সিরিজ বোমা হামলার ১২ বছর: বিচারাধীন এখনও ৪৬ মামলা

Send
জামাল উদ্দিন
প্রকাশিত : ০০:৩১, আগস্ট ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩১, আগস্ট ১৭, ২০১৭

জেএমবির সিরিজ বোমা হামলার ১২ বছর‘আল্লাহর আইন কায়েম ও প্রচলিত বিচার পদ্ধতি’ বাতিলের দাবি জানিয়ে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশের ৬৩ জেলার প্রায় পাঁচশ’ স্পটে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দেয় জঙ্গি সংগঠন জামা’তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)।এতে দু’জন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছিলেন।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, জেএমবি’র সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় সারাদেশে ১৫৯টি মামলা দায়ের হয়। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি করা হয় ২৪২ জনকে।পরে অভিযোগপত্র দেওয়ার সময় পুলিশ এক হাজার ১০৬ জনকে অভিযুক্ত করে ১৪৯টি মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয় আদালতে। এর মধ্যে ১০টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। অপর ৪৬টি মামলা আদালতে এখনও বিচারাধীন রয়েছে। আর অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে ৯৬০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
আদালত সূত্র আরও জানায়, দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে ৯৩ টির রায়ে মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে ৩২০ জনকে সাজা দেন আদালত। তাদের মধ্যে ২৭ জনকে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড।খালাস দেওয়া হয় ৩৪৯ জনকে। কারাগারে আটক অবস্থায় স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে সাত জঙ্গির। ঢাকা মহানগরীর ৩৩ স্পটে বোমা হামলার ঘটনায় ১৮টি মামলা হয়। এর মধ্যে চারটি মামলা আদালতে খারিজ হয়ে যায়। এই ১৪টি মামলার ২টির রায় দেওয়া হয়েছে।
জঙ্গি দমনে কাজ করছেন এমন পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, পুরানো ও নব্য জেএমবি’র সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তারাও পারস্পরিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানের কারণে সাংগঠনিকভাবে সংঘবদ্ধ হতে পারছে না। তবে তাদের অপতৎপরতা থেমে নেই। খণ্ড-বিখণ্ড জেএমবি’র ছোট ছোট গ্রুপগুলো নাশকতা চালাতে ছক কষছে সারাক্ষণই। তবে বড় ধরনের হামলা করার মতো এখন তাদের কোনও সক্ষমতা নেই।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার পরও একের পর এক আত্মঘাতী বোমা হামলা চালাতে থাকে জঙ্গিরা। এতে দেশব্যাপী চরম নৈরাজ্য শুরু হয়। এসব বর্বরোচিত বোমা হামলায় বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ তখন ৩৩ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। আহত হন আরও অনেকে।
জঙ্গি দমনে বিশেষায়িত টিম পুলিশের ‘কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)-এর প্রধান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নিজেদের অস্তিত্ব ও সাংগঠনিক সক্ষমতা দেখাতে ও জাতীয়-আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ৬৩ জেলায় প্রায় পাঁচশ’ স্থানে জেএমবি একযোগে বোমা হামলা চালিয়েছিল। তাতে তারা সফলও হয়েছিল। এই সিরিজ বোমা হামলার পর তারা যে আলটিমেটাম দিয়েছিল তার ভিত্তিতেই তারা সুইসাইডাল অ্যাটাক করতে থাকে। দু’জন বিজ্ঞ বিচারকসহ বেশ কিছু জুডিশিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সঙ্গে যারা জড়িত, জুডিশিয়াল প্রসেসের সঙ্গে যারা জড়িত, অর্থাৎ জাজেস, অ্যাডভোকেট ও পুলিশের ওপর হামলা চালাতে থাকে। এই তিন শ্রেণির ওপরই তারা একাধিক হামলা করে বেশ কিছু লোককে হতাহত করে।
জেএমবি’র প্রতিষ্ঠাতাদের ফাঁসি
সিরিজ বোমা হামলার তিন মাসের মাথায় ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বোমা হামলা চালিয়ে বিচারক জগন্নাথ পাঁড়ে ও সোহেল আহমেদকে হত্যা করে জেএমবি’র জঙ্গিরা। ঝালকাঠি জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২০০৬ সালের ২৯ মে এ মামলার নিষ্পত্তি করে সাত শীর্ষ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে জেএমবি’র শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, খালেদ সাইফুল্লাহ ও ইফতেখার হাসান আল মামুনের (ল্যাংড়া মামুন) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে কারা কর্তৃপক্ষ। শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে জেএমবি’র প্রথম অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে বলে মনে করেন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, এরপর দ্বিতীয় অধ্যায়ে হবিগঞ্জের মাওলানা সাইদুর রহমান জেএমবি’র আমীর হিসেবে হাল ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাকেও গ্রেফতারের মাধ্যমে জেএমবি’র সেই চেষ্টাও ভন্ডুল করে দেওয়া হয়।
২০১৪ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরীর হাত ধরেই নব্য জেএমবি’র যাত্রা শুরু হয় বলে জানান মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, নব্য জেএমবি’র বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের অন্যান্য সহযোগী সংস্থাগুলোও তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করছি। এই নব্য জেএমবিও যেন কোনোদিনই আর কোনও ঘটনা ঘটাতে না পারে, সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
র‌্যাব সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, গুলশানের হলি আর্টিজানে নব্য জেএমবি’র হামলার পর র্যা বের অভিযানে জেএমবি ১৬৬ জনসহ ১৯৪ জনকে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। আত্মসমর্পণ করেছে ১১ জন। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ১৪ জন। র্যা বের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে একজন। আত্মঘাতী জঙ্গি নিহত হয়েছে ১৩ জন।

আরও পড়ুন-

জঙ্গি সাইফুলের সঙ্গে একাধিক লোক ছিল: ডিএমপি কমিশনার

নিষিদ্ধের পরও হোটেল ওলিওতে বোর্ডার থাকার কারণ খুঁজছেন গোয়েন্দারা

/জেইউ/টিএন/

লাইভ

টপ