সংবিধানে কোটার বৈধতা দেওয়া হয়েছে, বাধ্যতামূলক করা হয়নি

Send
বাহাউদ্দিন ইমরান
প্রকাশিত : ২৩:৪২, এপ্রিল ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৫৬, এপ্রিল ১২, ২০১৮

 

সংবিধানসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা বাতিলের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় বলে মনে করছেন একাধিক আইনজীবী। তারা বলছেন, সংবিধানের কোটার বৈধতা দেওয়া হয়েছে, বাধ্যতামূলক করা হয়নি।আর কোটা বাতিলের বিষয়টি প্রশাসনিক আদেশের (অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অর্ডার) ওপর নির্ভর করে। তাই কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না। আবার কারও কারও মতে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার মধ্যেই সব সময়, এ জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। তারা বলছেন, কোটা একেবারেই বাতিল করে দেওয়ায় যারা এতদিন সুবিধা ভোগ করে আসছেন, তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হবে।

 প্রসঙ্গত, কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলার সময় গত ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘কোটা নিয়ে যখন এতকিছু, তখন কোটাই থাকবে না। কোনও কোটার দরকার নেই। কোটা পদ্ধতি তুলে দিলাম। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সবাই চাকরিতে আসবে।’ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী কোটা সংস্কার না করে একেবারেই বাতিল করা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘কোটা থাকলেই সংস্কারের প্রশ্ন আসবে। এখন সংস্কার করলে আগামীতে আরেক দল আবার সংস্কারের কথা বলবে। তখন আবারও মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হবে। কোটা থাকলেই ঝামেলা। সুতরাং কোটারই দরকার নেই। কোটা ব্যবস্থা বাদ, এটাই আমার পরিষ্কার কথা।’

কোটা বাতিলের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি সুব্রত চৌধুরী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বাতিলের কথা বললে হবে না। তাহলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে।’

তবে একই বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘কোটা নিয়ে সংবিধানে কোনও শর্তারোপ করা নেই। তাই সংবিধানের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। এটি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অর্ডারে (প্রশাসনিক আদেশ) করা হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সভায় তো বলেই দিয়েছে যে, প্রশাসনের আদেশে কোটা বাতিল করে দেওয়া হবে।’

জানতে চাইলে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সমাজের সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকার জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার নির্দেশনা সংবিধানে রয়েছে। সেই অনুসারে কোটা সংরক্ষণের বিষয়টি সংবিধানে আছে। তবে বর্তমানে কোটার অবস্থান (শতাংশ) সঠিকও নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা ছিল বিশেষ স্বীকৃতি স্বরূপ। তাই এটা একেবারেই বাতিল যৌক্তিক হবে না।’

এদিকে, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পেলেই প্রজ্ঞাপন জারি হবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান।

এ বিষয়ে আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী মনে করেন, ‘এখন গেজেটের কোনও সুযোগ নেই। গেজেটের আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।’ আর সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের ভাষ্য, ‘কোটাপদ্ধতি প্রশাসনিক আদেশে চালু হয়েছে। সুতরাং এখানে সংবিধানের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধানে কোটা সংরক্ষণের বিষয়ে কিছু বলা নেই। সংবিধানের তৃতীয় ভাগে আমাদের যে মৌলিক অধিকারের কথা বলা আছে, সেখানে আমরা কী কী আইন করতে পারবো বা পারবো না, সে সম্পর্কে বলা আছে। সংবিধানের ২৮ (৪) অনুচ্ছেদে বলা আছে, অনগ্রসর শ্রেণির নাগরিক, যেমন—নারী, শিশু বা প্রতিবন্ধীদের জন্য যদি বিশেষ সযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, তবে তাতে সংবিধানের কোনও বাধা থাকবে না। রাষ্ট্র সেটা করতে পারে।’

সংবিধানের কোটার বৈধতা দেওয়া হয়েছে, বাধ্যতামূলক করা হয়নি বলে বলে মনে করেন আইনজীবীরা। তবে, কোটা একেবারেই বাতিল করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচারের (মৌলিক কাঠামো) সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা জানতে চাইলে মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘না। এটা বেসিক স্ট্রাকচারের মধ্যে পড়বে না। তবে যারা এতদিন সুবিধা ভোগ করে আসছেন, তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হবে।’

কোটা বাতিলের ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে আরও বলেছিলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের চাকরির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হবে।’ সেক্ষেত্রে আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী মনে করেন, ‘পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী সম্পর্কে সংবিধানে বলা আছে। কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী প্রতিবন্ধী ও নৃ-গোষ্ঠীদের বিশেষভাবে দেখার কথা বলেছেন। কিন্তু নারীরাও আছেন। আর মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়টা সংবিধানে নেই। এটি পরে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে মিলিয়ে নেওয়া হয়। আন্দোলনটা ছিল কোটা সংস্কারের বিষয়ে। সেক্ষেত্রে সেটা তো বাতিল করা হলো। এখন সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাই দেখার বিষয়।’

একই বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোটা বাতিল সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী একটি ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এটার ব্যাপারে সব কিছু ঠিকঠাক করবেন। তবে এ বিষয়ে তিনি (মন্ত্রিপরিষদ সচিব) যদি আমার কাছে আইনি অভিমত চান, তা আমি দেবো। এ বিষয়ে আর কিছুই আমি বলবো না।’

 

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ