৫৭ ধারাসহ আরও বেশকিছু আইন বাতিলের সুপারিশ টিআইবি’র

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৯:৪০, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫৮, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭

এসডিজি অর্জন বিষয়ক টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনে সংবাদ সম্মেলনতথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারাসহ বেশকিছু আইন ও আইনের ধারা বাতিলের সুপারিশ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) ১৬: দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যের ওপর বাংলাদেশের প্রস্তুতি, বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গবেষণায় এই সুপারিশ করা হয়।
রবিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) টিআইবি’র ধানমন্ডি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) ১৬’র দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন বিষয়ক লক্ষ্যগুলো অর্জনে আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য এসব সুপারিশ করা হয়।
টিআইবি’র আইনি সুপারিশগুলোতে বলা হয়, তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০১৩-এর ৫৭ ধারা বাতিল করতে হবে; বৈদেশিক অনুদান আইন ২০১৬-এর ১৪ ধারার নিবর্তনমূলক অংশ বাতিল করতে হবে; পুলিশকে জনবান্ধব করার জন্য পুলিশ আইন ১৮৬১ সংস্কার করতে হবে ও বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর ৫৪ ধারা বাতিল করতে হবে; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা করার বিধান রদ করতে হবে; নির্বাচন কমিশন গঠন, কমিশনারদের প্রক্রিয়া ও কর্যক্রম বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে হবে; জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে উত্থাপিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত ও মামলা করার ক্ষমতা দিতে হবে এবং তথ্য অধিকার আইনে ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
টিআইবি’র সুপারিশে আরও বলা হয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ও সদস্যদের নিয়োগে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ ও নিয়োগে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে; সংবিধানের ৭০ ধারা সংশোধন করে কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া সংসদ সদস্যদের নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে বা বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার অনুমোদন দিতে হবে; অধস্তন আদালতের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণমূলক ধারা বাতিল করতে হবে এবং সরকারি কর্মচারীদের স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, অধিকার ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে পাবলিক সার্ভিস আইন প্রণয়ন করতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের সুপারিশগুলোতে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থপাচার প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ তাদের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলা হয়।
প্রায়োগিক পর্যায়ের ক্ষেত্রে জাতীয় শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা, সন্তুষ্টি এবং ঘুষ ও দুর্নীতির অভিজ্ঞতা বিষয়ে দেশব্যাপী বেজলাইন জরিপ পরিচালনার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া, এসডিজি ১৬’কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন; দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া; দুর্নীতির মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং স্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাসহ সব ধরনের বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়।
টিআইবি’র গবেষণায় বলা হয়, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) ১৬’র দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন বিষয়ক লক্ষ্যগুলো অর্জনে বাংলাদেশে প্রচলিত আইন, নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পর্যাপ্ত থাকলেও অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আইন এবং আইন প্রয়োগ ও চর্চায় দুর্বলতা ও ঘাটতি, আইনের অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় আইনের প্রয়োগ প্রভৃতি কারণে লক্ষ্যগুলো অর্জনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও বাংলাদেশে দুর্নীতি ও ঘুষ, অর্থপাচার, মৌলিক স্বাধীনতার ব্যত্যয় ও মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় শুদ্ধাচার কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশিত পর্যায়ে কার্যকর নয় এবং এজন্য দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, নির্বাহী বিভাগ ও প্রশাসনের আধিপত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই জনগণের কাছে জবাবদিহিতার কোনো কাঠামো নেই এবং এসব প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ব্যবস্থাও দুর্বল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশও পর্যাপ্ত নয়। এছাড়া, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসনের সাথে সংশ্লিষ্ট অর্থপাচার ও সম্পদ পুনরুদ্ধারসহ কয়েকটি বিষয়ে সরকারের কাছে আংশিক তথ্য থাকলেও দুর্নীতি ও ঘুষ, সরকারি সেবা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের সন্তুষ্টি এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিষয়ে কোনও তথ্য নেই।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সার্বিকভাবে এসডিজি’র বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য ২৪১টি সূচকের মধ্যে সরকারের কাছে ৭০টি সূচকের ওপর সম্পূর্ণ এবং ১০৮টি সূচকের ওপর আংশিক তথ্য রয়েছে। ৬৩টি সূচকের ওপর সরকারি কোনও তথ্যই নেই।
গবেষণার ফলাফল ও সুপারিশের ওপর গুরুত্ব দিয়ে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে সন্তোষজনক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পাশাপাশি সক্ষমতা ও প্রস্তুতি বিবেচনায় বাংলাদেশ সঠিক পথে রয়েছে। তবে গবেষণায় উদঘাটিত ঘাটতি ও উদ্বেগের বিষয়গুলো নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হলে অভীষ্ট অর্জনের পথ থেকে ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যে নানামুখী পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন জরিপ ও তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, এর সুফল সব ক্ষেত্রে জনগণ পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য সব পরিকল্পনা, কার্যক্রম ও কর্মসূচিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।’
টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা ও নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান।
আরও পড়ুন-

শরণার্থী আশ্রয় নীতিমালা চেয়ে হাইকোর্টে রিট

পাঠ্যপুস্তকের কনটেন্ট সংশোধন না হলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

/আরজে/টিআর/

লাইভ

টপ