মারুফ জামানের বাসায় ওরা কারা? (ভিডিও)

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ০১:৩৩, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৮, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৭

মারুফ জামানসাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের বাসায় যে তিন ব্যক্তি ঢুকে কম্পিউটার-ল্যাপটপ নিয়ে গেছেন, তারা মাথায় হুডি পরে এবং সিসি ক্যামেরা দেখে মাথা নিচু করে বাসায় ঢোকেন। বাসার প্রধান ফটকের নিরাপত্তাকর্মীর কাছে একজন নিজেকে  ‘আসিফ’ নামে পরিচয় দেন। বাসায় ঢুকে গৃহকর্মী লাকি আক্তারকে তারা বলেন, ‘স্যারের রুমে নিয়ে চলো।’ ওই বাসায় তারা ৮ থেকে ১০ মিনিট অবস্থান করার পর কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন নিয়ে বের হয়ে যান। এমনকি অজ্ঞাত তিন ব্যক্তি মারুফ জামানের শোবার ঘরে তল্লাশিও চালান।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, যে তিন ব্যক্তি ওই বাসায় গিয়েছিলেন, তারা কালো পোশাক এবং জিন্স পরিহিত ছিলেন।পায়ে ছিল জুতো। দেখে তাদের স্মার্ট ও সুদর্শন মনে হয়েছে। এমনকি অজ্ঞাত এই ব্যক্তিদের সুঠামদেহের বলেও আখ্যায়িত করছেন পরিবারের সদস্যরা।

সোমবার (৪ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ধানমন্ডির ৯/এ সড়কের ৮৯ নম্বর বাসা থেকে বেরিয়ে বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম মারুফ জামান। তিনি ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ভিয়েতনামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তারও আগে তিনি কাতারের রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সেলর হিসেবে কাজ করেছেন। বেলজিয়াম থেকে দেশে ফেরা ছোট মেয়ে সামিহা জামানকে আনতে নিজেই গাড়ি চালিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন মারুফ জামান। কিন্তু বিমানবন্দরে না যাওয়া এবং রাতে বাসায় ফিরে না আসার কারণে চিন্তিত পরিবারের সদস্যরা পরদিন মঙ্গলবার (৫ ডিসেম্বর) ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

জিডির পর খোঁজ-খবর শুরু করা পুলিশ কর্মকর্তারা মারুফ জামানের বাসা থেকে সিসিটিভির কিছু ফুটেজ সংগ্রহ করেন। ওই ফুটেজে তিন ব্যক্তিকে বাসায় প্রবেশ এবং বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেলেও তাদের মুখমণ্ডল দেখা যায়নি। একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘অজ্ঞাত ওই তিন ব্যক্তি সচেতনভাবেই সিসিটিভি ক্যামেরা দেখে মুখ লুকিয়েছেন, যাতে পরবর্তীতে তাদের শনাক্ত করা না যায়।’

কিন্তু মেয়েকে আনতে গিয়ে মারুফ জামান নিজেই বাসায় ফোন করে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের কাছে নিজের ল্যাপটপ-কম্পিউটার দিতে বলা এবং বাসায় প্রবেশের সময় তিন ব্যক্তির সিসিটিভি এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল, আসলে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে মাঝে-মধ্যেই এরকম নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। যাদের অনেকেরই নিখোঁজ হওয়ার ধরন প্রায় একইরকম। নিখোঁজ হওয়ার পর ফিরে আসা ব্যক্তিরাও পরবর্তীতে এ বিষয়ে কোনও কথা বলছেন না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনাকে ‘ফোর্স-ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও এসব ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারছেন না। গত এক মাস ধরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথের শিক্ষক ও গবেষক মোবাশ্বার হাসান নিখোঁজ রয়েছেন। এখনও তার কোনও হদিস পায়নি পুলিশ।

মারুফ জামানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহের পর তা বিশ্লেষণ করে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা করছে পুলিশ। থানা পুলিশের পাশাপাশি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিন ব্যক্তির দু’জনের গায়ে হুডিসহ গেঞ্জি ছিল। তবে তিন জনই মাথায় ক্যাপ পরিহিত ছিলেন। একজনের গায়ে কালো পোশাক থাকলেও বাকি দু’জনের গায়ে ধূসর রঙের পোশাক ছিল। তারা বেরিয়ে যাওয়ার সময় সিঁড়ির সামনে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরা অতিক্রমের সময় মাথা নিচু করে ছিলেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার মারুফ হাসান সরদার বলছেন, ‘আমরা বিষয়টিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। আমরা মারুফ জামানকে উদ্ধারের চেষ্টা করছি।  পুলিশ কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন।’ 

নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হওয়া সাবেক এই রাষ্ট্রদূতের বাসায় আট বছর ধরে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছেন লাকী আক্তার। অজ্ঞাত তিন ব্যক্তি যখন মারুফ জামানের বাসায় যান, তখন তিনিই তাদের দরজা খুলে দেন এবং মারুফ জামানের শোবার ঘরে নিয়ে যান। এমনকি বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর মারুফ জামান তাকেই ফোন করে জানিয়েছিলেন, বাসায় এসে কেউ একজন ল্যাপটপ-কম্পিউটার নিয়ে যাবে। লাকী আক্তার বলেন, ‘‘ভাইয়া (মারুফ জামান) নিজে ড্রাইভ করে গিয়েছেন। তারপর সাড়ে সাতটায় একটা ফোন আসে। ল্যান্ড ফোনে ফোন করেছিলেন। আমাকে বললেন, ‘একজন যাবে তুমি ল্যাপটপটা আর আমার কম্পিউটারটা দিয়ে দিও। আর ড্রয়ারে যে কী আছে তা তুমি খুঁজে পাবা না।’ তারপর থেকে আমরা তার ফোন বন্ধ পেয়েছি। আর যোগাযোগ করতে পারি নাই।’’

পরিবারের সদস্যরা ধারণা করছেন, মারুফ জামান যখন বাসায় ফোন করেছিলেন তখন সম্ভবত তিনি অজ্ঞাত কোনও একটি চক্রের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। যারা তাকে বাসায় ফোন করে কম্পিউটার-ল্যাপটপ দিয়ে দিতে বলেছিল। মারুফ জামান চাপের মুখে এবং বাধ্য হয়ে গৃহকর্মীকে ফোন দিয়ে এসব দিতে বলেন। মারুফ জামানের নিখোঁজ হওয়ার পর ঘটনাক্রম ও তিন জন সুঠামদেহী ব্যক্তির বাসায় গিয়ে কম্পিউটার ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বুধবার দুপুরে পরিবারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়।

অজ্ঞাত তিন ব্যক্তি যখন মারুফ জামানের বাসায় ঢোকেন, তখন ওই ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন মফিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘‘রাত আটটার পর প্রথমে আমাদের (ভবনের বাসিন্দার) একটা গাড়ি ঢুকছে। ওই গাড়ির পেছন দিয়ে তিনটা লোক ঢুকছে। আমি তাদের ডাক দিয়া বলছি, ভাই দাঁড়ান, কোথায় যান? তারা থামছে। পরে বলে যে, ‘মারুফ জামান স্যারের বাসায় যাবো’। আমি বললাম, স্যার তো বাসায় নাই। সে তো বাইরে আছে। তারপর ওরা বললো যে, ‘বাইরে গেছে সেইটা আমরা জানি। স্যার আমাদের পাঠাইয়া তার কম্পিউটার নেওয়ার জন্য বলছে।’ আমি বললাম, ঠিক আছে দাঁড়ান আমি ফোন দেই। আমি ওপরে ফোন দিছি। বুয়া ধরছে। বললাম, খালা স্যারের কম্পিউটার নেওয়ার জন্য লোক আসছে। স্যার কি কম্পিউটার নেওয়ার জন্য কিছু বইলা গেছে? বললো যে হ্যাঁ বইলা গেছে।’’

মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘‘এরপর আমি বললাম যে, আপনার নাম? বললো, ‘আসিফ।’ এরপর আমি আসিফসহ তিন জন লিখে রাখছি। ওরা ৮টা ৫মিনিটে ঢুকছে। ৮টা ১৪ তে বের হয়েছে। সম্ভবত তারা শার্টের ভেতরে কোনও গেঞ্জি পরা ছিল। আসা-যাওয়ার সময় মাথায় হুডি ছিল। তারা যখন যায়, তখন দেখে যে ওখানে ক্যামেরা আছে, তখন মাথা নিচু কইরা গেছে। বাইরে কোনও গাড়ি ছিল না, ওরা হেঁটে আসছে।’’

সোমবার সন্ধ্যা থেকে নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মারুফ জামানের গাড়িটি (ঢাকা মেট্রো-গ-২১-১৩৯৯) খিলক্ষেতের তিনশ’ ফিট সড়কের একটি ফাঁকা জায়গা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। অক্ষত অবস্থায় গাড়ি উদ্ধার এবং বাসা থেকে ল্যাপটপ-কম্পিউটার উদ্ধারের বিষয়টি মারুফ জামানকে কেউ তুলে নিয়ে গেছে বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু কেন তাকে তুলে নেওয়া হয়েছে? মারুফ জামানের ছোট ভাই রিফাত জামান বলছেন, ‘অজ্ঞান পার্টি বা ছিনতাইকারীর কবলে পড়লে গাড়িটি নিয়ে যেত। দুর্ঘটনা ঘটলে বাসায় কেউ ল্যাপটপ-কম্পিউটার নিতে আসতো না। আর মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করার ঘটনাও এটি নয়। এটি অন্য কিছু। কিন্তু আমরা কিছুতেই বুঝতে পারছি না, কেন তাকে তুলে নেওয়া হলো? কারণ, আমার ভাই কোনও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নয়।’ বাড়ি

গৃহকর্মী লাকী আক্তার বলেন, ‘‘ওই তিন ব্যক্তি বাসায় এসেই বলেন, ‘স্যারের রুমে নিয়ে চলো’। তারা এসে বলেছেন, ‘স্যার আমাদের পাঠিয়েছেন।’ তারা কম্পিউটার-ল্যাপটপ, ক্যামেরা, দামি একটা মোবাইল নিয়ে গেছেন। তারা দেখতে অনেক স্মার্ট। মনে হয়েছে চাকরি-টাকরি করেন। চেহারা ফর্সা, লম্বায় ছয় ফিট হবে। আর সিমসাম বডি। বেশি মোটাও না। আবার অনেক বয়স্কও না। বয়স ৩০-৩২ এর মতো হবে। সবার পরনে কালো পোশাক, জিন্স আর সু-জুতা ছিল।’’

অজ্ঞাত তিন ব্যক্তি চলে যাওয়ার সময় ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যান। যাওয়ার সময় নিচের নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে আর কোনও কথা হয়নি তাদের। লাকী আক্তার বলেন, ‘যাওয়ার সময় তারা বলেন- থ্যাংক ইউ আপু, আমরা আসি। আপনাদের অনেক ধন্যবাদ।’ 

মারুফ জামান যে মেয়েকে আনতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন, সেই সামিহা জামান বলছেন, ‘উই আর ইমোশনালি ডেভোস্টেড। আমরা কেউ চিন্তাও করতে পারতেছি না, আমাদের সঙ্গে এরকম হতে পারে। আমার ফুপি আর চাচা তো ঘুমাতেও পারছে না। খাচ্ছেও না। আর আমার কাছে এটা কল্পনার বাইরে। আমি এটাই চাই, আমার আব্বু ফিরে আসুক।’ তাকে কেউ তুলে নিয়ে গেলে কেন বা কী কারণে নিতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে সামিহা বলেন, ‘আমার ধারণার বাইরে। আমার আব্বু বাইরে যেত না। অতটা সোশ্যালও ছিল না। কেন আমার আব্বুকে নিয়েছে বুঝতে পারছি না।’

উল্লেখ্য, এম. মারুফ জামান ১৯৭৭ সালে সিগন্যাল কোরের সিক্স শর্ট কোর্স শেষ করে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেনাবাহিনীর চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ১৯৮২ সালে ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন। তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে ২০১৩ সালে অবসর নেন।

 

<>

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ