প্রতিটি সাহিত্যকর্মের জন্য লেখককে মূল্য দিতে হয়: বেন ওকরি

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২০:৩৩, নভেম্বর ১৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৩, নভেম্বর ১৬, ২০১৭

‘ম্যাজিকাল টেলস’ নিয়ে ঢাকার মঞ্চে বেন ওকরিমহাবিশ্বই লেখককে দিয়ে লিখিয়ে নেয় বলে মনে করেন আফ্রিকান সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক বেন ওকরি। তিনি মনে করেন, প্রতিটি সৃষ্টিকর্মের জন্যই মানুষকে মূল্য চুকাতে হয়। প্রতিটি গল্প, কবিতা বা উপন্যাস লেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লেখককে কোনও না কোনও মূল্য দিতেই হয়।
বৃহস্পতিবার (১৬ নভেম্বর) বাংলা একাডেমিতে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৭’-এর প্রথম দিন বিকালে শ্রীলংকার কথাসাহিত্যিক অশোর ফেরির সঞ্চালনায় এক অনুষ্ঠানে বেন ওকরি এসব কথা বলেন। তার লেখা বিশ্বব্যাপী সাড়াজাগানো বই ‘ম্যাজিকাল টেলস’ নিয়ে কথা বলতে এসেছিলেন তিনি।
অশোক ফেরি অবশ্য সেশন শুরু করেন বেন ওকরিকে ছাড়াই। কারণ যেকোনও আয়োজনের আগে খানিকটা মেডিটেশন করে নেওয়ার অভ্যাস বেন ওকরির। সে অবসরে ফেরি দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেন বেনের ‘ম্যাজিকাল টেলসে’র সঙ্গে। ঘরানার দিক থেকে সবার চেয়ে আলাদা এই বইটির প্রতিটি গল্পই কোনও না কোনও চিত্রকর্মকে ভিত্তি করে লেখা। গল্পগুলোর সঙ্গে আছে সেই চিত্রকর্মগুলোও। আবার গল্পগুলোর সবগুলোকে ঠিক গল্পও বলা যায় না। ফেরির মতে, এর অনেকগুলোই কাব্যধর্মী। অনেকগুলোকে কবিতাই বলা যায়।
এর মধ্যেই মঞ্চে চলে আসেন বেন ওকরি। শুরুতেই প্রশংসা করেন লিট ফেস্ট আয়োজনের। সেই সঙ্গে প্রশংসা করেন ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষা’ বাংলার। এরপরই চলে যান ‘ম্যাজিকাল টেলস’-এর আলাপে। তুলে ধরেন এই বইয়ের গল্পগুলোর জন্মের কাহিনী। গল্পগুলো যেসব চিত্রকর্মের ওপর ভিত্তি করে লেখা, সেগুলো মূলত তার এক বন্ধুর ছবি। সেই ছবিগুলো দেখে তার মনে হয়েছিল, এগুলোর যেকোনোটির সঙ্গে তিনি সারাজীবন বাস করতে পারবেন। আর সেখান থেকেই শুরু এই গল্পগুলোর।
বেন জানান, প্রথমে বন্ধু তাকে একটি চিত্রকর্ম দিয়েছিল। তিনি সেটিকে নিজের কাছে রাখেন মাস ছয়েক। প্রতিদিন তিনি ছবিটি দেখতেন, দেখতেই থাকতেন। এভাবে দেখতে দেখতে হঠাৎই একদিন প্রথম গল্পটি মাথায় এসে গেল। চিত্রকর্মটি দেখে তার মধ্যে যে অনুভূতি হয়েছিল, তারই প্রকাশ ঘটল একটা গল্পের মাধ্যমে। চটজলদি সেটি লিখে ফেললেন। তারপর বাস করতে শুরু করলেন আরেকটি ছবির সঙ্গে। সেটির গল্প যেদিন লেখা হয়ে গেল, তারপর আরেকটি ছবি। এভাবে চলল বছর পাঁচেক। আর চিত্রকর্মের সঙ্গে পাঁচ বছর বসবাসের ফসল ‘ম্যাজিকাল টেলস’ বইটি।
চিত্রকর্মগুলোর সাথে বেনের যে সম্পর্ক, তাই যেন প্রকাশিত হয়েছে গল্পগুলোতে। বইটিকে বেন বলছেন অসচেতনভাবে লেখা সচেতন গ্রন্থ। কারণ লেখাগুলোর বিষয়বস্তু তার অবচেতন মনে সৃষ্টি হলেও, দীর্ঘদিন ধরে চিত্রকর্মগুলো দেখার ফলে সেই বিষয়বস্তুর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া আসলে একটি সচেতন প্রক্রিয়া। ঠিক এই কারণেই বেন দীর্ঘ পর্যবেক্ষণকে ভীষণ গুরুত্ব দেন। তার মতে, লেখকদের জন্য এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তাতে যেকোনও কিছুর অনেক গভীরে পর্যন্ত যাওয়া যায়, অনেক বেশি অনুভব করা যায়।
কিন্তু ঠিক কেন তিনি চিত্রকর্ম নিয়ে গল্প লিখতে গেলেন, প্রশ্ন ছিল অশোকের। উত্তরও সোজা। চিত্রকর্ম ও সাহিত্যকর্ম- দুইয়েরই উৎস এক। কেবল প্রকাশের ধরণ ভিন্ন। তবে বেনের ধারণা, লেখালেখি আসলে লেখকের কাজ নয়। মহাবিশ্বই লেখককে দিয়ে লিখিয়ে নেয়। ব্যাপারটা অনেকটা আরব্য রজনীর জাদুর প্রদীপে ঘষা দেওয়ার মতো। রাতে ঘষা দিয়ে ঘুমানোর পর, সকালে উঠে একটা গল্প বা কবিতা পাওয়ার মতো। তবে এই প্রতিটি সৃষ্টিকর্মের জন্য একটা মূল্য মানুষকে চুকাতে হয়। প্রতিটি গল্প, কবিতা বা উপন্যাস লেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যিককে কোনও না কোনও মূল্য দিতেই হয় বলেই বিশ্বাস করেন বেন।
বেন আরও বলেন, ‘একটি সাহিত্যকর্ম আসলে লেখক একবারই সৃষ্টি করতে পারে। সৃষ্টিপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে গেলে ওই সৃষ্টিকর্মের জন্য ওই সাহিত্যিকের মৃত্যু ঘটে যায়। কিন্তু যদি কোনও লেখক মনে করেন, তিনি যা লিখছেন তা আর কারও পক্ষে লেখা সম্ভব নয়, তিনি তখনই লেখক হিসেবে খারিজ হয়ে যান। লেখকের আসল কাজ লেখা নয়, শোনা, অনুভব করা। বর্তমানকে অনুভব করা। এই বর্তমানই সত্য। বর্তমানেই লুকিয়ে থাকে অতীত। বর্তমানের সত্যের পথ ধরেই আসে ভবিষ্যত। বর্তমানের সচেতন ও অসচেতন বুননেরই ফসল ভবিষ্যত। আর এই বর্তমানকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করাই লেখকের প্রকৃত সংগ্রাম।’
বেন মনে করেন, এই বর্তমানকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করার জন্যই প্রয়োজন দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ। এর মাধ্যমে বর্তমানের যে অংশগুলো মানুষের সাধারণ চোখে ধরা দেয় না, সেগুলোকে দৃশ্যমান করে তোলাই লেখকের আসল কাজ। আর বর্তমানের এই অংশগুলো ধারণ করার অর্থ পাঠকদের চোখে তা দৃশ্যমান করে তোলা। লেখক কী দেখছেন, কী অনুভব করছেন- সেটি নয়; সাহিত্যে আসলে গুরুত্বপূর্ণ তিনি পাঠকদের কী দেখাতে পারছেন, কী অনুভব করাতে পারছেন সেটা।
অশোক ফেরি বেনকে প্রশ্ন করেন শহর সম্পর্কেও। বেনের কাছে শহর কোনও ডিসটোপিয়ান বা ইউটোপিয়ান ধারণা নয়। তবে তিনি মনে করেন, শহর সভ্যতার সবচেয়ে দুর্দান্ত ভাবনা। এখানে তৈরি হয় প্রাণের মেলা। জড়ো হয় বিভিন্ন গোত্রের বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন সংস্কৃতির বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ। তার ফলে একেকটা শহর পরিণত হয় একেকটা চিরনতুন সৃষ্টিকর্মে।
বেন কথা বলেন তার শৈশবের যুদ্ধের স্মৃতি নিয়েও, যে স্মৃতি তার সাহিত্যকর্মগুলোকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি যখন শৈশবে ইংল্যান্ড থেকে তার স্বদেশ নাইজেরিয়ায় ফিরে আসেন, তার কিছুদিনের মধ্যেই নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। তার বাবা-মা দু’জন যুদ্ধরত দুই গোত্রের অধিবাসী। সে কারণেই তিনি বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে খানিকটা আন্দাজ করতে পারেন। বিশেষ করে বুঝতে পারেন মৃত্যুর মুখ থেকে পালিয়ে আসা প্রতিবেশীকে আশ্রয় দেওয়ার সংগ্রাম। কারণ তার গৃহযুদ্ধের সময় তার মাকেও একইভাবে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
সেশনের শেষ ভাগে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব ছিল। সে পর্বেও ভীষণ সপ্রতিভ ছিলেন বেন। পুরো পর্বেই তার শক্তিশালী কণ্ঠের জাদুকরী আলাপে বুঁদ হয়ে ছিল দর্শকরা। সেই অনুভূতিও যেন অনেকটা তার ‘ম্যাজিকাল টেলস’ গ্রন্থের মতোই, মায়ার জালে বেঁধে রেখেছিলেন সবাইকে।
আরও পড়ুন-
পর্দা উঠলো লিট ফেস্টের

আদোনিসের হাতে ‘মুজিব’ গ্রন্থ
আমি মানুষের পক্ষের কবি: আদোনিস

বাংলার নারীরা সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে

জনপ্রিয় লেখকই হতে চেয়েছিলাম: ইমদাদুল হক মিলন

/টিআর/

লাইভ

টপ