উচ্চ আদালতে আরও নারী বিচারপতি দেখতে চাই : নাজমুন আরা সুলতানা

Send
বাহাউদ্দিন ইমরান
প্রকাশিত : ১৪:০৩, মার্চ ০৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৬, মার্চ ০৮, ২০১৮

দেশের প্রথম নারী বিচারক বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা বাংলাদেশের বিচারিক আদালতের প্রথম নারী বিচারক। একইসঙ্গে তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগেরও প্রথম নারী বিচারপতি। ১৯৭৫ সালের ২০ নভেম্বর বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচার বিভাগের মুনসেফ (সহকারী বিচারক) হিসেবে যোগদান করেন নাজমুন আরা সুলতানা। এরপর ২০১৭ সালের ৭ জুলাই তিনি অবসরে যান। বাংলাদেশের প্রথম নারী বিচারপতি হিসেবে তার সে সময়ের বিচারিক অভিজ্ঞতা, বিচার বিভাগে নারীদের অগ্রসরতার সুযোগ, সম্ভাবনা ও পরামর্শ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে।

বিচার বিভাগে আপনার পদচারণার দিনগুলো কেমন ছিল?

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা: বিচার বিভাগে অবশ্যই আমার সফলতা ছিল। আমি আমার কাজকে সবসময় সমুন্নত রেখেছি। বিচারাঙ্গনে আমি হলাম দেশের প্রথম নারী বিচারক। তাই প্রাথমিকভাবে কিছু প্রতিবন্ধকতা তো ছিলই। যা পরে আর ছিল না। এমনকি ময়মনসিংহ বারে (আইনজীবী সমিতি) আমি ছিলাম প্রথম নারী আইনজীবী। সেখানেও প্রতিবন্ধকতা ছিল। যা বড় ধরনের নয়। অনেকেই অবহেলা, অবজ্ঞা করতেন। কিন্তু আমি আমার মায়ের সহযোগিতায় সেসব প্রতিবন্ধকতার ঊর্ধ্বে উঠে আসি। আমার ১১ বছর বয়সেই বাবা (আবুল কাশেম মঈনুদ্দীন) মারা যান। এরপর থেকে আম্মার (বেগম রশীদা সুলতানা দীন) প্রেরণা আমাকে এতদূরে আসতে সহযোগিতা করে।

দেশের প্রথম নারী বিচারক বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা

দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী উন্নয়নের মাত্রা কতটা এগিয়েছে বলে মনে করেন?

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা: দেশের বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নারী উন্নয়ন বেশ ভালোভাবেই এগিয়েছে। গত ২৪ বছর যাবৎ দেশের সরকার প্রধান নারী। সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রীও নারী। একসঙ্গে এত বছর ধরে দেশে নারীরা সরকার প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসছে, পৃথিবীর অন্য দেশে এমন উদাহরণ বিরল। আমি মনে করি, এটাও আমাদের নারীদের একটি সফলতা। এরপর যদি বিচারাঙ্গনের কথা বলি তাহলে বলবো, দেশে বর্তমানে বহু নারী আইনজীবী এবং বিচারক রয়েছেন। বিচারকদের সংখ্যা প্রায় ৪৫০ বা তারও বেশি হবে। আরেকটি বিষয় হলো, পরীক্ষার মাধ্যমে নারীদের মধ্যে যারা বিচারাঙ্গনে আসছেন তারা মেধাক্রমে প্রথম দিকেই থাকছেন। জাতীয় বা অন্যান্য পরীক্ষাগুলোতেও নারীরা মেধাক্রমে ভালো করছেন।

নারীর অগ্রসরতার গতি সঠিক পথে পরিচালিত হচ্ছে কিনা?

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা: বিচারাঙ্গনে নারী উন্নয়নের যে গতি চলমান রয়েছে তা ঠিক আছে বলে মনে করি। এখানে নারীরা অনেক বড় বড় পদে রয়েছেন এবং সেখানে ভালো করছেন। এর বাইরেও অন্য ক্ষেত্রগুলোতে নারীদের অগ্রসরতার গতি ঠিক আছে বলে মনে করি। ব্যবসায় কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবেও নারীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সমাজের গরিব ও অশিক্ষিত নারীরা এখনও উন্নয়নে অংশগ্রহণ থেকে পিছিয়ে আছে। এক্ষেত্রে আমরা যারা নিজেদের অবস্থা থেকে সক্ষম আছি তাদের উচিত পিছিয়ে পড়া নারীদের উন্নয়নে এগিয়ে আসা।

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার সঙ্গে কথা বলছেন প্রতিবেদক। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

আপনি আপিল বিভাগে বিচারপতি থাকাকালে বেঞ্চের অন্য বিচারপতিদের সকলেই ছিলেন পুরুষ। তাদের সঙ্গে বসে বিচারকাজ পরিচালনায় আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা: এ পর্যায়ে এসে (আপিল বিভাগের বিচারপতি হওয়ার পর) তাদের সঙ্গে বসে বিচারকাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে আমার মধ্যে অস্বস্তিতে পড়ার মতো কিছুই ঘটেনি। বরং কর্মক্ষেত্রে তারা আমাকে খুবই সহযোগিতা করেছেন। আমিও তাদের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে কাজ করেছি। আপিল বিভাগের ২/১ জন বাদে বাকি সবাই আমার কনিষ্ঠ (বিচারপতি)। তারাও আমাকে বড় বোনের মতো দেখেন, আমিও তাদের সেভাবে দেখতাম।

অন্য সব বিভাগের মতো বিচার বিভাগে নারীদের অংশগ্রহণ কম, এছাড়াও বিচার বিভাগে যুক্ত হওয়া নিয়ে নারীদের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব এখনও রয়েছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন?

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা: বিচার বিভাগে নারী কম, এটা ঠিক না। বিচারাঙ্গনের চারভাগের একভাগজুড়ে রয়েছে নারীদের অংশগ্রহণ। তবে সুপ্রিম কোর্টে নারী বিচারপতিদের (আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগ) সংখ্যা কম। এখানে আরও নারী বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হওয়ার জন্য যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন নারী বিচারক রয়েছেন। আমি সুযোগ পেলেই সুপ্রিম কোর্টে নারী বিচারপতি বৃদ্ধির বিষয়ে বলি। সরকারের এক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলেও মনে করি।

বিচার বিভাগে নারীর কর্মপরিবেশ কতটা বন্ধুসুলভ?

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা: আমি যখন বিচারাঙ্গনে প্রবেশ করি তখন কিছু প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছিল। আমি যেদিন খুলনায় প্রথম মুনসেফ (সহকারী বিচারক) হিসেবে নিযুক্ত হয়ে বিচার কাজ শুরু করি, সেদিন আমার এজলাসে প্রচুর ভিড় হয়েছিল। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আমাকে দেখতে প্রতিদিন ছুটে আসতো। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে অনেক সময় পুলিশের সহযোগিতা দরকার হতো। এছাড়াও মানুষের অবহেলা, অবজ্ঞা তো ছিলই। এই মহিলা কী বিচার করবেন, একজন নারী কি বিচার করতে পারেন?–এমন অনেক কথাই তখন শুনতে হয়েছে।

নিজ বাসায় বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

সেই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন কীভাবে?

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা: বাইরের মানুষের মন্তব্য আমি কখনও আমলে নিতাম না। এছাড়া আমার আত্মবিশ্বাস ছিল, খুব শীঘ্রই সবাই আমাকে মেনে নেবেন। এবং তাই-ই হয়েছে। আমি আমার কর্মচেষ্টা দ্বারা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠলাম। পরে আমি যখন জেলা জজ হিসেবে কার্যক্রম শুরু করলাম তখনও অনেক কথা হয়। অনেকেই বলেন, জেলা জজ হিসেবে তিনি কীভাবে কাজ করবেন, জেলা জজ হয়ে কীভাবে একটি প্রশাসনকে তিনি চালাবেন? তখন আমার পোস্টিং ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। এর দু-এক মাসের মধ্যে সবাই আমাকে গ্রহণ করলো। তবে বিচারাঙ্গনে এখন আর সে ধরনের বাধা নেই। চাকরির সুবাদে অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা থাকতে হয়। এটা বেশি কষ্টের। কর্মক্ষেত্রে আমি নিজেও বিচার কাজের স্বার্থে অনেক কিছুই বিসর্জন দিয়েছি, ত্যাগ করেছি। সমস্ত কাজের মধ্যেও আমি বিচারিক কাজকে প্রাধান্য দিয়েছি।

বিচার বিভাগে যুক্ত হতে চান এমন নারীদের ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কি?

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা: যারা বিচারক হয়ে আসতে চান তাদের অবশ্যই নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তাই যখনই বিচারকের চাকরি বেছে নেবেন তখন তাকে অনেক কিছুই ত্যাগ করার মানসিকতা রাখতে হবে। কাজের ক্ষেত্রে খুব মনোনিবেশ করতে হবে। বিচার কাজে ফাঁকি বা অবহেলা চলবে না। যেনতেন করে বিচার কাজ শেষ করা যাবে না। অবশ্যই আত্মনিবেশ করে কাজ করতে হবে। কেননা, এটি এমন একটি কাজ যেখানে কোনোরকম ফাঁকি চলবে না।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আপনার পরামর্শ কি?  

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা: ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন জাজেস নামে বিশ্বের সব নারী জজের একটি সংগঠন রয়েছে। এই সংগঠনটির এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ক্যাম্পেইন হলো, More Woman More Justice. বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে যোগ্যতাসম্পন্ন আরও অনেক মহিলা বিচারপতি নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন, এটাই আমার প্রত্যাশা।

 

/বিআই/টিএন/চেক-এমওএফ/

লাইভ

টপ