এক মলাটে ২১ সুপারগার্লের গল্প

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৯:৫২, নভেম্বর ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৪, নভেম্বর ১৮, ২০১৭

‘হারস্টোরিজ অ্যাডভেঞ্চারস অব সুপারগার্লস’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচনবেগম রোকেয়া, কবি সুফিয়া কামাল, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মতো নারীরা আমাদের দেশের একেক জন সুপারগার্ল। তাদের পথ ধরে এখনকার নারীরাও অসামান্য সব অর্জন করছেন। তাদের গল্প তুলে ধরার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জোগাতেই লিট ফেস্টে অবমুক্ত করা হয়েছে ‘হারস্টোরিজ অ্যাডভেঞ্চারস অব সুপারগার্লস’ বইটি। অমিয়া নামের এক কিশোরীর জবানিতে বইটিতে উঠে এসেছে বাংলার ২১ সুপারগার্লের গল্প।
‘ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৭’-এর দ্বিতীয় দিন বিকাল সাড়ে ৪টায় আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘হারস্টোরিজ অ্যাডভেঞ্চারস অব সুপারগার্লস’ বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বইটি প্রকাশ করেছে নোকতা পাবলিকেশন্স। এর আগে বইটির ওপর আলোচনা করেন বইটির অন্যতম রিসার্চ কিউরেটর ড. শিউতি সাবের, স্কলাস্টিকার ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাদিহা মোরশেদ এবং চার সুপারগার্ল নাইমা হক, তামান্না-ই-লুৎফী, নিশাত মজুমদার ও মাবিয়া আক্তার।
সেশন শুরু করেন হারস্টোরিজ ফাউন্ডেশনের জেরিন মাহবুব। তিনি বলেন, কিশোরী অমিয়ার জবানিতে বইটিতে বাংলার বইটিতে যে ২১ সুপারগার্লের গল্প উঠে এসেছে, সেগুলো নতুন প্রজন্মের মেয়েদের জন্য অনুপ্রেরণার অনন্য উৎস হিসেবে কাজ করবে। ঢাকা লিট ফেস্টে বইটির ইংরেজি ভার্সন অবমুক্ত হওয়ার পর আগামী অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বইটির বাংলা ভার্সন প্রকাশিত হবে বলেও জানান তিনি।
সেশনে জানানো হয়, বইটি লিখতে কাজ করেছেন মোট ৩১ জন। এর কিউরেটর ছিলেন ক্যাথরিনা ডন। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞান বিভাগের ফ্যাকাল্টি ড. শিউতি সাবের ছাড়াও বইটির রিসার্চ কিউরেটর হিসেবে কাজ করেছেন ড. অদিতি সাবের। রিভিউ করেছেন খুশী কবির। ইলাস্ট্রেশন করেছেন রোকেয়া সুলতানা। অবদান রেখেছেন পরিচালক রুবাইয়াত হোসেনও। পরে বইটির ওপর নির্মিত একটি অনুপ্রেরণাদায়ী ভিডিও দেখানো হয়।
বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে খনাকে, যার অসামান্য বচনগুলোর জন্য তার জিভ কেটে দেওয়া হয়েছিল। ২১ সুপারগার্লের মধ্যে প্রথম জনই তিনি। এছাড়াও বেগম রোকেয়া, কবি সুফিয়া কামাল, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মতো কিংবদন্তী নারীদের পাশাপাশি বইটিতে স্থান পেয়েছেন এ সময়ের সুপারগার্লরাও। তাদের মধ্যে চারজন উপস্থিত হয়েছিলেন মোড়ক উন্মোচনের আগের আলোচনা পর্বে। তারা হলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী কমব্যাট পাইলট- নাইমা হক ও তামান্না-ই-লুৎফী, দেশের প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী নারী নিশাত মজুমদার এবং সাউথ এশিয়ান গেমসে ভারোত্তোরনে স্বর্ণ বিজয়ী মাবিয়া আক্তার।
নতুন প্রজন্মের নারীদের অনুপ্রেরণা এই চার সুপারগার্ল কথা বলেন তাদের শৈশব-কৈশোরের অনুপ্রেরণাদায়ী চরিত্রদের সম্পর্কে। নাইমা হকের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন তার আশপাশের সব পরিশ্রমী মানুষ। তাছাড়া সেনাবাহিনীতে তারা কাজ করেন দেশ রক্ষা করতে, যেন দেশের মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারে। সেই অনুভূতিই তার নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
তামান্না-ই-লুৎফীর বাবাও বিমানবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তাই ছোটবেলা থেকেই তিনি পাইলটদের দেখে দেখে বড় হয়েছেন। নিজের অজান্তেই তার মধ্যে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দানা বেঁধেছিল। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী নারীদের কমব্যাট পাইলট হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তিনি যোগ দেন। বাকিটা ইতিহাস। তিনি তার এই সাফল্য উৎসর্গ করেন বাংলাদেশের সব নারীকে।
মাবিয়ার এত বড় অর্জনের পেছনে আসল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন তার বাবা-মা ও তার মামা। পড়ালেখায় মনোযোগ নেই দেখে তার বাবা পড়ালেখায় চাপা না দিয়ে বরং তাকে তার পছন্দের বিষয়ের দিকে মনোযোগী হতেই উৎসাহ দেন। আর তার সে পছন্দের বিষয়টা খুঁজে বের করার কৃতিত্ব তার মামার। তিনিই তাকে ভারোত্তোলনে নিয়ে আসেন। আর তারই ফল সাউথ এশিয়ান গেমসে স্বর্ণ জিতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর অর্জন। সেদিন জাতীয় সঙ্গীতের সাথে কেবল নিজেই কাঁদেননি তিনি, কাঁদিয়েছিলেন পুরো বাংলাদেশকেই।
নিশাত মজুমদার তার অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বলেন বেগম রোকেয়ার নাম। ছোটবেলায় তিনি যখন পাঠ্যবইয়ে বেগম রোকেয়ার কথা পড়েছিলেন, তখনই তার মনে হয়েছিল রোকেয়ার মতো হতে হবে। বাবা-মায়েদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ছেলেমেয়েদেরকে তাদের ভালোবাসার কাজ করতে দিতে। কারণ মানুষ তার ভালোবাসার কাজ করলেই কেবল সাফল্যের শীর্ষে উঠতে পারে। আর তখনই আসলে মানুষ সত্যিকার রোল মডেল হয়ে উঠতে পারে।
বাবা-মায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বলেন মাদিহা মোরশেদও। বিশেষ করে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটা করতে হবে বাবা-মাকেই। ড. শিউতি সাবের বলেন, ‘বইটা শিশুদের জন্য যতটুকু অনুপ্রেরণাদায়ী, তেমনই জরুরি বাবা-মায়ের জন্যও। তাদের অনুধাবন করতে হবে, ছেলেদের মতো মেয়েরাও পারে। ছেলে-মেয়ে আসলে বিষয় না, সবাইকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এমনকি ট্রান্সজেন্ডারদেরকেও বিবেচনা করতে হবে মানুষ হিসেবে।’
আলোচনা শেষে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এসময় তিনি বলেন, ‘মা হওয়ার সঙ্গে নারীর এগিয়ে চলার আসলে কোনও বিরোধ নেই। তার জন্য প্রয়োজন নারীর জীবনসঙ্গীর সহযোগিতা। যেমন- আমার বাবা-মা দু’জনেই শিক্ষক ছিলেন এবং সারাজীবন শিক্ষকতা করেই মা আমাকে ও আমার সব ভাইবোনকে মানুষ করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘মেয়েরা ঘরের বাইরে বের হলে বাবা-মায়েরা যে দুশ্চিন্তা করে, তার জন্য আসলে মেয়েরা দায়ী নয়।’ খানিকটা রসিকতার ছলেই তিনি এর নির্মম কারণটা বলে দেন, ‘ছেলেরা আরেকটু ভালো হলেই আর আমাদের দেশে এই সমস্যাটা থাকত না।’

/টিআর/

লাইভ

টপ