দুদকের অভিযুক্ত ৪ কর্মকর্তাসহ ৩২ জনকে পদোন্নতির চেষ্টা কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ১৯:৪৩, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:২০, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮

কারিগরি শিক্ষা বোর্ড

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে বড় ধরনের পদোন্নতিতে চেয়ারম্যান ও সচিবের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বোর্ডের ৩২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতি দিতে এই আয়োজন করা হয়। বদলি হওয়ার পরেও পদ না ছেড়ে বোর্ড সচিব চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগসাজশ করে রবিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) এই সভার আয়োজন করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

অভিযোগ মতে, পদোন্নতির তালিকায় থাকা চার জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।  এ নিয়ে আপত্তি তোলেন বোর্ডসভার একাধিক সদস্য। শেষ পর্যন্ত বোর্ডসভার কয়েকজন সদস্যের বাধায় সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভাটি শেষ হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি দুই নম্বরি করার জন্য চাকরিতে ঢুকিনি। আমি শিক্ষকতায় এসেছি অনেস্ট লাইফ লিড করার জন্য। যারা বলছেন (অভিযোগ করছেন) তারা দুদকে কমপ্লেইন করতে পারেন। অনৈতিক কাজের মধ্যে আমি নেই। কোনোদিনই ছিলাম না, এখনও নেই। যে কয়দিন বেঁচে আছি, সে কয়দিনও অনৈতিক কাজে থাকবো না।’

এ বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডের সচিব মো. নায়েব আলী মন্ডল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানুষ চাইলেই টাকা দিয়ে দেয়? অত সহজেই টাকা দিয়ে দেয়? কোনও প্রক্রিয়া শেষ না করে কেউ টাকা দিয়ে দেবে, এটি কি বিশ্বাসযোগ্য? বোর্ডে আমি একা নই। ডিজির প্রতিনিধি, মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি রয়েছে। আমি এই কমিটির উপস্থাপক মাত্র। এটা হতে পারে আমি যদি সঠিকভাবে উপস্থাপন না করি, তাহলে কেউ বঞ্চিত হতে পারেন। কিন্তু আমার জবাবদিহি নেই? আমি উপস্থাপন করলেই কমিটি সহজে মেনে নেবে? আমি অনৈতিকভাবে নীতিমালার বাইরে একটিও (পদোন্নতি) করতে পারবো না। এসব ভিত্তিহীন।’

বোর্ডসভার সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে চাইলে সচিব বলেন, ‘বেশ কিছু জটিলতা আছে, দুদকের মামলা আছে, এসব কারণে এটা (পদোন্নতি) হবে না।’

বদলি হওয়ার পরেও পদ না ছাড়ার কারণ জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘আমি রিলিজ নেওয়ার জন্য প্রেয়ার দিয়েছি (আবেদন করেছি) চেয়ারম্যানের মাধ্যমে। আমার রিলিজের ফাইল মন্ত্রীর টেবিলে আছে। কাল সই হলে কালই চলে যাবো, পরশুদিন সই হলে পরশুদিনই চলে যাবো।’

মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, কারিগরি শিক্ষাকে শিক্ষাখাতের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে সরকার। কিন্তু সব উদ্যোগই ভেস্তে যেতে বসেছে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিবের অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে। বোর্ড চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যোগদানের ছয় বছর আগের বিল ও সম্মানীর ভুয়া ভাউচার নেওয়া, জালিয়াতি করে শিক্ষার্থী পাস করানোর প্রমাণ পেয়েছে মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। তবে রহস্যজনক কারণে সতর্ক করা ছাড়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে করে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন চেয়ারম্যান।

বোর্ডের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, প্রশাসন ক্যাডারের যুগ্মসচিব নায়েব আলী মন্ডলকে প্রেষণে বোর্ডের সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল দুই বছর আগে।  দুই মাস আগে তাকে বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তারপরেও বিভিন্ন অজুহাতে সচিব হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। রবিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) তার শেষ কর্মদিবসে বোর্ডের ৩২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদোন্নতির আয়োজন করেন। এজন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর সঙ্গে বোর্ড চেয়ারম্যান জড়িত।

বোর্ড সভার একাধিক সদস্য জানান,সচিবের শেষকর্ম দিবসে তড়িঘড়ি করে বোর্ডসভা ডাকা হয়। সভায় পদোন্নতির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। চেয়ারম্যান ও সচিবের ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি অন্য সদস্যরা জেনে যাওয়ায় সভা শুরুর আগে পদোন্নতির তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে বলা হয়। এই প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে আরও একজন সদস্য বলেন,‘যেহেতু দুদক চার জনের বিষয়ে তদন্ত করছে তাই অন্যদের বিষয়েও অভিযোগ থাকতে পারে। এ কারণে আরও খোঁজ-খবর নিয়ে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।’

বোর্ড সভার আগে সকালে বোর্ডের চেয়ারম্যানের রুমে দুদকের তদন্তের জালে আটক পড়া দু’জন পদোন্নতির তদবির করেন। বোর্ডের সচিবের রেফারেন্স দিয়ে ওই দুই কর্মকর্তা বলেন, ‘সচিব স্যারের শেষ কর্মদিবস আজ। আমাদের পদোন্নতি না হলে জীবনে এ সুযোগ আর আসবে না। তাই বিষয়টি সদয় দৃষ্টিতে দেখার জন্য চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করতে এসেছি।’

মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কারিগরি বোর্ডে নিবন্ধন জালিয়াতি করে শিক্ষার্থী পাস করানোর অভিযোগও রয়েছে বোর্ড চেয়ারম্যান ও সচিবের বিরুদ্ধে। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে এসব ফল জালিয়াতি ও দুর্নীতির চিত্র উঠে আসে। এরপর তদন্ত কমিটি কারিগরি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিবের দায়িত্বে অবহেলা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছে।

চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আরও জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১০ মার্চ বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান। যোগ দিয়েই তিনি ভাউচার দিয়ে সম্মানী হিসেবে ২৫ লাখ ১৪ হাজার ৪০০ টাকা তুলে নেন। পরে এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুল্লাহ আল হাসান চৌধুরীর নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। ওই কমিটির তদন্তে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন বাবদ সম্মানী নেওয়ার অভিযোগের প্রমাণ মেলে। পরে ওই অর্থ ফেরত দেন চেয়ারম্যান। এই ঘটনায় চেয়ারম্যানকে সতর্ক করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি আদেশ জারি করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় তদন্ত করেছে, মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চান।’

এছাড়া চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বেসরকারি একটি পলিটেকনিক ‘সাইক’ রাজধানী থেকে ময়মনসিংহ শহরে স্থানান্তরের অনুমোদন দেন বোর্ড চেয়ারম্যান। নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানকে এ সুযোগ দিতে পারে না। তবে এ বিষয়টি অস্বীকার করেন চেয়ারম্যান ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

 

/টিএন/

লাইভ

টপ