behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

গানের দল করতে চান সেই রিতা-মিতা

জাকিয়া আহমেদ০০:৩৮, এপ্রিল ২২, ২০১৭

রিতা মিতা‘আমাদের জন্য যে কেউ ভাবে, চিন্তা করে তাইতো মনে হয় না আমাদের। আসলে কেউ আমাদের নিয়ে চিন্তাই করেনা। আর মন খারাপ হলে গান গাই। শুধু তাই নয়, ইচ্ছে আছে এখান থেকে বাড়ি ফিরে একটা গানের দল করবো। সেই দল গান করবে দেশের নানা জায়গায়। আর তাই দিয়েই আমাদের জীবিকা নির্বাহ করবো।’

ধীরে ধীরে কথাগুলো বলছিলেন নুরুন্নাহার মিতা। আর পাশে বসে তার কথাকে সমর্থন দেন বড় বোন আইনুন্নাহার রিতা। গান কোথায় শিখেছেন জানতে চাইলে তারা বলেন, কোথাও শিখিনি, শুনে শুনেই আমরা ভালো গান গাই।

প্রসঙ্গত, ২০০৫ সালে মিরপুরের একটি বাড়ি থেকে এই দুই বোনকে উদ্ধার করেন মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট এলিনা খান। সে সময় বাড়িটি ভুতের বাড়ি নামেই ডাকা হতো। ওই বাড়িতেই দরোজা জানালা বন্ধ করে তারা থাকতেন। কারও সঙ্গে মিশতেন না, কথা বলতেন না। উদ্ধারের পর তাদেরকে চিকিৎসা দিলে তারা কিছুটা সুস্থ হন। ২০১৩ সালে কাউকে না বলে চলে যান বগুড়ায়। সেখান থেকে তাদেরকে উদ্ধার করে রাখা হয় বড়বোন কামরুননাহার হেনার বাসায়।

জানা গেছে, আইনুন্নাহার রিতা ছিলেন একজন চিকিৎসক। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করেছেন। আর ছোটবোন নুরুন্নাহার মিতা পড়েছেন বুয়েটে। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেব চাকরিও করেছেন। কিন্তু ২০০৩ তাদের মা মারা যাবার পরই দুই বোনের জীবন বদলে যেতে থাকে। দুই বোন রাতের বেলায় হারিকেন নিয়ে মাকে কবর দিতে বের হলে এলাকাবাসী তাদের সন্দেহ করে। পরে পুলিশের সহায়তায় তাদের মাকে কবর দেওয়া হয়।

শুক্রবার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নাসরীন আক্তার দুই বোনের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। এ সময় তাদের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা বলেন, একসময় দুজনই চাকরি করেছেন সরকারি বেসরকারি নানা জায়গায়। কিন্তু প্রথমে বাবা এবং পরে মা মারা যাওয়ার পর সব কেমন বদলে গেল।

হাসপাতালে কবে ভর্তি হয়েছেন জানতে চাইলে রিতা বলেন, তারিখ মনে নেই, তবে কয়েকদিনতো হবেই। হাসপাতালের রেজিস্ট্রার খাতা থেকে জানা যায়, রিতা-মিতাকে গত ১০ এপ্রিল ভর্তি করা হয়।

আপনাদের হাসপাতালে কেন আনা হয়েছে জানতে চাইলে রিতা বলেন, ‘এগুলো বলা নিষেধ। এসব কথা বড়বোনই ভালো বলতে পারবেন।’ হাসপাতালে কে ভর্তি করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বোন জামাই। আমাদের বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে এখানে নিয়ে এলো।’

রিতা-মিতার বোনজামাই আব্দুল মমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সন্দেহবাতিক ছিল তাদের। গত কয়েকবছর ধরে তাদেরকে নিজের বাড়িতে রেখে দেখাশোনা করছি। প্রায় ১০/১৫ দিন আগে থেকে তারা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। তাদের দেখাশোনা করার জন্য যে গৃহকর্মী রাখা হয়েছে তাকে মারধোর করতো। তাই তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এখানে তারা ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করছে। এখন আপাতত তারা সুস্থ আছে বলেই জানতে পেরেছি।’

বাড়িতে কী করতেন জানতে চাইলে নুরুন্নাহার মিতা বলেন, ‘আমি সারাদিন দোয়া পড়তাম।’ আর আব্দুল মমিন বলেন, ‘ওরা ঘরের ভেতর সারাদিন ধ্যান করতো আর গান গাইতো।’

এ বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুইবোনের মধ্যে ছোটবোন মিতা সিজোফ্রেনিয়ার রোগী। চাকরি শুরুর পর থেকেই নানাভাবে সে সন্দেহবাতিক অসুখে আক্রান্ত হয়। আর তার থেকে প্রভাবিত হয় বড়বোন রিতা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয়, ‘শেয়ার ডেলিউশন।’ ছোট বোনের কাছ থেকে শুনে শুনেই তিনি সবকিছুতে আক্রান্ত হন। তারা খুবই সন্দেহবাতিক, কাউকে ভালোভাবে নিতে পারে না, তারা এক ভুলের মধ্যে বাস করছেন। যেখান থেকে তাদেরকে যুক্তিপ্রমান দিয়ে সরানো যাবে না। আশেপাশের সবাইকে তারা সন্দেহ করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘রিতা শুধুমাত্র বোনের সংস্পর্শে থাকার কারণে আক্রান্ত হয়েছে। মিতা যা বলে, রিতাও তাই করে, তার বাইরে সে যাবে না। কিন্তু রিতাকে যদি মিতার কাছ থেকে পৃথক করে চিকিৎসা করানো যেত তাহলে তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করা অনেক সহজ হতো। যদি পরিবার প্রথমদিকে রিতাকে পৃথক করে চিকিৎসা দিতো, তাহলে এতোবছর তাকে রোগী থাকতে হতো না। পারিবারিক সদস্যরা যদি কিছুটা সচেতন হন তাহলে এ ধরণের রোগীদের সুস্থ করা সম্ভব।’

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘রিতা-মিতার মা যখন মারা গেলেন, তখন তারা দুইবোন মৃতদেহ নিয়ে বসেছিল। রাতের বেলায় হারিকেন নিয়ে গেল মাকে কবর দিতে। ওই সময়ও তাদেরকে রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তখনতো পুলিশের দায়িত্ব ছিল দুই মেয়ের কাছে মা মারা যাবার পর কেন তারা মৃতদেহ নিয়ে এবং পরে রাতের অন্ধকারে কবর দিতে গেল তার অনুসন্ধান করা। কারণ হয় তারা খুনী নয়তো তারা মানসিক রোগী। রিতা-মিতার আজকের এই অবস্থার জন্য পুলিশের তখনকার গাফিলতিও দায়ী। তাছাড়া পরবর্তীতে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছোট বোন থেকেও বড় বোনকে পৃথক করা হয়নি। যার কারণে আজ তাদের এই অবস্থা।’

আর কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নাসরিন আক্তার বলেন, ‘তারা আপাতত ভালো আছেন। শারীরিকভাবে আগে দুর্বল হলেও এখন তারা সুস্থ হচ্ছেন।’

/এসএনএইচ/

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ