নিউ ওয়েভ ক্লাব থেকে ডিবি পুলিশের টাকা নেওয়ার অভিযোগ ছিল আগেও!

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ০০:২০, এপ্রিল ২১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৩, এপ্রিল ২১, ২০১৭

কাফরুল থানাধীন ইব্রাহীমপুরের পুলপাড় এলাকায় অবস্থিত নিউ ওয়েভ ক্লাবে জুয়ার আসর থেকে গত ১৮ এপ্রিল টাকা-পয়সা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং চারজনকে ধরে নেওয়ার প্রাক্কালে স্থানীয় থানা পুলিশ ও মিলিটারি পুলিশের সহায়তায় জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার (ডিবি-পূর্ব) রুহুল আমিন সরকারের নেতৃত্বাধীন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিমকে আটক করা হয়।
এবারই প্রথম নয়, এক মাস আগেও একই ক্লাব থেকে ১৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ডিবি পুলিশের একই টিমের বিরুদ্ধে। তাদের অর্থ নেওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ স্থানীয় থানায় দেওয়া হলেও পুলিশ কোনও পদক্ষেপ নেয়নি বলে দাবি ক্লাব কর্তৃপক্ষের।
এদিকে এবারের ঘটনা নিয়ে আলোড়ন শুরু হলে বুধবার (১৯ এপ্রিল) এই টিমের ১১ সদস্যের মধ্যে গাড়িচালক বাদে ১০ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তারা হলেন— ডিএমপির একজন কর্মকর্তা জানান, এ ঘটনায় ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) রুহুল আমীন সরকারসহ পরিদর্শক মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহিদুল ইসলাম, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) লুৎফর রহমান, মাহবুবুর রহমান, তোফাজ্জল হোসেন, কনস্টেবল আব্দুল লতিফ, আজিজুল হক, জাহাঙ্গীর আলম খান ও তৌহিদুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গাড়িচালক কনস্টেবল জিল্লুর রহমানের বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তিনি বলেছেন, ‘ডিবির একটি টিম অস্ত্র ও ইয়াবা উদ্ধারে সেখানে গিয়েছিল। একজন নারী মেজরের স্বামীকে আটক করায় বিষয়টি অন্যদিকে মোড় নেয়। আমরা ঘটনা তদন্তে কমিটি করেছি। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সূত্র জানায়, ঘটনাটি নিয়ে পুলিশে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে পুলিশের একটি পক্ষ বিষয়টি ‘মিটমাট’ করার জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন। ইতোমধ্যে তারা ক্লাব কর্তৃপক্ষকে লিখিত কোনও অভিযোগ না দিতে নানাভাবে চাপ প্রয়োগও করেছেন। পুলিশের এক কর্মকর্তার দাবি, তানিয়া নামে এক মেজরের স্বামীকে আটক করা নিয়ে ডিবি পুলিশের সঙ্গে ঝামেলা রয়েছে। এ কারণেই অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার গল্প ফাঁদা হয়েছে।

যেভাবে ঘটনার শুরু
কাফরুল থানাধীন ইব্রাহীমপুর পুলপাড় এলাকার ৮৮ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলায় নিউ ওয়েভ ক্লাবটি অবস্থিত। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই ক্লাবে প্রতিদিনই মদ-জুয়ার আসর বসতো। স্থানীয় থানা পুলিশ এখান থেকে নিয়মিত মাসোহারাও নিতো। কিন্তু মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম ওই ক্লাবে অভিযান চালায়। এ সময় তারা জুয়ার আসর থেকে নগদ টাকা ও ক্লাবে উপস্থিত সবার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়।

এই অভিযানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে ও প্রতিবাদ করলে সুমন আলম, জাহিদ আহমেদ, হাজী আব্দুল আহাদ ও হাবিব ফরিদ নামে চার জনকে আটক করে নিয়ে যায় ডিবি পুলিশের ওই দল। কিন্তু তাদের প্রধান সড়কে নিয়ে গাড়িতে তুললে ক্লাবের অন্য সদস্যরা ছিনতাইকারী ও ভুয়া পুলিশ বলে ধাওয়া দেয়। এ সময় ডিবির মাইক্রোবাসটি (ঢাকা মেট্রো চ-৫১-৪৫৬৭) মিলিটারি পুলিশের ১৩ নম্বর চেকপোস্ট দিয়ে ইউটার্ন নিতে গেলে মিলিটারি পুলিশ তাদের থামায়। সেখান থেকেই উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের জিম্মায় নিয়ে যান ‘আটক’ হওয়া ডিসি সদস্যদের।

এদিকে কাফরুল থানা পুলিশের পক্ষ থেকে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিউ ওয়েভ ক্লাবে ‘ভুয়া পুলিশের অভিযান ও টাকা-পয়সা’ নেওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন তারা। পরবর্তীতে পুলিশ ওই মাইক্রোবাসটিকে চ্যালেঞ্জ করলে সহকারী কমিশনার রুহুল আমীন নিজেকে র্যা ব-৪-এর মেজর মোসাদ্দেক পরিচয় দেন। কিন্তু র্যা ব-৪-এ বিষয়টি খোঁজ নিলে এ নামে কেউ নেই জানায়। পরবর্তীতে মিলিটারি পুলিশের সহায়তায় মাইক্রোবাসে ডিবির টিমকে আটক করা হয়।

নিউ ওয়েভ ক্লাবের সভাপতি সফিউল আজম বলেন, ‘ডিবি পুলিশের লোকজন ক্লাবে গিয়ে তাদের মারধর করে সবার কাছ থেকে অর্থ ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। যাওয়ার সময় চারজনকে বিনা কারণে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। পরে স্থানীয় লোকজন তাদের ধাওয়া দিলে মিলিটারি পুলিশ তাদের আটক করে।’

এক মাস আগেও একই কায়দায় অভিযান
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, গত ১৬ মার্চ একই কায়দায় নিউ ওয়েভ ক্লাবে অভিযান চালিয়েছিল গোয়েন্দা পুলিশ। ওই অভিযানে ক্লাবের জুয়ার বোর্ড থেকে ৯ লাখ টাকা, ক্যাশ বাক্স থেকে ৩ লাখ টাকা ও উপস্থিত সদস্যদের ব্যক্তিগত ৫ লাখ টাকাসহ মোট ১৭ লাখ টাকা নিয়ে যায় ডিবি পুলিশের সদস্যরা। সেই সঙ্গে এক ব্যক্তিকে গাড়িতে তুলে তার কাছ থেকে আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ওই ব্যক্তি এজন্য পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলেও তাকে তা করতে দেওয়া হয়নি। পরে তার পকেট থেকে এটিএম কার্ড নিয়ে ৫০ হাজার টাকা তুলে নেয় ডিবির সদস্যরা।
নিউ ওয়েভ ক্লাবের সভাপতি সফিউল আজম বলেন, ‘তখন ক্লাবের সিসিটিভি ক্যামেরা সচল ছিল। সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে ফুটেজ সংগ্রহ করে থানা পুলিশকে দেওয়া হয়। অভিযোগ করা হয় মৌখিকভাবে। কিন্তু পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেই সময়ও ক্লাবের সদস্যদের মারধর করে সবার কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে যায় ডিবি পুলিশের এই দল।’
ক্লাব কর্তৃপক্ষের এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিকদার মোহাম্মদ শামীম কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নিয়মিত মদ-জুয়ার আসর বসতো ক্লাবে

কাফরুলের রশীদ কমপ্লেক্সের চতুর্থ তলার নিউ ওয়েভ নামে এই ক্লাবটিতে নিয়মিত মদ-জুয়ার আসর বসতো বলে অভিযোগ স্থানীয় লোকজনের। ২০০৫ সালে চালু হওয়া এই ক্লাব আগে ছয় তলা ভবনের তৃতীয় তলায় ছিল। বছর কয়েক আগে এটি চতুর্থ তলায় স্থানান্তর করা হয়। ক্লাবের সঙ্গে একটি ব্যায়ামাগার ও বিলিয়ার্ড বোর্ড রয়েছে। ২০১২ সালে এই ক্লাবে নারীঘটিত একটি ঘটনায় কয়েকজন সদস্যকে কারাগারেও যেতে হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

ভবনটির নিচতলায় ইলেক্ট্রনিক্স দোকান, দ্বিতীয় তলায় ফুড গার্ডেন নামে একটি কমিউনিটি সেন্টার, তৃতীয় তলায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকের শাখা, পঞ্চম তলায় চতুরঙ্গ নামে একটি ড্যান্স ক্লাব ও ষষ্ট তলায় দর্জি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আগে ক্লাবটিতে সারারাত মদ-জুয়ার আসর বসলেও নারীঘটিত কেলেঙ্কারির পর রাত ১২টার সময় এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। মদ-জুয়ার আসর বসানো প্রসঙ্গে ক্লাবের সভাপতি সফিউল আজম বলেন, ‘এসব মিথ্যা কথা। সদস্যরা তাস খেলতো। তাস খেলাকে জুয়া বলা যাবে না।’

/এনএল/জেএইচ/

লাইভ

টপ