এক বছরেও ধরা পড়েনি জুলহাজ-তনয়ের খুনিরা!

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ০৭:৫০, এপ্রিল ২৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৮, এপ্রিল ২৫, ২০১৭

এক বছরেও সমকামীদের অধিকার বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘রূপবান’ এর সম্পাদক জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব তনয় হত্যায় জড়িত খুনিরা ধরা পড়েনি। মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া পাঁচ খুনিকে তারা শনাক্ত করেছেন। কিন্তু আত্মগোপনে থাকার কারণে খুনিদের গ্রেফতার করা যায়নি। তাদের গ্রেফতারে জোর প্রচেষ্টা চলছে।

নিহত জুলহাজ মান্নান ও-তার বন্ধু মাহবুব তনয়এদিকে, জুলহাজ মান্নানের পরিবারের সদস্যরা এক বছরেও খুনিরা ধরা না পরায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, এই এক বছরে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগও করেনি।

জুলহাজ ও তনয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বর্তমানে তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবি দক্ষিণ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘মামলার তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। আমরা পাঁচ খুনিকে শনাক্ত করেছি। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এ মামলায় দু’জন গ্রেফতার রয়েছে। এদের মধ্যে একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।’

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জুলহাজ ও তনয় হত্যাকাণ্ডের পরদিন আল-কায়েদার পক্ষ থেকে ‘আনসার আল ইসলাম-৫’ এর নামে এই দায় স্বীকার করা হয়। এই ঘটনার তদন্তে গোয়েন্দা পুলিশ গত বছরের ১৫ মে কুষ্টিয়া থেকে শরীফুল ইসলাম শিহাব নামে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের এক সদস্যকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে ১৭ অক্টোবর সায়েদাবাদ এলাকা থেকে রশিদুন্নবী ভুঁইয়া টিপু ওরফে রায়হান ওরফে রাসেলকে গ্রেফতার করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতারকৃত দু’জনের মধ্যে রশীদুন্নবী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সে নিজে আরেক ব্লগার নাজিমুদ্দিন সামাদ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিলেও জুলহাজ-তনয় হত্যার সঙ্গে সরাসরি অংশ নেয়নি। তবে হত্যাকারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। আর গ্রেফতার হওয়া শিহাব অস্ত্রের যোগানদাতা ছিল বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা।

বহিষ্কৃত মেজর জিয়া ও তার সহযোগী সেলিমজিয়ার নির্দেশনা, পরিকল্পনায় সেলিম
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, অন্যান্য ব্লগার-প্রকাশক হত্যাকাণ্ডের মতো জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতাও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সামরিক শাখার প্রধান সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক। একাধিক আনসারুল্লাহ সদস্যের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতেও জিয়ার নাম এসেছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ‘জিয়ার নির্দেশনায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের স্লিপার সেলগুলি পরিচালনা করতো সেলিম ও শরীফুল। গত বছরের ২০ জুন ঢাকার খিলগাঁওয়ে শরীফুল পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এর আগে থেকেই সেলিম পলাতক রয়েছে। গত বছরের ১৮ আগস্ট সেলিমকে ধরিয়ে দিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়। ওই ঘোষণায় বলা হয় সেলিম ওরফে ইকবাল ওরফে মামুন ওরফে হাদি-২ এর উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি, গায়ের রং শ্যামলা এবং সে চশমা পরে।’

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জুলহাজ-তনয় হত্যা ছাড়াও সেলিম অন্যান্য ব্লগার হত্যাকাণ্ডেরও পরিকল্পনাকারী। সে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের স্লিপার সেলগুলিকে প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য বিষয় তদারকি করতো। তাকে ধরতে পারলে জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া স্লিপার সেলের সদস্যসহ আনসারুল্লাহর অন্য সদস্যদেরও গ্রেফতার করা যাবে।

হতাশ জুলহাজের পরিবার
এক বছরেও ভাইয়ের খুনিরা কেউ ধরা না পরায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন জুলহাজ মান্নানের ভাই মিনহাজ মান্নান। সোমবার রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি হতাশ। এত স্পর্শকাতর একটি ঘটনা, এক বছর পেরিয়ে গেলো পুলিশ তবু হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া কাউকে গ্রেফতার করতে পারলো না।’

মিনহাজ মান্নান আরও বলেন, ‘এই এক বছরে পুলিশের পক্ষ থেকে আমাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। আমরা কোনও আপডেটও জানি না। গণমাধ্যমের বরাতে জানতে পেরেছি পাঁচ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে কিন্তু তারা কারা সে বিষয়ে কোনও তথ্য নেই। আর শনাক্ত করা গেলেও তাদের গ্রেফতার সম্ভব হচ্ছে না কেন তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। আমরা আশা করবো রাষ্ট্র আরও গুরুত্ব দিয়ে খুনিদের ধরতে সচেষ্ট হবে।’

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় রাজধানীর কলাবাগানের তেঁতুলতলা গলির ৩৫ নম্বর আছিয়া নিবাসের বাসায় ঢুকে জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব তনয়কে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। জুলহাজ সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির আপন খালাতো ভাই, সর্বশেষ তিনি ইউএসএআইডিতে কর্মরত ছিলেন। আর মাহবুব তনয় ছিলেন নাট্যকর্মী, পাশাপাশি পিটিএ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে নাট্য প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন।

/এমও/

লাইভ

টপ