কতটা সফল হবে নতুন ‘দারুল আরকাম’ মাদ্রাসা?

Send
সোহেল মামুন ও আসিফ ইসলাম শাওন
প্রকাশিত : ১৫:০৫, জানুয়ারি ২০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩১, জানুয়ারি ২০, ২০১৮

মাদ্রাসায় পড়ালেখা করছে শিক্ষার্থীরা (ছবি- মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন)কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার পাশাপাশি সরকার এ বছরেই ‘দারুল আরকাম’ নামে তৃতীয় একটি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করতে যাচ্ছে। নতুন প্রবর্তিত এই শিক্ষাব্যবস্থার দেখভাল করবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। কওমি মাদ্রাসাগুলোর ওপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার মধ্যেই ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগ নতুন এই শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যসূচির একটি খসড়া প্রণয়ন করেছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রাথমিকভাবে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত নতুন এই মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে কাজ করছে। পর্যায়ক্রমে একে শিক্ষার তৃতীয় স্তর পর্যন্ত উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহকারী সচিব নূর উদ্দিন বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যসূচিকে মান ধরে দারুল আরকামের পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা হয়েচে। এ বছরের জানুয়ারি থেকেই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠদান শুরুর মাধ্যমে নতুন এই শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা হবে।’ আগামী ২০১৯ সালে এতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যুক্ত করা সম্ভব বলে আশা করছেন তিনি।
নূর উদ্দিন জানান, দারুল আরকাম থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলে শিক্ষার্থীদের ইবতেদায়ি (মাদ্রাসার প্রাথমিক পর্যায়) সমমানের সনদ দেওয়া হবে। এই সনদ নিয়ে যেকোনও শিক্ষার্থী আলিয়া মাদ্রাসায় নিম্নমাধ্যমিক স্তরে ভর্তি হতে পারবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারের কোনও হস্তক্ষেপ নেই। তবে সরকারি নীতি মেনেই চলবে দারুল আরকাম। এই শিক্ষাব্যবস্থা মানসম্পন্ন পাঠ্যসূচির মাধ্যমে সঠিকভাবে ইসলামি শিক্ষা প্রবর্তনে ভূমিকা রাখবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক জানান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এরই মধ্যে দেশের বেশকিছু এলাকায় এ ধরনের মাদ্রাসা চালু করেছে, যেগুলো আগামী বছর থেকে পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করবে। দেশের যেসব উপজেলায় আলিয়া বা কওমি মাদ্রাসা নেই, সেসব উপজেলার প্রতিটিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন দারুল আরকাম মাদ্রাসা স্থাপন করবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান মনে করছেন, নতুন দারুল আরকাম মাদ্রাসাগুলো প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন একটি সংকটে তৈরি করবে। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের এই অধ্যাপক বলেন, ‘একটি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে নেতৃত্ব দিয়ে চালিয়ে নেওয়ার মতো সামর্থ্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নেই। বরং মাদ্রাসাগুলোকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনেই রাখা উচিত।’
এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সামীম মোহাম্মদ আফজাল।
তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, সারাদেশে কমপক্ষে এক হাজার ১০টি দারুল আরকাম মাদ্রাসা স্থাপন করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
নতুন একটি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বিদ্যমান মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর দিকেই আরও বেশি মনোযোগ দিয়ে তাদের উন্নতি করা দরকার। সমন্বয়ের অভাবের কারণে নতুন প্রবর্তিত দারুল আরকাম মাদ্রাসাগুলো পুরো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি করবে বলেই মনে করছেন তারা।
মাদ্রাসা শিক্ষার ধারায় নতুন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের পেছনে কোনও ধরনের রাজনীতি রয়েছে বলে সন্দেহের কথা জানিয়েছেন সাংবাদিক ও গবেষক আফসান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষায় অনেকগুলো ধারা তৈরি হয়ে গেলে তা গোটা মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেলতে পারে।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বরং তাদের মক্তবভিত্তিক (মসজিদভিত্তিক ইসলামি শিক্ষা) শিক্ষাকে আলিয়া মাদ্রাসার অধীনে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে বলে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
দারুল আরকাম মাদ্রাসার ভবিষ্যত নিয়ে বলতে গিয়ে আফসান চৌধুরী বলেন, ‘ইসলাম ধর্মভিত্তিক চাকরির বাজারের উপযোগী করে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার কথা মাথায় রেখেই ইসলামি শিক্ষার পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যক্রম সাজানো হয়ে থাকে। কিন্তু এই ভাবনার সমস্যা হলো— আদতে চাকরির এই বাজারটি তেমন বিস্তৃত নয়। দারুল আরকামের পাঠ্যসূচি যদি এমন হয় যে তাতে ধর্মভিত্তিক চাকরির বাইরেও শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকবে, সেটা খুব ভালো হবে। তা না হলে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করাটাই ভালো হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসির মামুন সরকারের নতুন এই মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা চালুর উদ্যোগে হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সরকার মাদ্রাসা শিক্ষায় নতুন এই ধারা চালু করতে চাইলে তেমন কেউ হয়তো সরকারের সমালোচনা করবে না। ছাত্র নেতারা এখন টেন্ডার আর ছিনতাই নিয়ে ব্যস্ত, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো শেখ হাসিনা ও নির্বাচনি ব্যবস্থার সমালোচনায় ব্যস্ত। এমন একটি সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করার মতো খুব বেশি মানুষ নেই।’
মুনতাসির মামুন প্রশ্ন রাখেন, ‘কেন অল্প কিছু মানুষ দেশের বিশৃঙ্খল শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা বলে? কেন জনগণ ও রাজনীতিবিদরা শিক্ষাব্যবস্থার এই চরম দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা নিয়েও কিছু ভাবে না?’ জনগণ যদি মনে করে যে নতুন এই মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব, তখনই এই শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারী বলেন, ‘মাদ্রাসা বোর্ডের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক ফাঁক-ফোঁকর রয়ে গেছে। আমাদের মসজিদভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে উচ্চ শিক্ষার কোনও সুযোগ নেই। আমার মনে হয়, নতুন শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এই সমস্যাটি সমাধানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে কাজ করতে হবে।’
বাংলাদেশে ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়টিকে খুবই স্পর্শকাতর উল্লেখ করে অধ্যাপক আসকারী বলেন, ‘সরকার চাইলেই এ ধরনের কোনও শিক্ষাব্যবস্থাকে ছুঁড়ে ফেলতে পারে না কিংবা সহজে সংশোধনও আনতে পারে না।’
(ঢাকা ট্রিবিউনে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ছয় পর্বের ধারাবাহিকের পঞ্চম পর্ব। ষষ্ঠ ও শেষ পর্ব পড়ুন আগামীকাল)
প্রথম পর্ব: আট কিলোমিটারে ৬৮ মাদ্রাসা!

দ্বিতীয় পর্ব: চাকরিক্ষেত্রে সুযোগ কতটুকু মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের

তৃতীয় পর্ব: স্কুলের চেয়ে মাদ্রাসা কেন বেশি পছন্দ অভিভাবকদের

চতুর্থ পর্ব: কী শিখছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা

/জেজে/এমপি/টিআর/

লাইভ

টপ