নারীদের প্রতি অসহিষ্ণুতা রোধে এগিয়ে আসতে হবে পুরুষদেরই

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১২:২৩, নভেম্বর ১৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০৮, নভেম্বর ১৮, ২০১৭

‘উইমেন, আর্ট অ্যান্ড পলিটিকস’ শীর্ষক সেশনে বক্তারাবাংলাদেশের নারীরা এখন আরও বেশি কর্মমুখী হয়ে উঠছেন। তবে ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে নারীদের প্রতি এখনও অসহিষ্ণু আচরণ করা হয়ে থাকে। তাই নারীদের গল্প এখন নারীদেরই বলতে হবে। আর নারীদের প্রতি অসহিষ্ণুতার কারণ যেমন পুরুষরা, তাই এই অসহিষ্ণুতা রোধে পুরুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে।
‘ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৭’-এর তৃতীয় ও শেষ দিন শনিবার (১৮ নভেম্বর) সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘উইমেন, আর্ট অ্যান্ড পলিটিকস’ শীর্ষক সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেশনটি সঞ্চালনা করেন বি রাওলাট। অংশ নেন লেখক ও অভিনেতা এস্থার ফ্রয়েড, স্পোকেন ওয়ার্ড আর্টিস্ট বিগো চিওল, লেখক ও অভিনেতা নন্দনা সেন এবং কবি-লেখক ও লিট ফেস্টের অন্যতম উদ্যোক্তা সাদাফ সায্।
ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায্সেশনের শুরুতেই কথা বলেন সাদাফ সায্। বাংলাদেশের সমাজে-রাজনীতিতে নারীদের অবস্থান, বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশে নারীদের অবস্থান নিয়ে কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘যখন বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের অংশ, তখন এখানকার মানুষ অনুভব করত, দেশটিতে দুই শ্রেণির বা গোত্রের মানুষ বাস করে। সেই অনুভূতি বাংলাদেশের মানুষের কখনোই হবে না। তাই বাংলাদেশে অসহিষ্ণুতা-অসহনশীলতা যতই বাড়ুক, সেগুলো তাই চূড়ন্ত রূপ গ্রহণ করতে পারবে না। পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে দেশটি নতুন শক্তি নিয়ে যাত্রা শুরু করে। দেশটির সংস্কৃতিও নারীদের ব্যাপারে আরও অনেক বেশি উদার হতে থাকে। যত দিন যাচ্ছে, বাংলাদেশের নারীরাও তত কর্মমুখী হয়ে উঠছে, নারীরা তত সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।’
সাদাফ সায্ আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়ার প্রক্রিয়ায় এ দেশের নারীদের সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে চার লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্র তাদের সম্মানজনক স্বীকৃতি দিলেও সামাজিক অবস্থানের কারণে তাদের সমস্যার মুখে পড়তে হয়। আমাদের মধ্যে এই প্রশ্নের উদয় হওয়া প্রয়োজন, তাদের সামাজিক মূল্যায়ন আমরা কিভাবে করেছি।’
নন্দনা দেব সেননন্দনা সেন কথা বলেন নারীর প্রতি অসহিষ্ণুতা নিয়ে। তার মতে, বাকি বিশ্বের তুলনায় ভারতে এই সমস্যা আরও প্রকট। উদাহরণ হিসেবে তিনি সম্প্রতি ভারতে এক নারী সাংবাদিককে খুনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘সে খুনের পর বলার মতো তদন্ত তো হয়ইনি, বরং অনেকে প্রকাশ্যে উল্লাস প্রকাশ করেন।’ তার অভিনীত ‘রং রসিয়া’ চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মামলায় মূলত তাকেই টার্গেট করা হয়েছিল।
এস্থার ফ্রয়েডকে রাওলাট প্রশ্ন করেন, এই অসহিষ্ণু মানুষদের সঙ্গে সহিষ্ণু বা উদারনৈতিক মানুষদের আলোচনা করা উচিত কিনা। এস্থার ফ্রয়েডের প্রবৃত্তি তাকে এ কাজে নিরুৎসাহিত করলেও যুক্তিবোধকে বিবেচনায় নিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের সঙ্গে কথা বলা অত্যন্ত জরুরি। কারণ সেটা করা হয় না বলেই অসহিষ্ণু মানুষদের কেউ বিরুদ্ধাচারণ করে না। এতে দিনদিন তাদের কণ্ঠস্বর আরও উঁচু হচ্ছে। তারা এখন আগের চেয়ে অনেক জোরে তাদের সংকীর্ণ চিন্তাভাবনা প্রচার করছে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া কাভারেজও পাচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়া মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে এবং তার শিকার হচ্ছে নারীরা। কেবল জাতিগতভাবেই নয়, তাদের কারণে অনেক নারীকে ব্যক্তিগতভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে। তাই বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের উচিত তাদের এই সব বিষবাষ্প কানে না ঢুকতে দেওয়া।’
বিগো চিওল অবশ্য বলেন, ‘এখানে সহিষ্ণু ও বিশেষ করে নারী সাহিত্যিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। নিজেদের সময়কে ধারণ করার দায়িত্ব থেকেই তাদের এই অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে উচ্চারণ করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ভূমিকা আছে পুরুষদেরও।’ তিনি প্রশ্ন রাখেন, তারা এই সেশনে যেসব বিষয় নিয়ে আলাপ করছেন, সেগুলো নিয়ে কি আদৌ পুরুষরা মাথা ঘামায়? তিনি বলেন, ‘এই সমস্যাগুলো তো মূলত পুরুষদের জন্যই তৈরি হচ্ছে। এর সমাধানে কি পুরুষদের এগিয়ে আসা উচিত নয়?’
বিগোর সপক্ষে একটি ঘটনার উল্লেখ করেন এস্থার। তিনি বলেন, তার শহরে দু’জন পুরুষ একটি আন্দোলনের সূচনা করেন। প্রথমে প্রত্যেক পাড়ায় ১০ জনের দল গঠন করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাদের এই আন্দোলনের ফল দাঁড়ায় এক বিশাল র্যা লি, যেখানে সবাই ‘আই কেয়ার অ্যাবাউট’ লেখা টি-শার্ট পরেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে নন্দনাও দিল্লির জ্যোতি ধর্ষণের ঘটনার প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা আন্দোলনে পুরুষদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করেন।
রাওলাট তুলে ধরেন আরেকটি বাস্তবতা। লন্ডনের রাস্তায় প্রচুর পরিমাণ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের ভাস্কর্য আছে। কিন্তু তার প্রায় সবগুলোই পুরুষদের। ফলে লন্ডনে বেড়ে ওঠা প্রত্যেক শিশুরই এই ধারণা গড়ে ওঠার কথা যে তাদের ইতিহাসের সবকিছুই পুরুষের গড়া। এই প্রেক্ষিতে বিগো বলেন, ‘নারীদের গল্প আসলে নারীদেরই বলতে হবে। এবং সেটা শুরু করতে হবে গল্প বলার অভ্যাসের মধ্যে দিয়ে। এই গল্প বলা হয় না বলেই আফ্রিকায় অধিকাংশ কাজ নারীরা করলেও তারা দিনশেষে কোনও কৃতিত্বই পান না।’
সেশনের শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে নারী অধিকার, সহিষ্ণুতার পাশাপাশি রাজনীতিতে নারীদের অবস্থান, অংশগ্রহণ এবং বিশেষ করে বিগত মার্কিন নির্বাচন ও ট্রাম্পের কাছে হিলারির হেরে যাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়।

/টিআর/

লাইভ

টপ