আমি মানুষের পক্ষের কবি: আদোনিস

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৫:১১, নভেম্বর ১৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৯, নভেম্বর ১৬, ২০১৭

নিজের গল্প বলছেন আদোনিসঢাকা লিট ফেস্টের প্রথম দিন দুপুর সোয়া ১২টার সেশনে এসেছিলেন আরবের আধুনিক সাহিত্যধারার অন্যতম পথিকৃৎ কবি আদোনিস। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনের এই সেশন সঞ্চালনা করেন সাহিত্যিক ও অনুবাদক কায়সার হক। ফরাসি ভাষা থেকে আদোনিসের ভাষ্যের অনুবাদক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আশরাফুল হক চৌধুরী।
সেশনের শুরুতে দর্শকদের সঙ্গে সিরিয়ার কবি আদোনিসকে পরিচয় করিয়ে দেন কায়সার হক। তবে এরপরে কবি তার নিজের গল্প বলেন নিজেই। বলেন, কীভাবে তিনি আলী আহমেদ সাঈদ থেকে আদোনিস হয়ে উঠেছিলেন। সিরিয়ায় তিনি যখন কবিতা লেখা শুরু করেন, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সে সব ছাপানোর জন্য পাঠাতেন তিনি। কিন্তু ছাপা হয়নি একটিও। গ্রিক দেবতা আদোনিস যেমন আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তিনিও যেন তেমনি পত্রিকার সম্পাদকদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছিলেন। তাই আদোনিসের নামই নিজের পেননেম বা ছদ্মনাম হিসেবে গ্রহণ করেন। আর তারপরই তার কবিতাগুলো পত্রিকায় ছাপা হতে শুরু করে। অবশ্য পত্রিকার লোকজন তাকে দেখার পর, তার জীর্ণশীর্ণ চেহারা-পোশাক দেখে শুরুতে তাকে আদোনিস বলে মানতেই রাজি হননি।
আদোনিস জন্মেছিলেন সিরিয়ার এক গ্রামদেশে। ছোটবেলাতে পড়েছিলেন মক্তবে (কুত্তাব)। সেখানে তাকে কুরআন পড়তে হয়েছিল। তবে বাবার কল্যাণে পরিচয় ঘটে আরবের কবিতার সাথে। দ্রুতই কাব্যের প্রেমে পড়ে যান তিনি। জন্মদাত্রী মায়ের পাশাপাশি কাব্যজগত হয়ে ওঠে তার দ্বিতীয় মাতৃমূর্তি।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি সিরিয়ান সোশ্যাল ন্যাশনালিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হন। পরে সেজন্য তাকে জেলেও যেতে হয়। কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, স্বাধীন কাব্যচর্চা চালিয়ে যেতে হলে তাকে দেশ ছাড়তে হবে। পাড়ি জমান লেবাননে। সেখান থেকেই প্রকাশিত হয় তার প্রথম বই। তবে তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বই দ্য সংস অব মিহিয়ার অব দামাস্কাস। আরব দেশগুলোতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই তিনি মিহিয়ারকে নির্মাণ করেন তার রাজনৈতিক-সামাজিক মতামত প্রকাশের মুখপাত্র হিসেবে।
এরপর কায়সার হক তাকে আরব দেশগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। আদোসিন বলেন, ‘অন্যতম প্রধান সমস্যা, সেখানে ধর্ম আর রাজনীতিকে অভিন্ন করে রাখা হয়েছে। ফলে একটির দুর্বৃত্তায়নে দু’টিই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। অথচ দেশ ও ধর্ম আলাদা সত্তা হিসেবে টিকে থাকা উচিত। আর রাষ্ট্রের যে সমাজকাঠামো, তার ভিত্তি হওয়া উচিত মানবাধিকার, স্বাধীনতার চেতনা এবং নারীর স্বাধীনতা।’
আদোনিস আরও বলেন, ‘পাশাপাশি কুরআনেরও নতুন পঠন-পাঠন ও ব্যাখ্যা দরকার। সেটা হতে হবে আরও অনেক উদার ও সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। কেবল কুরআনেরই নয়, নতুন পঠন-পাঠন দরকার সকল প্রাচীন কাব্যসাহিত্যেরই। এ ব্যাপারে আমি ও আমার সমসাময়িক আরব লেখকরা বিশেষভাবে কাজ করেছি। বিশেষ ভূমিকা রেখেছে আমাদের ঘরানার পত্রিকাগুলোও।’ আদোনিস জানান, বিশেষ করে সেজন্য তারা জোর দিয়েছেন ভালো পাঠক গড়ে তোলার জন্য। কারণ মাঝারি মানের পাঠক ভালো সাহিত্যকেও মাঝারি মানে নামিয়ে আনে।
সাহিত্যে প্রাচীন আরব সাহিত্যের সঙ্গে আদোনিস মিথস্ক্রিয়া ঘটিয়েছেন আধুনিকতার। আর এ কারণেই তিনি আধুনিক আরব কবিতার পথিকৃৎদের একজন। পাশাপাশি সমসাময়িকদের সঙ্গে নিয়ে মিস্টিক মুভমেন্টের সূচনা করেন। তাতে গুরুত্ব পায় দু’টি বিষয়- ঈশ্বর ও আরবদের সাংস্কৃতিক সত্তা। এই আরবদের সত্তার ধারণার মধ্যে ছিল এক্সিসটেনশিয়ালিজমের ছায়াও। আর এই ধারার সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যে নতুন করে আরবদের অস্তিত্বকে জানান দেয়।
সুফিজম ও সুরিয়ালিজমের মধ্যে মিল আছে কিনা, কায়সার হকের এমন প্রশ্নে এই বিতর্ক সম্পর্কে ওয়াকিবহাল আছেন জানিয়ে আদোনিস বলেন, তারা শুরু থেকেই অন্যান্য সাহিত্য ও সাহিত্যধারা সম্পর্কে উদার মন নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। সেই সঙ্গে আরবি সাহিত্যও নতুন করে পাঠ করেছিলেন। তারা আবিষ্কার করেন, পাশ্চাত্য সুরিয়ালিজমের চর্চা শুরু করার হাজার বছর আগেই আরবে কাছাকাছি ধরনের সুফিজমের চর্চার চল ছিল। এমনকি সুরিয়ালিজমে নারীবাদের যে ধারণা আছে, আরবের সুফিজমে ছিল সেটাও।
নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে আদোনিসের সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তি, তিনি বামপন্থী। কারণ তিনি সবসময় মানুষের পক্ষে। এবং তিনি বিশ্বাস করেন মানুষ সবসময়ই এক ধরনের পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তারা কখনই কোথাও থমকে থাকবে না। আদোনিস কথা বলেন আরবের রাজনীতি নিয়েও। সেখানে আরব স্প্রিং নিয়ে তিনি একেবারে অখুশি নন। তবে সেটাও আমেরিকারই তৈরি। সেটা আরবের দারিদ্র্য দূর করার বদলে দরিদ্রদেরই ধ্বংস করে দিচ্ছে। বৈশ্বিক রাজনীতি নিয়েও তিনি খুব একটা সন্তুষ্ট নন। মানুষ এখন আর ফুলের সুবাসের প্রতি নয়, আকৃষ্ট হয় ফুলের প্রতিই। আর আমেরিকা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফুল, টাকার বিচারেও, ক্ষমতার বিচারেও।
তবে মানুষের পড়ার অভ্যাস নিয়ে তিনি মোটেই হতাশ নন, বরং বেশ আশাবাদী। কারণ মানুষ আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি বিষয় নিয়ে পড়ে। পাশাপাশি তারা কেবল বইতেই সীমাবদ্ধ নয়, পড়ছে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে। কবিতার এক্সপ্রেশন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি মুহূর্তের মধ্যেই এক অনুপম শব্দালঙ্কার সৃষ্টি করেন। বলেন দরজা খোলার বিবরণ এভাবেও দেওয়া যেতে পারে, একজন মেয়ে দুই বাহু বাড়িয়ে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
সেশন শেষ হয় উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব দিয়ে। সে পর্বে তিনি নিজের একটি কবিতাও আবৃত্তি করে উপস্থিত দর্শকদের বিমোহিত করেন।
আরও পড়ুন-
পর্দা উঠলো লিট ফেস্টের
আদোনিসের হাতে ‘মুজিব’ গ্রন্থ

/এফএএন/টিআর/

লাইভ

টপ