Vision  ad on bangla Tribune

শিক্ষিকা নিখোঁজ: প্রশ্ন অনেক, মিলছে না উত্তর

আমানুর রহমান রনি২২:৫১, জুলাই ১৭, ২০১৭

নিখোঁজ শিক্ষিকা ফেরদৌসিরাজধানীর ধানমন্ডির ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের গণিত বিষয়ের শিক্ষিকা ফেরদৌসি একরাম ফৌসিয়া হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় হতবাক হয়ে পড়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও তার পরিবার। কেউ আঁচ করতে পারছেন না এই ঘটনার নেপথ্যের কারণ কী। সদ্য শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করা এই তরুণী শিক্ষিকার ভবিষ্যৎ নিয়েও কেউ কিছুই ধারণা করতে পারছেন না। কেন ওই শিক্ষিকা বাসা থেকে বের হয়েছিলেন, কিভাবে তিনি নিখোঁজ হলেন— এসব প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে পরিবার, স্কুল কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
নিখোঁজ শিক্ষিকার পরিবার ও স্কুল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ফেরদৌসিদের আদি নিবাস নোয়াখালি। তার দাদা সেখান থেকে ঢাকায় এসে কলাবাগান এলাকায় বাড়ি করেন। তার বাবা মো. একরাম ঢাকাতেই বড় হন। তিনিও ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের একজন খণ্ডকালীন শিক্ষক। রাজধানীর আরও একটি স্কুলে তিনি খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন। তার চার মেয়ে, এক ছেলের মধ্যে ফেরদৌসি ম্যাপল লিফের নিয়মিত শিক্ষক। ফেরদৌসির আরও এক বোন সেখানকার খণ্ডকালীন শিক্ষক। তাদের কলাবাগানের বাড়ির জমিটি একটি ডেভলপার কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে। পরিবারটি গ্রিন রোডের বাসায় ভাড়া থাকে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, আর্থিকভাবে খুব বেশি স্বচ্ছল নয় ফেরদৌসির পরিবার। ফেরদৌসি নিখোঁজ হওয়ার পর শুরুতে স্কুলে বলা হয়েছিল তার শারীরিক অসুস্থতার কথা। স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে নিখোঁজ হওয়ার তথ্য গোপন রেখেছিলেন তার বোন। চাকরিটা ফেরদৌসির খুব জরুরি বলেও তিনি জানান স্কুলকে। তবে দুই-তিন দিন পরও ফেরদৌসির সন্ধান না পাওয়ার পর সেটা স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানান তিনি।
সোমবার (১৭ জুলাই) ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কর্তৃপক্ষ ও নিখোঁজ শিক্ষিকার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২ জুলাই সন্ধ্যায় রাজধানীর গ্রিন রোডের বাসা থেকে বেরিয়ে ফেরদৌসি আর ফিরে আসেননি। পরদিন ৩ জুলাই এ ঘটনায় কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বড় ভাই এ কে এম এহসান উল্লাহ। কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ওই জিডির নম্বর ১১৪। জিডিটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় কলাবাগান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বাবলুর রহমানকে।
এই বাড়িতে থাকেন ফেরদৌসিধানমন্ডির ১৪/এ, ১১/এ ও ৭/এ নম্বর রোডে রয়েছে ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের তিনটি শাখা। ফেরদৌসি ছিলেন ৭/এ শাখার গণিতের শিক্ষক। তার বাবা ও বোন ছিলেন ১১/এ শাখার খণ্ডকালীন শিক্ষক। সোমবার সকালে স্কুলের সবগুলো শাখায় সরেজমিনে গিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, ফেরদৌসির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বিব্রত। কেউই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চান না।
ফেরদৌসি স্কুলের যে শাখায় কর্মরত ছিলেন, সেখানে গিয়ে কথা হয় শাখার সুপারভাইজার আসাদুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত জানুয়ারিতে স্কুলে যোগ দেন ফেরদৌসি। তিনি অনেক শান্ত স্বভাবের, মিশুক। গত ছয় মাসে তিনি মাত্র চার দিন ছুটি কাটিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঈদের পর ৩ জুলাই স্কুল খুললে ওইদিন ফেরদৌসি স্কুলে আসেননি। পরদিন তার মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে তার বোন জানান, ফেরদৌসি অসুস্থ, স্কুলে যোগ দিতে দুয়েকদিন সময় লাগবে। টেকনিক্যালি বিষয়টি ম্যানেজ করার অনুরোধ করেন তিনি। পরে ৬ জুলাই আবার তার বাড়িতে যোগাযোগ করলে নিখোঁজের খবরটি জানতে পারি। এরপর বিষয়টি আমরা প্রধান কার্যালয়ে জানাই।’
আসাদুজ্জামানের পাশেই বসে থাকা নিরা নামে ফেরদৌসির এক সহকর্মী বলেন, ‘ফেরদৌসি খুব চমৎকার একজন মানুষ। তার চলাফেরা খুব সাধারণ। স্কুল কামাই দিতেন না তিনি। শিক্ষক হিসেবেও তিনি ভালো। শিক্ষার্থীদের প্রিয় একজন শিক্ষক ফেরদৌসি ম্যাডাম। এখানে সাধারণত কোনও শিক্ষক এক সপ্তাহ অনুপস্থিত থাকলে তাকে আর চাকরিতে রাখা হয় না। তবে ফেরদৌসির জন্য আমরা অপেক্ষা করেছি। তার সঙ্গে কী ঘটেছে, তার কোনও ধারণা আমাদের নেই।’
সোমবার দুপুরে নিখোঁজ শিক্ষিকার গ্রিন রোডের বাসায় গিয়ে দেখা গেছে, পাঁচ তলা ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত মোট ২৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে। ফেরদৌসিরা ওই বাসার পাঁচ তলার একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন। তার বড় ভাই এ কে এম এহসান উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এখনও কোনও খোঁজ পাইনি। ধারণাও করতে পারছি না কিভাবে এই ঘটনা ঘটলো। আমাদের কারও মন ভালো নেই।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় কারও সঙ্গে তার কোনও ঝগড়া হয়নি, কারও সঙ্গে মনোমালিন্যের ঘটনাও ঘটেনি।’
ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশাল স্কুলের এই শাখার শিক্ষিকা ফেরদৌসিবাড়িটির কেয়ারটেকার মান্নানের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ঘটনার দিন আমি ডিউটিতে ছিলাম না। স্যার (ফেরদৌসির বাবা) আমাকে বলেছেন যে ম্যাডামকে (ফেরদৌসি) খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গেছেন, কেউ বলতে পারে না। ওইদিন যে দায়িত্বে ছিল তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন স্যার। তবে কিছুই জানা যায়নি।’
শিক্ষিকা ফেরদৌসির নিখোঁজের ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। কলাবাগান থানার ওসি এনামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফেরদৌসির নিখোঁজ হওয়ার পরদিন জিডি করা হয়। পরে আমরা তাদের বাসায় গিয়েছি, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছি। পরিবারের কারও সঙ্গে মনোমালিন্য হয়েছিল কিনা কিংবা কারও সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল কিনা— এসব তথ্য জানতে চেয়েছি। তবে এমন কোনও তথ্য তারা কেউ জানাতে পারেননি। ওই বাসায় কোনও সিসি ক্যামেরা নেই। বাসার পাশের ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির সিসি ক্যামেরাতেও কিছুই পাইনি।’
তদন্তে এখনও কিছু পাওয়া যায়নি জানিয়ে ওসি বলেন, ‘বাসায় যে ফোনটি তিনি রেখে গেছেন, আমরা তার কললিস্ট উঠিয়েছি। তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ওই শিক্ষিকা এক ছাত্রের সঙ্গে দেখা করতে বাসা থেকে বেরি হয়েছিলেন বলে জেনেছি। তিনি স্বেচ্ছায় বাসা থেকে বেরিয়ে গেছেন নাকি তাকে অপহরণ করা হয়েছে, তা জানার চেষ্টা করছি।’
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের উপকমিশনার (ডিসি) মহিবুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তবে এটা নিয়ে এখই বলার মতো কোনও তথ্য আমরা পাইনি। এর সঙ্গে জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদের কোনও সম্পর্ক আছে কিনা, সেটাও বলা যাচ্ছে না।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিচ্ছি। তবে এখনও কোনও কিছু পাইনি। অনেক কিছু মাথায় রেখেই তদন্ত করছি।’

আরও পড়ুন-

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষিকা দুই সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ

/টিআর/

লাইভ

টপ