বিশ্বের বহু সামরিক কলেজে ‘বিলোনিয়ার যুদ্ধ’ পড়ানো হয়: জাফর ইমাম বীর বিক্রম

Send
রফিকুল ইসলাম, ফেনী
প্রকাশিত : ২৩:০২, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:২০, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭

কর্নেল (অব.) জাফর ইমাম বীর বিক্রম

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে ২ নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব-সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন জাফর ইমাম। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা অধিনায়ক তিনি। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করা হয় তাকে। ফেনীর বিলোনিয়া যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। সামরিক মানদণ্ডে আলাদা মর্যাদা পেয়েছে এ যুদ্ধ। বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমিসহ বিশ্বের বহু সামরিক কলেজে পাঠ্য করা হয়েছে বিলোনিয়ার দ্বিতীয় যুদ্ধ বা ‘সেকেন্ড ব্যাটল অব বিলোনিয়া বালজ’। মহান মুক্তিযুদ্ধের ৪৭তম বিজয় দিবস উপলক্ষে সে যুদ্ধের স্মৃতির ডালা আরেকবার বাংলা ট্রিবিউনের সামনে খুলে দেন কর্নেল (অব.)জাফর ইমাম বীর বিক্রম ।

বাংলা ট্রিবিউন:বিলোনিয়া যুদ্ধের আপনি অসম সাহসিকতা দেখান। সেই সময়টায় কি আরেকবার ফিরে যাবেন?
জাফর ইমাম: এই যুদ্ধ হয়েছিল দুই পর্বে। প্রথমে প্রতিরোধযুদ্ধ, ২১ জুন পর্যন্ত। পাকিস্তানের ১৫ বেলুচ রেজিমেন্ট,২৪ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স এবং ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সের বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধটা এককভাবে লড়েছিল মুক্তিবাহিনী। দ্বিতীয় যুদ্ধে সাহায্য করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ২৩ মাউন্টেন ডিভিশন। অনুপ্রবেশ (ইনফিলট্রেশন), প্রতিরোধ (ডিফেন্স) ও শেষে সর্বাত্মক আক্রমণ (অ্যাসল্ট)—এই ছিল দ্বিতীয় বিলোনিয়া যুদ্ধের রণপরিকল্পনা।

যদিও ভৌগলিক দিক থেকে বিলোনিয়া যুদ্ধটি বেশ কঠিন এক যুদ্ধ ছিল। রণকৌশলের দিক থেকে এ যুদ্ধটি ছিল বেশ ভয়ানক। এ যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা কিন্তু মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। এটি এককভাবে মুক্তিবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের একমাত্র ঘটনা।

আর বিলোনিয়া দ্বিতীয় যুদ্ধের আসল মাহাত্ম্য অনুপ্রবেশ-যুদ্ধের সাফল্যে। প্রথাবিরুদ্ধভাবে এত বিপুলসংখ্যক মুক্তিবাহিনীর নিরাপদ ও সফল অনুপ্রবেশ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আর ঘটেনি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তো এ যুদ্ধের প্রথম অধিনায়ক,  টাস্কফোর্স কমান্ডারের প্রধানও  ছিলেন?

জাফর ইমাম: হ্যাঁ। এ যুদ্ধে আমার সঙ্গে সহ-অধিনায়ক হিসেবে ক্যাপ্টেন গোলাম হেলাল মোর্শেদ খান (পরবর্তীকালে মেজর জেনারেল, বীর বিক্রম) ছিলেন। পরে ডেকে আনা হয় ৩ নম্বর সেক্টরের অন্যতম এই সাব-সেক্টর কমান্ডারকেও।

বাংলা ট্রিবিউন: কিভাবে শত্রুমুক্ত হয় বিলোনিয়া?

জাফর ইমাম: ১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বর, শীতের রাত কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছিল মুষলধারে। কনকনে ঠাণ্ডা, ঘুটঘুটে অন্ধকার। এর মধ্যেই আমার নেতৃত্বে সীমান্ত থেকে রণাঙ্গণে চলে আসে মুক্তিবাহিনী। সেকেন্ড লে. মিজানের নেতৃত্বে প্রথমে ঢুকে পড়ে ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের ব্রাভো কোম্পানি, পরে সেকেন্ড লে. দিদারের নেতৃত্বে চার্লি কোম্পানি। একেবারে পেছনে হেলাল মোর্শেদের ২য় ইস্ট বেঙ্গলের ডেল্টা কোম্পানি। পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের ফাঁকা জায়গাগুলো দিয়ে মুহুরী নদী পেরিয়ে মুক্তিবাহিনীর দলগুলো নীরবে এগিয়ে যায় সলিয়ার দিকে। এরপর ১ নম্বর সেক্টরের ক্যাপ্টেন মাহফুজ তার কোম্পানি নিয়ে গুথুমা দিয়ে ঢুকে ব্রাভো কোম্পানির সামনের অংশের সঙ্গে যোগ দেন। লে. ইমাম-উজ-জামানের নেতৃত্বে ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের আলফা কোম্পানি মুহুরীর পূর্বপাড়ের ধনিকুণ্ডায় এসে পড়ে। বিরামহীন বর্ষণের রাতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া পাকিস্তানি সেনারা নিজেদের পরিখা ছেড়ে বেরোয়নি। মাঝরাতেই মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের অবস্থানে পৌঁছে ভোরের আগেই খুঁড়ে ফেলে পরিখা। তারপর পরিখায় অবস্থান নিয়ে যুদ্ধের অপেক্ষা।

৬ নভেম্বর বৃষ্টি কমে আসে। ভোরের রাঙা আলোয় অনেকের ক্লান্ত চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু। এমন সময় রেললাইন থেকে ট্রেন চলার মতো শব্দ পাওয়া যায়। ওটা ছিল রেলট্রলি, এক পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন মুক্তিবাহিনীর অবস্থানগুলোর খোঁজে চার জওয়ানকে নিয়ে বেরিয়েছিল। কিন্তু কয়েকশ’ গজ দূরে থাকা মুক্তিযোদ্ধা নায়েব সুবেদার এয়ার আহমেদ (পরে বীর বিক্রম) ও সঙ্গীদের এলএমজির গুলিতে ওখানেই শেষ হয়ে যায় তারা। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান কণ্ঠে উল্লসিত হয়ে ওঠে মুক্তিবাহিনী। তবে খানিক পরেই এয়ার আহমেদের মৃত্যুতে বিষাদ নেমে আসে। দুঃসাহসী এয়ার আহমেদ সেসময় ওই পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের ব্যাজ এবং ট্রলির অস্ত্রগুলো আনতে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু শত্রুর গুলি তাকে আর  ফিরতে দেয়নি।

বিলোনিয়ার যুদ্ধে ধ্বংস করা পাকিস্তানি ট্রলি। বর্তমানে এটি শেরেবাংলা নগরের সামরিক যাদুঘরে রক্ষিত।

৬ নভেম্বর রাতভর ছোট ছোট আক্রমণ করে পাকিস্তানিরা। ৭ নভেম্বর মর্টার ও কামানের গোলায় আরও তীব্র হয় আক্রমণ। শত্রুপক্ষের চারটি এফ-৮৬ জঙ্গি বিমান (স্যাবর জেট) সব এলাকা ঘুরে ঘুরে নিচু হয়ে মেশিনগান ও রকেট হামলা চালাচ্ছিল। কিন্তু, অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা হাবিলদার হাশমত ভারী মেশিনগান দিয়ে এগুলোকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। বিমানগুলোর একটিতে তার গুলি লেগে ধোঁয়া বেরোতে থাকে। বিমানটি পরে কুমিল্লার লাকসাম এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। এতেই তখন থেমে যায় শত্রুদের বিমান হামলা।

ওই রাতেই অবশ্য ভয়ঙ্কর আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী। ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তায় আমরা জবাব দিতে থাকি । একসময় প্রায় মুখোমুখি লড়াই হয়। জীবন বাজি রেখে দক্ষিণে ফুলগাজীর দিকে পাকিস্তানিদের হটিয়ে দেয় মুক্তিবাহিনী। বিপর্যস্ত শত্রুবাহিনীকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে ২৩ মাউন্টেন ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার সান্ধুর ৩য় ডোগরা রেজিমেন্ট। দুই ঘণ্টার মধ্যেই পরশুরাম দখল সম্পন্ন হয়। হতাহত হয় শ’দেড়েক পাকিস্তানি। ১০ নভেম্বর দুই অফিসারসহ ৭২ জন পাকিস্তানি সৈন্য আমার কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। পাকিস্তানি সেনাদের পরাজয়ে মুক্ত হয় বিলোনিয়া। এই যুদ্ধ সামরিক মানদণ্ডে অনন্য। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিসহ বিশ্বের বহু সামরিক কলেজে বিলোনিয়ার দ্বিতীয় যুদ্ধ বা ‘সেকেন্ড ব্যাটল অব বিলোনিয়া বালজ’ পড়ানো হয়।

বাংলা ট্রিবিউন: পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিয়মিত সদস্য হয়েও কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন?
জাফর ইমাম: মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আগে আমি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে পদাতিক বাহিনীতে ক্যাপ্টেন হিসেবে কর্মরত ছিলাম । ২৪-এফএফ রেজিমেন্ট ইউনিটে ছিলাম। ২৬ মার্চ রাতে ক্যান্টনমেন্টে আমার সঙ্গের আরেকজন বাঙালি অফিসারকে নিরস্ত্র করে বন্দি করে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাকেও তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে বদলির উদ্দেশ্যে আরও কয়েকজন অফিসারসহ হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা পুরাতন বিমানবন্দরে হেলিকপ্টারটি অবতরণের পর বুদ্ধি করে আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এয়ারপোর্ট টয়লেটে ঢুকে পড়ি। ইউনিফর্ম খুলে সিভিল পোশাক পরে এয়ারপোর্টের বাইরে চলে আসি।
বাংলা ট্রিবিউন: ধরা পড়া থেকে  বেঁচে গেলেন কিভাবে?
জাফর ইমাম: ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল। যদি পড়ে যেতাম, তাহলে বলতাম, আমি ক্যান্টনমেন্টে যাওয়ার জন্য আর্মি ট্রান্সপোর্ট খুঁজছি, না পেলে সিভিল ট্যাক্সি অথবা বেবিট্যাক্সিতে ক্যান্টনমেন্টে চলে যাবো। এরপর ১৯৭১-এর এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ অথবা তৃতীয় সপ্তাহের প্রথম দিকে আমি কুমিল্লার কসবা সীমান্ত অতিক্রম করি। পরে ভারতের মেঘালয়ে ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। সেখানে কর্নেল এম এ জি ওসমানীও ছিলেন। তিনি বললেন- ‘শাবাশ’। পরে আমাকে পাঠালেন বিলোনিয়া সেক্টরে।
বাংলা ট্রিবিউন: যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের কিভাবে সংগঠিত করলেন?
জাফর ইমাম: বিলোনিয়াতে যাওয়ার সময় সঙ্গে ছিলেন কর্নেল আকবর ও ক্যাপ্টেন আমিনুল হক। তারা ক’দিন থেকে চলে যান ২ নম্বর সেক্টরের অন্য রণাঙ্গনের দায়িত্বে। তখন বিলোনিয়া সেক্টরের বিএসএফ কমান্ডার মেজর প্রধানের সঙ্গে দেখা করি। পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করি। আমি যেহেতু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পদাতিক বাহিনীর অফিসার ছিলাম তাই তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও উৎসাহ লক্ষ্য করলাম। সম্ভবত এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ হবে, আমি মেজর প্রধানকে সঙ্গে নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের সুসংগঠিত করার কাজ শুরু করলাম। ৩-৪ দিনের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা (ছাত্র, শ্রমিক, জনতা) ও প্রাক্তন ইপিআর বাঙালি সৈনিক ও পুলিশকে একতাবদ্ধ করে ২ নম্বর সাব সেক্টর গঠন করে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিলাম। ভারত সীমান্তের রাজনগর ও বড় কাসারিতে গড়লাম ট্রেনিং ক্যাম্প। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে আমরা শুরু করলাম বিচ্ছিন্ন সামরিক ও গেরিলা অভিযান। ফেনীর দিকে মুখ করে বিখ্যাত মুন্সিরহাট ডিফেন্স তৈরি করে পজিশন গ্রহণ করি। উদ্দেশ্য ছিল মুন্সিরহাট ডিফেন্সকে মুক্তিবাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে পরবর্তীতে ফেনী মুক্ত করা।
বাংলা ট্রিবিউন: বিলোনিয়া ছাড়া  আপনি আর কোথাও মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেছিলেন?
জাফর ইমাম: আমি বিলোনিয়া থেকেই  বৃহত্তর নোয়াখালীতেও মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেছিলাম। আমরা ওইসব অঞ্চলের তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবং নেতাদের মাধ্যমে সামরিক ও গেরিলা যুদ্ধের রণকৌশল প্রশিক্ষণ দিতাম। তাদের অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করতাম। যাতে তারা নিজ অঞ্চলে থেকে নিজস্ব এলাকাতে যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারেন।

বাংলা ট্রিবিউন: মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?

জাফর ইমাম: একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা এখনও নির্ধারণ হয়নি। যুদ্ধের সময় যারা মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার দিয়েছেন, আমরা বলি- তারা সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু তারা এখন শুধু মুক্তিযোদ্ধা না, মুক্তিযোদ্ধাদেরও নেতা হয়ে গেছেন। আমি বলছি না, মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা নেই। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ না করার কারণে এই ধূম্রজালটা সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। এটা আরও ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে ‘রাজনৈতিক সুযোগ’ এর কারণে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের নামে গঠিত সংগঠনগুলোও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়। তাই বাংলাদেশের সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধার প্রতিনিধিত্ব এরা দাবি করতে পারেন না।

/এএইচ/টিএন/

লাইভ

টপ