ডা. চিশতীর আবিষ্কার: পানিভর্তি শ্যাম্পুর বোতলে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ০৩:০৩, অক্টোবর ২৯, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৪, অক্টোবর ২৯, ২০১৭

ডা. মোহাম্মদ যোবায়ের চিশতীউন্নত বিশ্বে ফুসফুসের ছোট ছোট বায়ুপ্রকোষ্ঠগুলোকে খোলা রাখার জন্য এবং সেখানে প্রেসার (চাপ) দেওয়ার জন্য একধরনের যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। যা ফুসফুসে বুদবুদ তৈরি করে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ফুসফুসকে সচল রাখে। কিন্তু এই চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। ব্যয়বহুল এই চিকিৎসার পদ্ধতির বিপরীতে বাংলাদেশি একজন চিকিৎসক কেবলমাত্র একটি পানিভর্তি শ্যাম্পুর বোতল আর একটি প্লাস্টিকের সাহায্যে এমন এক চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন যা নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশু মৃত্যুহার কমিয়ে এনেছে বিস্ময়করভাবে।

আইসিডিডিআর,বিতে কর্মরত ডা. মোহাম্মদ যোবায়ের চিশতী উদ্ভাবিত সেই চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। পদ্ধতিটি অনুসরণ করে তারা তাদের পলিসিতে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। এছাড়া আগ্রহ প্রকাশ করেছে বেশকিছু দেশও। সেসব দেশে অতি শিগগিরই অতি স্বল্পমূল্যের এই চিকিৎসা পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

কেমন করে এই পানিভর্তি শ্যাম্পুর বোতল আর একটি প্লাস্টিক মিলে নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশু মৃত্যু হার কমিয়ে আনলো এবং কেনই বা এই আবিষ্কারের নেশা তাকে পেয়ে বসলো সেই গল্প ডা. মোহাম্মদ যোবায়ের চিশতী জানিয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনকে।

তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালে ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে প্রথম কাজ শুরু করি সিলেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে। সেখানে আমার প্রথম ওই রাতটাই ছিল জীবনের অত্যন্ত দুর্বিসহ। যখন ডিউটি শুরু হয়, একের পর এক নিউমোনিয়ার রোগী আসতে থাকে। সেদিন রাতে প্রায় ১৫-২০টি শিশুকে নিয়ে আসা হয় যার মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক।’

ডা. চিশতী

তিনি আরও বলেন, ‘একই ধরনের চিকিৎসায় কয়েকজন শিশু ভালো হলেও তিনজনকে কোনোভাবেই সুস্থ করতে পারিনি। আমার জ্ঞান এবং সাধ্যে সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেও বাচ্চাদের সুস্থ করতে পারিনি। সেদিন খুবই অসহায় লাগছিল। মনে হচ্ছিল  মেডিক্যালে পড়ে তাহলে কী করলাম? চোখের সামনে শিশু তিনটির অবস্থা খারাপ হতে থাকলো, মারা যাচ্ছে কিন্তু কিছুই করতে পারছিলাম না।’

সব ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করার পরও শিশুদের সুস্থ করতে না পেরে হতাশ হন ডা. চিশতী। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়েছিল, এমন কিছু নিশ্চই আছে যেটা আমরা চেষ্টা করিনি, হয়তো আমাদের জ্ঞানের স্বল্পতা কিংবা পর্যাপ্ত রিসোর্সের অভাব। আমি তখনও জানি না, কী রির্সোস আমাদের নেই। মনে হলো, ভবিষ্যতে এ ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হলে আমি কী করতে পারি? আমাকে কিছু একটা করতে হবে যেন এই মৃত্যুহার কমানো যায়। ওই মুহূর্তে আমি শুধুই ‘শিশুদের ডাক্তার’ হতে চাইলাম।’

সে লক্ষ্যেই পড়াশুনা শুরু করেন চিশতী। আইসিডিডিআর,বিতে একটা ট্রেনিংয়ের পর ২০০২ সালে এখানেই মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে যোগদান করেন তিনি। নিজেকে একজন ‘পেডিয়াট্রিক রেসপেরটরি ফিজিশিয়ান’ হিসেবে গড়ে তুলতে চান বলে জানান সবাইকে। তখনও আইসিডিডিআর,বিতে নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা অনেক। বেশি ছিল মৃত্যুহারও। এরপর অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে রয়েল চিলড্রেনস হাসপাতালে স্কলারশিপ পেয়ে যান। পড়াশোনা করেন শিশু এবং শিশুদের ফুসফুস বিষয়ে।

ডা. মোহাম্মদ যোবায়ের চিশতীসেখানে গিয়ে পেয়েছিলেন ট্রেভর ডিউককে। যিনি নিজেও পেডিয়াট্রিক রেসপেরটরি ফিজিশিয়ান হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কাজ করেছেন। দেশে ফিরে আসার আগে ট্রেভর চিশতীকে বলেন, ‘যেহেতু তুমি দেশে ফিরে যাচ্ছো তাই এমন কিছু কর যেটা তোমার পলিসি বদলাবে এবং একইসঙ্গে দেশের মানুষের জন্য সিগনিফেকেন্ট ইমপ্যাক্ট ফেলবে।’
ফিরে এসে ২০১০ সালে আইসিডিডিআর,বিতেই যোগ দেন চিশতী।

চিশতী বলেন, ‘নিউমোনিয়ার আক্রান্ত মৃত্যুহার তখন কিছুটা কম। তারপরও আমাদের মতো হাসপাতালে যেখানে অক্সিজেন, অ্যান্টিবায়োটিক, রুটিন সাপোর্টিভ কেয়ার রয়েছে সেখানে নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুহার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ, আর নিউমোনিয়ার সঙ্গে রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা থাকে এমন রোগীর সংখ্যা ২১ শতাংশ।’

তারা মাথায় চিন্তা আসে যে এমন কিছু একটা করতে হবে যেটা পুরো দেশের তৃণমূল পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও কাজ করবে। সেই ভাবনায় থেকেই খুব কম খরচে কী করা যায় সে বিষয়ে কাজ করতে শুরু করেন।

তিনি বলেন, ‘সহকর্মীদের নিয়ে আইসিইউতে থাকা শ্যাম্পু বোতল নিয়ে সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করলাম। পানিভর্তি শ্যাম্পুর বোতলগুলোর সঙ্গে প্লাস্টিকের টিউব সংযুক্ত করে ফুসফুসে বুদবুদ দিয়ে পরীক্ষা চালালাম কয়েকটি শিশুর ওপর। আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, কয়েকঘণ্টার মধ্যে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত শিশুগুলো ভালো হয়ে যাচ্ছে। তখনই মনে হয়েছিল এটা যুগান্তকারী কিছু একটা হবে, অ্যান্ড দ্যাটস মেক দ্যা স্টোরি।’

ডা. মোহাম্মদ যোবায়ের চিশতীএটা কিভাবে কাজ করে- জানতে চাইলে ডা. চিশতী বলেন, ‘নিউমোনিয়া হলে শিশুদের অক্সিজেন দিতে হয়। তখন অক্সিজেন সিলিন্ডারের নলের সঙ্গে প্লাস্টিকের পানির বোতলের নলের একটি অংশ সংযুক্ত করা হয়। যখন শিশুটি শ্বাস নেয় তখন ওই নলের মাধ্যমে পানির বোতলে বুদবুদ তৈরি হয়। এতে বোতলের মধ্যে একটি চাপ তৈরি হয়। যা ফুসফুসকে সচল রাখতে সাহায্য করে, ফুসফুস চুপসে যেতে বাধা দেয় এবং নিঃশ্বাসের সঙ্গে অক্সিজেন নেওয়া সহজ করে।’

এরপর সহকর্মীদের নিয়ে দুইবছরের একটি ট্রায়াল চালান ডা. চিশতী। দেখতে পান, শ্যাম্পু বোতল দিয়ে তৈরি করা পানি বুদবুদ দিয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ বাচ্চা কম মারা যাচ্ছে। এটাই বিশেষ অর্জন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২০১৩ সালের জুলাইয়ে এই ট্রায়াল শেষ হওয়ার পর থেকে এই চিকিৎসা পদ্ধতি আইসিডিডিআর,বিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে হাসপাতালে নিউমোনিয়া আক্রান্ত হওয়া শিশুদের মৃত্যুহার ৭৫ শতাংশ কমে গেছে।’

২০১৫ সালে লন্ডনভিত্তিক বিখ্যাত স্বাস্থ্য বিষয়ক জার্নাল ‘ল্যানসেট’-এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সেবছর ১২ নভেম্বরে বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবসে গ্লোবাল নিউমোনিয়া নেটওয়ার্ক ‘মোস্ট প্রমিজিং চাইল্ডহুড নিউমোনিয়া ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করে।

ডা. চিশতী বলেন, ‘এখন আমরা এই চিকিৎসা পদ্ধতিকে দেশের তৃণমূল পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছি, বিশেষ করে যেসব হাসপাতালে নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশু মৃত্যুহার অনেক বেশি।’

ইতোমধ্যেই এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইথিওপিয়া, মিয়ানমার এবং নেপাল। এভাবেই সারা বিশ্বে চিকিৎসা ছড়িয়ে পড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে ডা. চিশতী বলেন, ‘আমি সেদিনের অপেক্ষায় রয়েছি যখন  সারাবিশ্বে এই বিষয়ে বাংলাদেশের নাম পাইওনিয়ার হিসেবে উচ্চারিত হবে।’
আরও পড়ুন:
খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে দুই বছরে ৪ বার হামলা

/এমএইচ/এসএনএইচ/

লাইভ

টপ