পারিবারিক কলহে যেভাবে তারা ঘাতক হয়ে উঠেছে

Send
জামাল উদ্দিন ও নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ২৩:৩৫, নভেম্বর ০৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:০৩, নভেম্বর ০৪, ২০১৭

 

111যে মায়ের কোল হওয়ার কথা সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়, সেই মা-ই হয়ে উঠছেন ঘাতক। বাবা হয়ে উঠছেন সন্তান হত্যা মামলার প্রধান আসামি। ভেঙে পড়ছে পারিবারিক বন্ধন। প্রিয় মানুষরাই নির্মমভাবে হত্যা করছেন স্বজনদের। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা কেন এমন ঘাতক হয়ে উঠছেন? সমাজবিজ্ঞানী ও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এসবের নেপথ্য কারণ সম্পত্তি ও বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক। চলতি সপ্তাহে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীর কাকরাইল ও বাড্ডায় জোড়া খুনের ঘটনা এমনটাই প্রমাণ করে মনে করছেন তারা।

রাজধানীর কাকরাইলে শেখ আব্দুল করিমের একাধিক বিয়ে ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই মা-ছেলে খুন হয়েছেন বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তবে খুনি কারা, সেই বিষয়ে নিশ্চিত হতে আরও কিছু সময় লাগবে বলে মনে করেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এদিকে রাজধানীর বাড্ডায় বাবা-মেয়ে খুনের ঘটনারও রহস্য উন্মোচিত হয়েছে বলে জানান তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নিহত জামিল শেখের স্ত্রী আরজিনাকে ঘটনার পরপরই গ্রেফতার করা হয়। একই অভিযোগে শুক্রবার খুলনা থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে জামিল শেখের সাবলেট ভাড়াটিয়া শাহিনকে।

বুধবার সন্ধ্যায় রমনা থানার কাকরাইলের ৭৯/এ আঞ্জুমান মফিদুল রোডের মায়াকানন নামে একটি ছয় তলা ভবনের পঞ্চম তলার নিজ বাসায় দুর্বৃত্তরা গলা কেটে হত্যা করে শামসুন্নাহার করিম ও তার ছেলে সাজ্জাদুল করিম শাওনকে। ঘটনার পরপরই শামসুন্নাহারের স্বামী আব্দুল করিম, গৃহকর্মী রাশিদা বেগম ও দারোয়ান আব্দুল নোমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। পরে তাদের এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

কাকরাইল জোড়া খুনের ঘটনায় তদন্তে সংশ্লিষ্ট ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘গৃহকর্তা আব্দুল করিম তিন বিয়ে করেছেন। তৃতীয় স্ত্রী শারমিন আক্তার মুক্তা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের জানিয়েছেন, দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির চার বছর আগে আব্দুল করিম তাকে বিয়ে করেন। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা এখনও স্বীকার করেনি। গৃহকর্মী রাশিদা বেগম ও নিরাপত্তাকর্মী আবদুল নোমানকে পুলিশ থানা হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ঘটনার পরপরই স্বামী আবদুল করিম ও নিহত মা-ছেলের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড (সিডিআর) নিয়ে তদন্ত কাজ শুরু করা হয়েছে।’

তদন্তে সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, আব্দুল করিম চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। চার বছর আগে এফডিসিতে মুক্তি পায় ‘বন্ধু তুমি শত্রু তুমি’ সিনেমাটি। এই সিনেমার প্রযোজক হলো শেখ মো. আব্দুল করিম। ছবিটি শাওন কথাচিত্রের ব্যানারে নির্মিত। এই ছবির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি নাম হলো মুন্না ফুড অ্যান্ড বেভারেজ। এই ছবিতে চিত্রনায়ক মারুফ ও নায়িকা সাহারার সঙ্গে শেখ মো. আব্দুল করিম পুলিশের ওসির চরিত্রেও অভিনয় করেন। এই ছবি করতে গিয়েই মুক্তার সঙ্গে আব্দুল করিমের পরিচয় ও পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে বিয়ে হয়। করিমের একাধিক বিয়ে নিয়ে প্রথম স্ত্রী শামছুন্নাহারের সঙ্গে মনোমালিন্য চলে আসছিল দীর্ঘদিন থেকে। সম্প্রতি ছোট স্ত্রী মুক্তা ভাই আল আমিনসহ দলবল নিয়ে প্রথম স্ত্রী শামসুন্নাহার ও তার ছেলে শাওনকে মারধর করেছে। আবদুল করিমের দু’টি বাড়িসহ অনেক সম্পত্তি রয়েছে। এ নিয়েও তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন প্রথম স্ত্রী শামসুন্নাহারের সঙ্গে করিমের হাতাহাতিও হয়। ওইসময় আবদুল করিম শামসুন্নাহারকে জানে মেরে ফেলারও হুমকি দিয়েছিলেন। তাদের অন্য দুই ছেলের মধ্যে মুন্না লন্ডনে ও মেজ ছেলে অনিক কানাডায় থাকেন।

রমনা থানার ওসি কাজী মাইনুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিহতের ভাই আশরাফ আলী বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় আব্দুল করিম, মুক্তা ও মুক্তার ছোট ভাই আল আমিনকে আসামি করা হয়েছে। আল আমিনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

এদিকে বাড্ডায় বাবা-মেয়েকে হত্যার ঘটনায় নিহত জামিল শেখের স্ত্রী আরজিনার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকালে বাড্ডার হোসেন মার্কেটের ময়নারটেক এলাকার ৩০৬ নম্বর গোরস্থান রোডের তৃতীয় তলার চিলেকোঠায় খুন হন জামিল শেখ ও তার শিশু কন্যা নুসরাত। সকালে জামিল শেখের স্ত্রী ছাদে বসে কান্নাকাটি করলে বাড়িওয়ালা দুলাল পাঠান তাদের বাসায় গিয়ে লাশ দেখে পুলিশে খবর দেন।

জোড়া হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে সাবলেট ভাড়াটিয়া শাহিনকে খুলনা থেকে গ্রেফতারের কথা জানিয়ে বাড্ডা থানার ওসি ওয়াজেদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিহত জামিল শেখ ও তার নয় বছরের শিশু সন্তান নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জামিল শেখের স্ত্রী আরজিনা ও ভাড়াটিয়া শাহিন জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে তারা নিশ্চিত হওয়া গেছে। আগামীকাল শনিবার (৪ নভেম্বর) আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে শাহিনকে। ঘটনার পর আরজিনা ও শাহিনকে আসামি করে নিহতের ভাই শামীম বাদি হয়ে বাড্ডা থানায় মামলা দায়ের করেন।’ 

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাকরাইল ও বাড্ডার দু’টি ঘটনাই পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই হয়েছে, এটা নিশ্চিত। বাড্ডার ঘটনার রহস্য এরইমধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে। নিহত জামিল শেখ ও তার নয় বছরের মেয়েকে হত্যার ঘটনায় জামিল শেখের স্ত্রী আরজিনার সহযোগিতা রয়েছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পরিবারের সদস্যদের মধ্যে লোভ-লালসার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় কেউ কেউ ঘাতক হয়ে উঠছে। তবে এই বিষয়টি একেবারে নতুন নয়। অনেক আগে থেকেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে আসছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের বোধ-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলার কারণে নৃশংস হয়ে উঠছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন বাংলা টিবিউনকে বলেন, ‘মানুষের মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্কের যে বন্ধন, তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার্স তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি সম্পত্তি নিয়ে লোভের বশবর্তী হয়েও নিজের পরিবারের সদস্যকে হত্যা করতে কুণ্ঠা করছে না।’  

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ