কাশেমের মাধ্যমে নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়। ২০১৪ সালের শেষের দিকে ওই বড় হুজুর তাকে তামিমের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ওই সময় সে জেএমবির মূলধারার বিচ্ছিন্ন একটি গ্রুপের সঙ্গে চলাফেরা করতো। তার নেতা ছিলো ডা. নজরুল নামে এক ব্যক্তি।

সিটি সূত্র জানায়, সংগঠনের অর্থ আত্মসাৎ করে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করায় রাজীব গান্ধী নিজের হাতেই তার নেতা ডা. নজরুলকে গলা কেটে হত্যা করে। এ কারণে সংগঠনে সবাই তাকে ‘সমীহ’ করেও চলতো বলে জানান গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। কাউকে হত্যার নির্দেশনা পাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই তার বাস্তবায়নের ‘দক্ষতা’ ছিল তার। 

স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ‘হিজরত’

নব্য জেএমবিতে যোগ দেওয়ার আগে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করে থাকলেও স্ত্রী-সন্তানরা থাকতো গাইবান্ধায়। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের পশ্চিম রাঘবপুরের ভূতমারিঘাট এলাকায় তার পৈত্রিক বাড়ি। তবে নব্য জেএমবিতে যোগ দেওয়ার পর সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়েই ‘হিজরত’ করে সে। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি আসে ঢাকায়। তখন থেকে ঢাকার বিভিন্ন আস্তানাতেই থাকতো।

আজিমপুর থেকে গ্রেফতার হওয়া তানভীর কাদেরীর ছেলে আদালতে দেওয়া জবানবন্দি বলেছে, ‘...কয়েকদিন পর তামিম আংকেল ও মারজান আংকেল আমাদের বাসায় আসে। একই দিনে জাহাঙ্গীর (রাজীব গান্ধী) আংকেল, তার স্ত্রী, ছেলে শুভ এবং রিদয় আংকেল, চকলেট আংকেলের সঙ্গে আমাদের বাসায় আসে।’ তানভীর কাদেরীর ছেলে আরও জানায়, ‘দু-এক দিন আগে (গুলশান হামলার) জাহাঙ্গীর আংকেল তার পরিবার ও রিদয় আংকেল বের হয়ে যায়। পাঁচজন চলে যাওয়ার পর তামিম আর চকলেট আংকেল বের হয়।’

এদিকে, রাজীবের স্ত্রী জঙ্গিদের অন্য কোনও আস্তানায় থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন সিটির কর্মকর্তারা। তাদের মতে, রাজীবের স্ত্রী অন্য নারীদের মতো জঙ্গিবাদে ততটা উদ্বুদ্ধ হয়নি। রাজীব সাংগঠনিক কার্যক্রমের কথা তার স্ত্রীর সঙ্গে শেয়ার করতো না। সিটির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমরা তার স্ত্রীকেও আটকের চেষ্টা করছি।’

 ‘যতলোক লাগবে আমি দেব’

গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার মাস দেড়েক আগে ঢাকার মিরপুরের একটি আস্তানায় বৈঠকে মিলিত হয়েছিল শীর্ষ জঙ্গি নেতারা। ওই বৈঠকেই হলি আর্টিজানে হামলার পরিকল্পনা করা হয়। এ জন্য হামলাকারী প্রয়োজন হলে রাজীব বলে, ‘যত লোক লাগবে আমি দেব।’ সিটির কর্মকর্তারা বলছেন, ‘মিষ্টভাষী রাজীব উত্তরবঙ্গ থেকে অনেক তরুণকে কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট করেছে। হলি আর্টিজানের দুই হামলাকারী খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল তারই রিক্রুট করা। এছাড়া সে শোলাকিয়ার হামলাকারী শফিউলকেও জঙ্গিবাদে জড়িত করে।’

সিটির আরেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রাজীব দীর্ঘদিন উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা চষে বেড়িয়েছে। এ সময় সে সংগঠনের জন্য তরুণদের রিক্রুট করতো। এদিকে ঢাকায় বসে উচ্চবিত্তের তরুণদের রিক্রুট করতো মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরী।’

আরও পড়ুন: পাচক থেকে শীর্ষ জঙ্গি নেতা

/এমএনএইচ/

 

লাইভ

টপ