‘দেশের প্রেমে পাগল হয়ে যুদ্ধে গেছি’

Send
জহিরুল ইসলাম খান, মাদারীপুর
প্রকাশিত : ০৭:৫৯, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৫৯, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭

খলিলুর রহমান খান

১৯৭১ সালে খলিলুর রহমান খান ছিলেন মাদারীপুরে নাজিমউদ্দিন কলেজের ছাত্র। দেশে তখন বিরাজ করছে অস্থিরতা। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চলছে তীব্র আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ নাজিমউদ্দিন কলেজের বর্তমান শহীদ মিনারের কাছে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দেন খলিলুর রহমান খান। সেদিন তাকে একাজের নির্দেশ দিয়েছিলেন বর্তমান নৌমন্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান খান। খলিলুর বলেন, দেশের প্রেমে পাগল হয়ে যুদ্ধে গিয়েছি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় খলিলুর রহমান খান ছিলেন মাদারীপুরে খলিল বাহিনীর কমান্ডার। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য এই বীর যোদ্ধা বলেছেন মুক্তিযুদ্ধে তার বীরত্বের সেইসব গল্প কথা।  

যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্ততি

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকে আমরা ওদের (পাকিস্তানি সেনাদের) মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাই। ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ও বঙ্গবন্ধু ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে বৈঠক করেন। ইয়াহিয়া খান কোনও সিদ্ধান্ত না দিয়ে চলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। সেই রাতে পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করে নিরীহ বাঙালিদের ওপর। এ খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা কয়েকজন যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিই। প্রথমে আমরা মাদারীপুরে সৈয়দ সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে শারীরিক প্রশিক্ষণ নিই। এরপর অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য আমাদের ভারতে পাঠানো হয়। ক্যাপ্টেন শওকতের নেতৃত্বে ১৬৫ জনের একটি দলে আমরা ভারত যাই। যুদ্ধে যাওয়া জন্য পরিবার থেকে কোনও বাধা আসেনি। দেশের প্রেমে পাগল হয়ে যুদ্ধে গিয়েছি। যুদ্ধে যাওয়ার জন্য মা উৎসাহ দিয়েছেন।

 কলকাতায় প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফেরা

প্রথমে আমরা লঞ্চে করে চাঁদপুর যাই। সেখান থেকে তিন দিন তিন রাত হেঁটে ত্রিপুরা রাজ্যের বেলুনিয়ায় পৌঁছি। পথে খাবার ছিল শুধু চিড়া। প্রথমে আমরা ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার কাঠালিয়ায় অবস্থান করি। এলাকাটি ছিল শুধু বন-জঙ্গলে ঘেরা । আমরা প্রশিক্ষণের জন্য নিজেরাই বন-জঙ্গল পরিষ্কার করি। কয়েক দিন পর সেখানে তাবু স্থাপন করি। এরপর আমাদের কয়েক জনকে কলকাতায়  নিয়ে যাওয়া হয় অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিতে। থ্রি নট থ্রি, এসএলআর, এসএমজি, টুইঞ্চ হ্যান্ডগ্রেনেড, এক্সপ্লোসিভ, টুইঞ্চ মর্টার, এনআর গান, অ্যান্টিট্যাঙ্ক ও অ্যান্টি পারসোনাল মাইন ইত্যাদি অস্ত্র সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নিই। আমাদের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন হানিফ ও মেজর শাবেক সিং। আমরা ২১ দিন প্রশিক্ষণ নেই। অল্প দিনে আমরা অস্ত্র সম্পর্কে পারদর্শী হয়ে উঠলাম। ঘুমানোর সময় ছিল মাত্র চার  ঘণ্টা। যুদ্ধের প্রশিক্ষণের সেই কষ্টের কথা কোনও মুক্তিযোদ্ধা ভুলতে পারবে না। হাজার হাজার বাঙালি যুবক যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছে। সাহায্য করেছে ভারত সরকার।

প্রশিক্ষণ শেষে আমরা দেশের পথে রওনা হই। মাদারীপুরে পৌঁছাতে গাইড দেন কর্নেল মাহাবুব। আমাদের দলে ছিলেন-মোনাসেফ, হোসেন শরীফ, গৌরাঙ্গ বিশ্বাস, হারুন শরীফ, বাদল, শাজাহানসহ আরও কয়েকজন। আমাদের প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছিল দুটি করে হ্যান্ড গ্রেনেড ও একটি বেয়নেট। পাঁচ জনকে একটি এসএলআর ও কয়েক রাউন্ড গুলি। কলকাতায় থাকাকালীন শুনেছিলাম ২৩ এপ্রিল মাদারীপুরে মান্নান ভূঁইয়ার বাড়িতে বিমানযোগে আক্রমণ হয়েছে। আমি ২১ জনকে চারটি গ্রুপে ভাগ করি। এক গ্রুপের বাদল ও শাজাহান পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়ে। আমাদের যোগাযোগ কিছু দিনের জন্য জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আমি আবারও (দ্বিতীয় বার) কলকাতায় যাই। ২১ জনের একটি দল নিয়ে মাদারীপুরে পুনরায় ফিরে আসি। সেই দলে ছিল তসলিম আহমেদ, আচমত ও বিশু।

আমরা মাদারীপুর জেলার কেন্দুয়া ও বাজিতপুরের কলাগাছিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপন করি। পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার জন্য বিভিন্ন জাগায় আক্রমণ শুরু করি। একদিন আমরা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার জন্য ওয়াবদার পাওয়ার হাউসে আক্রমণ চালাই। পাঁচ জনের একটি দল রাতে আক্রমণ করি। এক্সপ্লোসিভ দিয়ে পাওয়ার হাউস ধ্বংস করে ফেলি। তারপর চরমুগরিয়া পাটগুদামে আগুন দেই। তখনও আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি মোকাবিলা করতে পারিনি। কারণ, ওদের সঙ্গে মোকাবিলা করার মতো  শক্তিশালী অস্ত্র আমাদের ছিল না।

উন্নত অস্ত্রের সন্ধানে ফের কলকাতায়

আমি বুঝতে পারলাম আরও উন্নত অস্ত্র লাগবে। উন্নত অস্ত্র আনতে আমাকে যেতে হয় কলকাতায়। কলকাতায় গিয়ে আমি শওকত সাহেবের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলি। কর্নেল শওকত পরে ডেপুটি স্পিকার ছিলেন। তার কাছে আমি উন্নত অস্ত্র চাই। তিনি বিপুল পরিমাণ এক্সপ্লোসিভ, অ্যান্টিট্যাঙ্ক, অ্যান্টি পারসোনাল মাইন, টুইঞ্চ মর্টার, এলএমজি, এসএলআর  ইত্যাদি অস্ত্র দেয়। এছাড়া, তিনি আমার সঙ্গে শরীয়তপুরের নড়িয়া বাড়ির দুজন প্যারামেডিক্যাল ডাক্তার আবুল কাশেম ও আবুল হাশেমকে  দেন। আমি তাদের নিয়ে ঘাসি নৌকায় নোয়াখালী দিয়ে তাদের এলাকায় যাই। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল শুধু নৌকায়। তারপর নড়িয়া থেকে ছৈওয়ালা নৌকায় করে ক্যাম্পে চলে আসি। সব অস্ত্র যোদ্ধাদের মাঝে ভাগ করে দেই। এবার পাকিস্তানি সেনাদের মোকাবিলা করার জন্য আমরা যথেষ্ট শক্তিশালী। আমরা একের পর এক তাদের ঘাঁটি আক্রমণ করতে থাকি। আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা। আগস্ট মাসের প্রথম দিকে ডিনামাইড দিয়ে মাদারীপুর ও মস্তফাপুর সড়কের চোকদার ব্রিজ উড়িয়ে দিই। তারপর রাজৈর থানার আমগ্রামের ব্রিজ ও সমাদ্দার ব্রিজ উড়িয়ে দিই। ফলে হানাদার বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।

একদিন খবর পেলাম পাকিস্তান সেনারা ফরিদপুর যাবে রাতে বেলায়। আমরা মস্তাফাপুর অ্যামব্যুশ করে থাকি। আমার সঙ্গী শাজাহান সরদারকে পাঠাই মাদারীপুর খাগদী স্থলমাইন পুতে রাখতে। ওই মাইন-এর বিস্ফোরণে পাকিস্তানি সেনাদের গাড়ি উড়ে যায়। মাদারীপুরে পাকিস্তানি আর্মির ক্যাম্প ছিল এ.আর. হাওলাদার মিলে। আমরা রাতে সাত-আট জনের একটি দল আক্রমণ করি।চরমুগরিয়ায় পাটের গোডাউনে আগুন দিই।

মাদারীপুরে বিভিন্ন স্থানে রাজাকার ছিল। ঘটকচর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ছিল রাজাকারদের ক্যাম্প। আমরা আক্রমণ করি সেই ক্যাম্পে। এতে মারা যায় ১২ থেকে ১৩ জন রাজাকার। তাদের সব অস্ত্র আমরা নিয়ে আসি। কালকিনি থানা ছিল পাকিস্তানি সেনাদের দখলে। সেখানে আক্রমণ করে তাদের বিতাড়িত করি। আস্তে আস্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনী কোনঠাসা হয়ে পড়ে। তারা অনেক হিন্দু এলাকায় আক্রমণ করে হিন্দুদের হত্যা করেছে। মাদারীপুরের উত্তর দুধখালীতে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে শতাধিক হিন্দু।

সমাদ্দারে ছিল অনেক রাজাকার। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি-ঘর লুট করতো।  একদিন সেখানে রাজাকারদের শেষ করার জন্য যাই। সমাদ্দারের ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার পর পাকিস্তানি সেনারা গাড়ি চলাচলের জন্য লোহার চালি ফেলে। সেটা পাহারা দেওয়ার জন্য থাকতো রাজাকাররা। একটি ছোট নৌকায় বরযাত্রী সেজে সেখানে যাই। নৌকার মাঝি ছিল শুধু বাইরে। আমরা ৭ থেকে ৮ জন ছিলাম নৌকার ছৈ-এর ভেতরে। ওখানে যাওয়ার পর রাজাকাররা মাঝিকে ডাক দেয়। মাঝিকে বলে রাখি তাদের কাছে যাওয়ার পর পানিতে ঝাঁপ দিতে। যখন ওদের কাছে গেলাম, হঠাৎ গুলি করতে আরম্ভ করি। তিন জন রাজাকার মারা যায়। একজনকে আটক করে ক্যাম্পে নিয়ে আসি। ক্যাম্পে নিয়ে আসার পরে তাকে হত্যা করা হয়।

রাতে আমরা ক্যাম্পে থাকতাম না। দিনের বেলায় ক্যাম্পে থাকতে হতো। নভেম্বর মাসের এক সকালে পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করে আমাদের ক্যাম্প। সেদিন ওরা ক্যাম্পে আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং আশপাশের এলাকার পঁচাশি জনের বেশি লোককে হত্যা করে। তবে কোনও মুক্তিযোদ্ধা মারা যায়নি। আমি দুপুর বেলা সেখানে পৌঁছাই। দেখি শত শত মানুষের লাশ হয়ে পড়ে রয়েছে। সেই করুণ দৃশ্যের কথা মনে হলে হৃদয়টা আজও  কেঁদে ওঠে। কত ত্যাগ ও কত কষ্টে এই বাংলাদেশ, তা শুধু মুক্তিযোদ্ধারা ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। আবারও আমরা এলাকার মানুষের সাহায্যে ক্যাম্প তৈরি করি। ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধের আভাস পাওয়া যায়। চারদিকে মুক্তিবাহিনীর জয় হতে থাকে।

মুখোমুখি যুদ্ধ

৭ ডিসেম্বর গোপনে জানতে পারি, ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনারা ফরিদপুর যাবে। স্থানে স্থানে আমরা রাতে অ্যামবুস করি। ৮ তারিখ সকালে পাকিস্তান বাহিনীর ৩টি গাড়ি ঘটকচরের রাস্তা হয়ে ফরিদপুর যাচ্ছে। পথের মধ্যে একটি গাড়ি মাইন দিয়ে উড়িয়ে দেই। বাকি গাড়ি দুটি সমাদ্দার গিয়ে পজিশন নিয়ে আমাদের সঙ্গে লড়াই করে। এই লড়াই ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে। ১০ তারিখে আমার সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল সরোয়ার হোসেন বাচ্চু শরীফ। পাকিস্তানি সেনাদের একটি গুলি ওর জীবন কেড়ে নেয়। এখন ওর নামে মাদারীপুরে একটি সড়ক তৈরি হয়েছে। ১০ ডিসেম্বর সন্ধ্যার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী মেজর হামিদ খটকের নেতৃত্বে ২৫ জন সৈন্য অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। এই যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীর মারা গিয়েছিল ১৫ জন। ১১ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করা সৈন্যদের আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে আসি। সেখানে দুই দিন রাখি। তারপর ১৩ ডিসেম্বর আহত সৈন্যদের মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করি। বাকিদের জেলে আটকে রাখি।

১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্তভাবে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি সেনারা। আমরা পাই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তারপর আমাদের অস্ত্র জমা দিলাম। ২৬ ডিসেম্বর ইন্ডিয়ান আর্মি এসে পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে যায়। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সব বাঙালি।

জানতে হবে ইতিহাস

নতুন প্রজন্মের কাছে আমার একান্তই আবেদন, তোমরা মূল্যায়ন করতে শেখো এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশের। এ দেশের জন্য তোমাদের কী করা দরকার তোমরাই ভেবে দেখো। একটি দেশের বর্তমানকে চেনা যায় তার গৌরবময় ইতিহাস দিয়ে। অতীত দিয়ে। অতীতের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে গঠিত হয় বর্তমান। ইতিহাসের কিছু কিছু ঘটনা মানুষের মনে জোগায় চেতনা। আর এই চেতনা দিয়েই তৈরি হবে সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ। তাই আমাদের সবাইকে একাত্তরের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে।

 

 

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ