সুন্দরবন এখন ধ্বংসের হুমকির সম্মুখীন: সুলতানা কামাল

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২২:৩৯, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৪৯, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৭

সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সংবাদ সম্মেলনঅ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, ‘সুন্দরবন এখন ধ্বংসের সর্বোচ্চ হুমকির সম্মুখীন। নদীর প্রবাহ নষ্ট, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ভাঙনের পাশাপাশি রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সরকারি উদ্যোগের কারণেই আজ এই বন হুমকির মুখে। সময়ক্ষেপণ না করে রামপাল প্রকল্প বাতিল ঘোষণা ও বন রক্ষায় করণীয় বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’ পাশাপাশি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির গবেষণাপত্রটি নিয়ে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে মত প্রকাশ ও আলোচনার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।

শনিবার (৩০ ডিসেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘সুন্দরবন ও রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা ও করণীয়’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি জানান।

সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ডা. মো. আব্দুল মতিনের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম, বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন)-এর গ্লোবাল সমন্বয়কারী ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. নজরুল ইসলাম, সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির কোর গ্রুপ সদস্য শরীফ জামিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল আজিজ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সহসভাপতি স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন।

সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক সুলতানা কামাল বলেন, ‘বনের নদীপ্রবাহ বিনষ্টকরণ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, স্থায়ী জলাবদ্ধতা, বনের গাছ কাটা ও পশু শিকার প্রতিরোধে বন বিভাগের ব্যর্থতা, বনের ভেতরে নৌপথ অব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা, অপরিকল্পিত পোল্ডার ও মাছ শিকার, সুন্দরবনে অতিরিক্ত নৌযান চলাচল, পানি দূষণ, নৌযানের সাইরেন-উদ্ভূত শব্দ দূষণ, বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা ও বনের গাছে অগ্নিসংযোগ–এসব কারণে সুন্দরবনের ক্ষতি হচ্ছে প্রতিদিনই। একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে সাম্প্রতিক পশুর নদের পাড় ভাঙন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এগুলো ছাড়াও সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বন বিধ্বংসী উন্নয়ন ও শিল্পায়ন, যা সুন্দরবনের জন্য মারাত্মক নেতিবাচক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ সংকট নিরসনের নামে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে সুন্দরবনের বাফার জোনের মাত্র চার কিলোমিটারের মধ্যে, অর্থাৎ বনের পাশ ঘেঁষে রামপালে নির্মিত হচ্ছে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র।’ তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক আন্দোলনের পক্ষ থেকে বারবার রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে সঠিক তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সরকার এসবের কোনও বিজ্ঞানসম্মত উত্তর দেয়নি।’ সুলতানা কামাল বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কো ‘মেমোরি অব দি ওর্য়াল্ড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেটি অবশ্যই জাতি হিসেবে আমাদের জন্য গর্বের এবং বড় প্রাপ্তি। কিন্তু সুন্দরবন বিষয়ে ইউনেস্কোর যে আপত্তি সেটিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। যেহেতু দুটিই ইউনেস্কোর স্বীকৃত তথ্য। তাই এক্ষেত্রে দ্বৈতনীতি কাম্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে গত ২০ আগস্ট রামপাল বিষয়ক ১৩টি গবেষণাপত্র সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে দুই মাসের মধ্যে মতামত ও আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চার মাসের বেশি সময় হয়ে গেছে, কোনও মতামত পাওয়া যায়নি।’

ড. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রামপাল প্রকল্প নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও উদ্বিগ্ন। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নিশ্চিত সুন্দরবন ধ্বংস হবে।’ বাংলাদেশে সৌর জ্বালানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি  কয়লাভিত্তিক প্রকল্প থেকে সরে এসে সৌর জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, ‘সারাবিশ্ব কয়লাভিত্তিক প্রকল্প থেকে সরে এসেছে, এমনকি ভারত ও চীন কয়লাভিত্তিক প্রকল্প থেকে সরে আসার জন্য একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।’ দেশ, পরিবেশ ও জনস্বার্থে রামপাল প্রকল্প বিষয়ে অনমনীয়তা থেকে সরে আসার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, ‘শুরু থেকেই রামপাল প্রকল্প বিষয়ে সরকার জনগণকে ভুল তথ্য দিচ্ছে, এমনকি ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তকেও তারা ভুলভাবে প্রচার করেছে, যা খুবই দুঃখজনক।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই সরকার বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করবে। এতে দেশবাসী অবশ্যই সঠিক তথ্যটি জানবে।’

সংবাদ সম্মেলন থেকে যেসব দাবি জানানো হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে– রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের সব কাজ অবিলম্বে বন্ধ করা, গবেষণাপত্র বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের কোনও বিজ্ঞানসম্মত দ্বিমত থাকলে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে তা প্রকাশ এবং সে বিষয়ে সরকার ও সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি, উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য দিন ও সময়ে উন্মুক্ত আলোচনার পদক্ষেপ নেওয়া, সুন্দরবনের পাশে বা অভ্যন্তরে নির্মাণাধীন ও পরিকল্পিত ৩২০টি ও সব সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প ও স্থাপনা অপসারণ, নির্মাণাধীন প্রকল্প অবিলম্বে বন্ধ, বরাদ্দ করা সব প্লট অবিলম্বে বাতিল এবং সুন্দরবনের ওপর আরোপিত অন্য সব অনিয়ম অবিলম্বে বন্ধ করা।

/এসএনএস/এএম/

লাইভ

টপ