অভিযোগের আঙুল ভারতের প্রধান বিচারপতির দিকেও

Send
রঞ্জন বসু, দিল্লি
প্রকাশিত : ১২:০০, নভেম্বর ১৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৫০, নভেম্বর ১৪, ২০১৭

 

ভারতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র

বাংলাদেশে সদ্য বিদায় নেওয়া প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে নিয়ে বিতর্কের রেশ না কাটতেই প্রতিবেশী ভারতেও প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রকে ঘিরে নজিরবিহীন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির আইন বিশেষজ্ঞরা অনেকেই মনে করছেন, চিফ জাস্টিস দীপক মিশ্র’র আচরণের ফলে ভারতের বিচারবিভাগ এক অভূতপূর্ব সংকটে পড়েছে।

বাংলাদেশে বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে যেমন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে এবং সতীর্থ পাঁচ জন বিচারপতি তার সঙ্গে বেঞ্চে বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, এর সঙ্গে ভারতের ঘটনাতেও বেশ মিল আছে। ভারতে বিচারবিভাগীয় দুর্নীতির একটি মামলার সূত্র ধরেই জাস্টিস দীপক মিশ্র’র আচরণ সন্দেহের জন্ম দিয়েছে  এবং তিনিও সুপ্রিম কোর্টের অন্যতম সিনিয়র বিচারপতি জাস্টিস চেলমেশ্বরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন।

যে মামলাকে ঘিরে এই বিতর্কের সূত্রপাত, সেটি ছিল দেশে বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজকে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া নিয়ে। ভারতের মেডিক্যাল কাউন্সিল কয়েকটি কলেজের স্বীকৃতি বাতিল করে দেওয়ার পর তারা সুপ্রিম কোর্টে যায়। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের রায় যাতে তাদের অনুকূলে যায়, সে জন্য গোপনে বিভিন্ন ব্যক্তির শরণাপন্ন হয়।

এদের মধ্যে একজন ছিলেন ওড়িশা হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি আই এম কুদ্দুসি, যিনি বিপুল অংকের টাকা ঘুষ নিয়ে ওই মেডিক্যাল কলেজগুলোর পক্ষে রায় ঘোষণার ব্যবস্থা করবেন বলে কথা দেন। পরে যখন এ বছরের গোড়ার দিকে সুপ্রিম কোর্টে সেই মামলার শুনানি হয় এবং যে বেঞ্চ সেটি শোনে তাতে জাস্টিস দীপক মিশ্রও ছিলেন। দীপক মিশ্র নিজেও ওড়িশারই লোক।

পরে সিবিআই এই মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সেপ্টেম্বরে আই এম কুদ্দুসিকে গ্রেফতার করে। ঘুষের অন্তত দুই কোটি টাকা তার হেফাজত থেকে উদ্ধারও করা হয়। কিন্তু খুব অল্পদিনের মধ্যে কুদ্দুসি জামিনও পেয়ে যান এবং কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সিবিআই সেই জামিনের বিরোধিতা করেনি।

তখন এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন দাখিল করেন ভারতের সিনিয়র আইনজীবী কামিনী জয়সোয়াল। ওই আবেদনে বলা হয়, এ ঘটনার তদন্তের জন্য একটি স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (সিট) গঠন করা দরকার। এই আবেদনের শুনানিতে যাতে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রকে না রাখা হয়, সেটিও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। এই আবেদনে মিস জয়সোয়ালকে সহযোগিতা করেন ভারতের আরেক শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ।

নাটকীয়তার সূত্রপাত ঠিক এর পরেই। গত বৃহস্পতিবার (৯ নভেম্বর) এই পিটিশনটি পাঁচ সদস্যের এক সাংবিধানিক বেঞ্চে রেফার করে দেন জাস্টিস চেলমেশ্বর। কিন্তু পরদিন (১০ নভেম্বর) আচমকা সেই বেঞ্চ বাতিল করে দেন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র। নতুন পাঁচ জন বিচারপতিকে নিয়ে তিনি আরেকটি বেঞ্চ গঠন করে আদালতের নোটিশ বোর্ডে তা ঝুলিয়ে দেন।

এভাবে প্রধান বিচারপতি আগের বেঞ্চ খারিজ করে দিয়ে নিজের পছন্দের বেঞ্চ গঠন করেছেন,তাও আবার এমন একটি মামলায় যেখানে তার ‘স্বার্থের সংঘাত’ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ভারতের বিচারবিভাগে এ ঘটনা আগে কখনও হয়নি। তার পর থেকেই জাস্টিস দীপক মিশ্র’র এই আচরণ নিয়ে তুলকালাম শুরু হয়েছে।

ভারতে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ মূলত দুটো। এক. বিচারবিভাগীয় দুর্নীতির স্পর্শকাতর মামলায় তিনি আগের বেঞ্চ বাতিল করে নিজের পছন্দের বিচারপতিদের দিয়ে বেঞ্চ গঠন করেছেন। দুই. এটা এমন একটা মামলা, যেখানে তার নামও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। কারণ, মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে কেসটি কয়েকমাস আগে তিনিও শুনেছিলেন।

সে কারণেই ক্ষুব্ধ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ– যিনি গত সপ্তাহে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এজলাসে রীতিমতো বচসায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি (প্রশান্ত ভূষণ) টুইট করেছেন, ‘এটা স্বাভাবিক ন্যায়ের পরিপন্থী, যেখানে আপনার স্বার্থ জড়িত সেই মামলায় আপনি বিচারক হতে পারেন না!’

ভারতের আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকের প্রতিক্রিয়া আরও কঠোর। সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ দুষ্যন্ত দাভে মনে করছেন, জাস্টিস দীপক মিশ্র গোটা সুপ্রিম কোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন।

দিল্লির নামী থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের শ্যালশ্রী শঙ্কর, যিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে বহু বছর ধরে গবষেণা করেছেন। তিনিও বলছেন- শীর্ষ আদালতের বিচারপতিদের মধ্যে মতপার্থক্য এত কদর্যভাবে আগে কখনও বেরিয়ে আসেনি।

‘বিধি সেন্টার ফর লিগ্যাল পলিসি’-র অলোক কুমারের কথায়, ‘প্রধান বিচারপতির নিজের আচরণ ও নিজের অতীত রেকর্ডই যেখানে প্রশ্নের মুখে, সেখানে তিনি যেভাবে নিজের ক্ষমতার অন্যায় প্রয়োগ করলেন, তা ভারতে বিচারবিভাগের ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা।’

এখন ভারতে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র’র পরিণতিও বাংলাদেশের চিফ জাস্টিস সুরেন্দ্র কুমার সিনহার মতোই হবে কিনা, তার উত্তর সময়ই দেবে। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে ভারতের শীর্ষ আদালতে যা ঘটেছে, তা  জাস্টিস মিশ্রকে যে অসম্ভব চাপের মুখে ফেলে দিয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই!

আরও পড়ুন: 


এসকে সিনহার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ