প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল হোতারা কোথায়

Send
রশিদ আল রুহানী
প্রকাশিত : ২১:৫৫, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:১৯, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮





প্রশ্নপত্র ফাঁসএসএসসি ও সমমানের গুরুত্বপূর্ণ সাতটি বিষয়ের পরীক্ষা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। আর এই সাতটি বিষয়েরই প্রশ্নপত্র পরীক্ষা শুরুর অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে পাওয়া গেছে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন অ্যাপে। প্রশ্নফাঁসকারীদের ধরতে মাঠে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা। ইতোমধ্যে মোবাইলে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে রাজধানীসহ সারাদেশ থেকে অর্ধশত ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। এরপরও হোয়াট্সঅ্যাপসহ ফেসবুকে থেমে নেই প্রশ্নফাঁসের প্রচারণা। পরীক্ষা ও প্রশ্নফাঁস দুটোই চলছে সমান তালে। এর মানে প্রশ্নফাঁসের মূল হোতারা এখনও রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। প্রশ্ন উঠেছে, মূল হোতাদের কি আদৌ ধরা পড়বে না?




শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষাবোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রশ্নফাঁসের ঝুঁকি প্রশ্নের মুদ্রণ-পরবর্তী সময়ে। আর প্রশ্ন মুদ্রণ হয় পরীক্ষার অন্তত দুই মাস আগে। বিজি প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র চার ধাপে হাতবদল হয়ে সবশেষে পৌঁছায় পরীক্ষাকেন্দ্রে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত গুটিকয়েক শিক্ষক নামের কু-শিক্ষক। পরীক্ষার দিন সকালে পরীক্ষার কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পৌঁছানোর পরপরই ছবি তুলে ছড়িয়ে দেন ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্নফাঁস রোধে এবার পরীক্ষা শুরুর আগেই বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরীক্ষা শুরুর সাত দিন আগে থেকে সারাদেশের কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখা, পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রবেশ করানো এবং কেন্দ্র সচিব ছাড়া বাকি সবার জন্য কেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করা। একইসঙ্গে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজরদারি করতে বিটিআরসি ও গোয়েন্দা সংস্থাকেও জানায় মন্ত্রণালয়। এরপরও প্রশ্নফাঁস চলতেই থাকে। পরে প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের ধরিয়ে দিলে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সরকার দেশের ইন্টারনেটের গতি ধীর করার নির্দেশনা দিলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়।
গত কয়েকদিনে রাজধানীসহ সারাদেশের প্রায় অর্ধশত ব্যক্তিকে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের বেশিরভাগই পরীক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও কোচিংয়ের শিক্ষক। তাদের গ্রেফতারের পরও প্রশ্নফাঁস হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে প্রশ্নফাঁসের প্রচারণা।
তাহলে কি প্রশ্নফাঁস চলতেই থাকবে? জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি মনে করি, প্রশ্নফাঁস অবশ্যই রোধ করা সম্ভব। প্রশ্নপত্র মুদ্রণ থেকে শুরু করে সর্বস্তরে অব্যবস্থাপনা রয়েছে। আর এই অব্যবস্থাপনা কোনোভাবে কাটিয়ে উঠতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষামন্ত্রী থেকে শুরু করে এই মন্ত্রণালয়ের যারা ব্যর্থ, তাদের বদলাতে হবে। কারণ, বারবার তাদের সুযোগ দেওয়ার পরও তারা প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। আসলে শর্ষের ভেতরেই ভূত রয়েছে।’ আগে সেই ভূত তাড়াতে হবে, তারপর শর্ষেকে ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গত কয়েকদিনে সারাদেশ থেকে বেশ কয়েকজনকে ধরা হয়েছে। আমি মনে করি, তাদের ধরলেই হবে না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার করতে হবে। কারণ, এই চক্রটি প্রশ্নফাঁসের মতো একটি ভয়ানক কাজ করে দেশের-জাতির গলায় ফাঁস লাগাচ্ছে। এটা যেনতেন অপরাধ নয়। শুধু তা-ই নয়, এখনও যারা গ্রেফতার হয়েছে তারা কেউ মূল হোতা নয়। তারা সবাই প্রশ্নপত্র ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত বলেই জেনেছি। তাহলে মূল হোতাদের ধরা এখনও সম্ভব হয়নি। সুতরাং এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ব্যর্থ। তারা প্রশ্নফাঁসের মূল হোতাদের ধরতে পারছে না। আর যারা যে কাজে ব্যর্থ তাদের সেই কাজে রাখা উচিত নয়। তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া উচিত।’
একের পর এক প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ পাওয়া পর প্রশ্নফাঁসের সত্যতা যাচাই-বাছাই করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ৬ ফেব্রুয়ারি একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির আহ্বায়ক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর গত রবিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে যে অভিযোগ এসেছে, সেগুলো নিয়ে কাজ করা।প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত এপর্যন্ত তিনশ’ মোবাইল ও টেলিফোন নম্বর চিহ্নিত করে তা ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। ফেসবুক ও টেলিফোনে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। এই নম্বরধারীদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী, যারা মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং বা কম্পিউটার সায়েন্সের মতো বিষয়ে পড়ালেখা করছে। অনেক অভিভাবকের নম্বরও রয়েছে এই তালিকায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেফতারের কার্যক্রম শুরু করেছে।’
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সোহরাব হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে যা যা করা সম্ভব, তার সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব মহলই গুরুত্বের সঙ্গে চেষ্টা করছে। আশা করি, দ্রুতই মূল হোতারা ধরা পড়বে।’
পুলিশ হেড কোয়ার্টার সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশ থেকে প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত ৩৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
প্রশ্নফাঁসের মূল হোতাদের গ্রেফতারের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে গত ১০ ও ১১ ফেব্রুয়ারি ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মূল হোতদেরও ধরার চেষ্টা অব্যাহত আছে। আশা করছি, তারাও খুব দ্রুত ধরা পড়বে।’

আরএআর/এইচআই

লাইভ

টপ