আগুন কেড়ে নিলো পাঁচ হাজার পরিবারের স্বপ্ন (ভিডিও)

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ১৯:৪৬, মার্চ ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:১৮, মার্চ ১২, ২০১৮

2আগুনে পুড়ে ছাই হলো মিরপুর ১২ নম্বরের পাঁচ হাজার পরিবারের স্বপ্ন। এসব পরিবারের কেউ বিদেশ যাওয়ার জন্য ঋণ নিয়ে টাকা এনে ঘরে রেখেছিলেন, সঙ্গে ছিল পাসপোর্ট-ভিসা। কারও কারও সংসারের খরচ চালানোর টাকা, বেতনের টাকা ছিল ঘরে। এছাড়া কারও কারও সারাজীবনের সঞ্চয়ও ছিল এসব বাসাবাড়িতে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি রবিবার (১১ মার্চ) দিবাগত রাতের আগুনে তাদের বাসাবাড়ির সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে গেছে এসব নগদ টাকা, শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে বিদেশগামীর পারপোর্ট-ভিসাও। তাদের অভিযোগ, উদ্দেশ্যমূলকভাবে কেউ নাশকতা করে বস্তিতে আগুন দিয়ে তাদের স্বপ্ন পুড়ে ছাই করে দিয়েছে। তবে বস্তিবাসীর তোলা নাশকতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও   পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাদন ফকির।

রবিবারের রাতের আগুনে যাদের স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, তাদের একজন জেসমিন বেগম। তিনি স্বামীকে কাতার পাঠানোর জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন মিরপুর পল্লবী বস্তির বাসিন্দা জেসমিন বেগম (৩৫)। আর ছিল নিজেদের জমানো একলাখ টাকা। কাতারে যাওয়ার জন্য তার স্বামী বাদল হোসেন একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে টাকা ও পাসপোর্ট জমা দেন। গত জানুয়ারিতে তার ভিসাও হয়। পাসপোর্টে ভিসা লাগার পর তা তিনি বাসায় এনে রাখেন। কিন্তু টাকার অভাবে বিমানের টিকিট করতে পারছিলেন না। তাই তিনমাস ধরে বিমানের টিকিট জোগাড় করতেছিলেন। আজ (১২ মার্চ) তার টিকিট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই সব শেষ। ঘরের মধ্যে থাকা পাসপোর্ট, ভিসাসহ সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পুড়ে গেছে তাদের স্বপ্ন। তারা কেবল প্রাণ নিয়ে পরিবারসহ এক কাপড়ে বের হতে পেরেছেন।17

সোমবার (১২ মার্চ) সকালে পল্লবীর পোড়া বস্তিতে গিয়ে দেখা গেছে, আহাজারি করছেন জেসমিন বেগম। তার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের টুকরাইলে। স্বামী, সন্তান ও বড়বোনসহ তার পরিবারে সাত সদস্য। বস্তির ছোট্ট একটি ঘরে তারা। জেসমিন বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘কিস্তি দেওয়ার জন্য দশ হাজার টাকা জোগাড় করেছিলাম, তাও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখন আমাদের কী হবে?’

20

এ সময় পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন জেসমিন বেগমের স্বামী বাদল হোসেন। তিনি বলেন, ‘ট্রাভেল এজেন্সির লোকজন বলছিলেন, আমাকে বিশ্রামে থাকতে। যেন টিকিট হওয়ার পর সুস্থভাবে কাতারে গিয়ে কাজ করতে পারি। কিন্তু সুদের টাকা পরিশোধ করার জন্য কাজ করছি প্রতিদিন। এখন কী করবো, বুঝতেছি না।’

জেসমিন বেগম নিজেও পল্লবীর একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তিন ছেলে ও দুই মেয়ের সংসারে তাদের এখন বাঁচার স্বপ্ন খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘বাদল হোসেন বিদেশে গেলে আমি সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে চলে যাবো বলে ঠিক করছিলাম। এখন আমাদের কী হবে?’

6

জেসমিন বেগমের মতো এরকম শতশত নারীর আহাজারিতে ভারী হয়ে  উঠেছে পল্লবীর পোড়া বস্তি। তার মতো আরেক নারী রাহিমা বেগম (৩০)। তিনি বাসাবাড়িতে কাজ করেন। ১২ বছর ধরে বাবা-মা ও ভাই-বোনের সঙ্গে এই বস্তিতে ছিলেন। তাদের তিনটি ঘর ছিল। তার বাবা ও ভাইয়েরা পানির ওপরে বাঁশ দিয়ে ঘরগুলো তৈরি করেছিলেন। তাদের তিনটি ঘরই পুড়ে গেছে।

রাহিমা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাত ৩ টার দিকে হঠাৎ চিৎকার ও কান্নার শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে দেখি—দাউদাউ করে বস্তির পশ্চিম দিকে আগুন জ্বলছে। এরপর বাসা থেকে দ্রুত বের হয়ে যাই। তিনটি কক্ষে আমাদের অনেক আসবাবপত্র ছিল। ফ্রিজ, টিভি সব পুড়ে গেছে। বেতনের টাকা রাখা ছিল, তাও পুড়েছে।’

9

রাহিমা বেগম রাস্তার ওপরে বসে কাঁদছেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় কোনও আত্মীয় স্বজন নেই আমাদের। তাই রাস্তায় বসে আছি।’ ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বস্তিতে আসতে বিলম্ব করে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

এই বস্তিতে থাকতেন জাকির হোসেন। বস্তিতে তার ১১টি ঘর ছিল। পরিবার নিয়ে দু’টি ঘরে থাকতেন। বাকি ঘরগুলো ভাড়া দিতেন। তার সব ঘর পুড়ে গেছে। মূলত এই বস্তিতে যারা আগে থেকে এসেছেন, তারা বাঁশ, কাঠ ও কংক্রিটের খুঁটি দিয়ে একাধিক ঘর তৈরি করেছেন। নিজেরা থাকার পাশাপাশি তারা ঘর নতুন কোনও পরিবার বস্তিতে আসলে তাদের ভাড়া দেয়।

14

মিরপুর সেনানিবাস ফটকের বাম দিক দিয়ে সরু রাস্তা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই বিশাল বস্তি। এখানে অন্তত এক ডজন বস্তি রয়েছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। রবিবার (১১ মার্চ) দিবাগত রাত ৩টার দিকে আগুনের সূত্রপাত্র হয় বলে অভিযোগ করেছে বস্তির বাসিন্দারা। তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভোর রাত ৪টার দিকে আগুন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা বস্তিতে। ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিট কাজ করে সোমবার সকাল ৭টা ২২ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, আগুনে মোট চারটি বস্তির ঘর পুড়েছে। সেগুলো হলো, হারুনাবাদ বস্তি, কবির মোল্লা বস্তি, নাগর আলী মাতব্বর বস্তি ও সাত্তার মোল্লা বস্তি। প্রতিটি বস্তিতেই দেড় হাজারেরও বেশি ঘর ছিল। এই চার বস্তির একটি ঘরও অবশিষ্ট নেই। সব পুড়ে গেছে। বাসিন্দারা স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবনের সাতটি ফ্লোরে আশ্রয় নিয়েছেন।  

বস্তিতে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর মধ্যে আতঙ্ক দেখা গেছে। রেহেনা বেগম (৪৭) নামে এক নারী বলেন, ’১৫ বছর ধরে পোশাক কারখানায় কাজ করি। চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। ছোট ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ওকে নিয়ে বাড়িতে চলে যাবো বলে ঠিক করেছি। কিন্তু সারা জীবনের আয় রোজগার সব পুড়ে গেছে।’

16

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় রেহেনা বেগমের বাড়ি। দুই ছেলে ও স্বামী ঘরের ছাই সরানো চেষ্টা করছেন। সেখানেই তারা তাঁবু খাটিয়ে নতুন করে আবার থাকার জায়গা করছেন। কারণ ঢাকায় তাদের আর কোনও আত্মীয় নেই।

নাশকতার অভিযোগও রয়েছে বাসিন্দাদের

শেফালী বেগম (৪৫) নামে এক নারীর অভিযোগ—কেউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। না হলে এ রকম আগুন লাগতে পারে না। সবকিছু দাউদাউ করে জ্বলছে। তার কাছে মনে হয়েছে, পেট্রল দিয়ে কেউ বস্তি জ্বালিয়ে দিয়েছে। শেফালী বেগমের গ্রামের বাড়ি গাজীপুর জেলার মির্জাপুর উপজেলার ভাওয়াল এলাকায়। স্বামীর নাম নূর ইসলাম। একছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তাদের সংসার। এই বস্তিতে তারা ২৫ বছর ধরে থাকেন। তার এক ছেলে ও মেয়ে রাজধানীর দু’টি কলেজে অনার্সে পড়ছেন। অনার্স পড়ুয়া মেয়ের আগামী ২৭ এপ্রিল পরীক্ষা। ঘরের সঙ্গে তাদের সব বই খাতা পুড়ে গেছে। তার ঘরে ২৪ হাজার টাকা ছিল, তাও পুড়ে গেছে।

এরকম অসংখ্য মানুষ পথে বসে গেছে। তাদের জন্য মানবিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আহ্বান জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের খাবার বিতারণ করা হচ্ছে।

18
ফায়ার সার্ভিসের কমিটি গঠন

ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। সদর দফতরের উপ পরিচালক দেবাশিস বর্ধনকে প্রধান করে এই কমিটি করা হয়েছে। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিচালক (অপারেশ) মেজর শাকিল নেওয়াজ।

পুলিশের বক্তব্য

নাশকতার কথা পুলিশ অস্বীকার করেছে। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাদন ফকির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের কাছে নাশকতার মতো মনে হয়নি। এরকম কোনও অভিযোগও পাইনি। তবে আগুনের ঘটনা যেহেতু ঘটছে, আমরা অবশ্যই তদন্ত করবো।’ তিনি বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডে আহত বা নিহতের কোনও ঘটনা ঘটেনি। দু’জন সামান্য আহত হয়েছিলেন। একজন ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, আরেকজনের পা কেটে গিয়েছিল টিনে। তারা এখন ‍সুস্থ।’ 

11

ঢাকা জেলা প্রশাসনের বক্তব্য

ভুক্তোভোগী পরিবারগুলোকে ত্রাণ সহায়তা দিতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে ঢাকা জেলা প্রশাসন। তারা তালিকা প্রস্তুত করে পরিবারগুলোকে ৩০ কেজি করে চাল দেবে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের ত্রাণ কর্মকর্তা মো. আব্দুস সাত্তার খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তালিকা তৈরি করে প্রত্যেক পরিবারকে ৩০ কেজি করে চাল দেবো।’

এডিসি শাহিদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের বরাদ্ধ অনুযায় প্রত্যেক পরিবারকেই ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে। আপাদত আর কিছু দেওয়া হচ্ছে না। আমরা তালিকা করতে পারলেই দেওয়া শুরু করবো।’

স্থানীয় সংসদ সদস্যের বক্তব্য

পল্লবীর যে বস্তিগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার পরিবার, ভাই ও চাচাদের জমিতে গড়ে উঠেছিল। ১৯৭৬ সাল থেকে সেখানে বস্তি রয়েছে। এসব বস্তির ঘর থেকে তারা ভাড়া পেলেও তা স্বীকার করেন না। তবে বাসিন্দারা জানিয়েছেন, জমির মালিকদের লোক রাখা রয়েছে। তারা ভাড়া নেয়।

13

নাশকতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি  বলেন, ‘আমরা তাদের দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে থাকতে দিয়েছি। তবে আমরা কোনও টাকা-পয়সা নেই না। ঘর পুড়ে যাওয়ায় তাদের আমি মার্কেটে আশ্রয় দিয়েছি। খাবারের ব্যবস্থা করতেছি। যতদিন তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা না হবে ততদিন তারা এখানে থাকবেন। পুড়ে যাওয়া ঘরের জায়গায় তাদের আবার থাকতে দেওয়া হবে।’

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

<>

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ